ওদেরও আছে অধিকার

0
9

এক পথশিশু। নাম নিলয়। থাকার জায়গা নেই, রাস্তায় এটা-সেটা টোকায়। সারাদিন যা টোকায়, তা এক ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে। তা দিয়ে কোনোমতে একটু খেয়ে ক্ষুধার কষ্ট কিছুটা লাঘব করে। কিন্তু কখনোই পেট ভরে খেতে পারে না। ওর বয়স বেশি না, মাত্র ৮ বছর। এই ৮ বছর বয়সে যেখানে আর দশটা শিশু স্কুলে পড়ে, খেলাধুলা করে, মা-বাবার সাথে ঘুরে বেড়ায় নানা জায়গায়, সেইখানে মাত্র ৮ বছর বয়সেই ছোট্ট নিলয় চিনতে শুরু করেছে এই পৃথিবীর আসল রূপ। বুঝতে শুরু করেছে, কত নিষ্ঠুর এই পৃথিবী।
অন্য শিশুদের মতো ওকে এত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কেউ নেই। কারণ ও যে এতিম, এই পৃথিবীতে ওর মা-বাবা, আপনজন কেউ নেই। একাই যুদ্ধ করে যাচ্ছে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সঙ্গে।

আর ঐযে, নিলয় যে দোকানে সারাদিনের কষ্টের টোকানো জিনিস বিক্রি করে, ঐ দোকানের মহাজন ওকে বিশাল ঠকান ঠকাতো। ওকে ছয়-নয় বুঝিয়ে কম টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিত। ছোট্ট নিলয় এসবের কিছুই জানতো না। ওকে যা দিত ও তাই নিয়ে খুশি থাকার চেষ্টা করত। কিন্তু এভাবে কি খুশি থাকা যায়?
নিলয় রাত কাটায় রাস্তার পাশে একটা গাছের নিচে ছোট্ট একটা ঝোপের পিছনে এক টুকরো টিন দিয়ে ছাউনি বানানো এক ময়লা জায়গায়। ওর জীবনটা যেত কষ্টে তাও নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করত। নিজেকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে তার থেকে খারাপ অবস্থায় যারা আছে তাদের দিয়ে। কিন্তু ওর থেকে খারাপ অবস্থায় কাউকে দেখিনি। ওই তো সবচেয়ে অসহায়। সারাটি বছর যায় ওর দুঃখে-কষ্টে। গ্রীষ্মকালে, কাঠফাঁটা রোদের মধ্যে টোকানো যে কত কষ্ট তা ওর থেকে ভালো আর কেউ বোঝে না। আর যদি বলি বর্ষার কথা। সেখানেও কষ্ট। বর্ষায় কতবার যে ওর টিনের ছাউনিটা ভেঙে পড়ে, এর হিসাব নেই। তাও নিলয় সারাদিন ভিজে ভিজে টোকায়। রাতে এসে ও দেখে ওর টিনের ছাউনিটা ভেঙে পড়ে আছে। সেটা আবার লাগিয়ে ভেজা অবস্থায় ভেজা-ময়লা জায়গায় রাত কাটায়। কত যে অসুখ-বিসুখ ওর হয়, জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি সারা বর্ষা জুড়েই লেগে থাকে। তাও নিলয় টোকায় আর সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করে, তাকে এত অসহায় জীবন দান করার জন্য। আর শীতকালে শীতের মধ্যে শীতবস্ত্রহীন নিলয় যেন ঠান্ডায় অর্ধেক হয়ে যায়।
ওর একমাত্র বন্ধু ছিল রাস্তার একটি পাগল কুকুর। যদিও সবাইকে কামড়ানোর চেষ্টা করে তবুও নিলয়কে কিছু করে না। যখন নিলয় রাতে ওর ছাউনির দিকে আসে আর কুকুরটা টের পায় তখনই ওর কাছে চলে আসে। নিলয় ওর জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসত। কিন্তু কিছুদিন আগে ঘটে যায় এক অঘটন। রাস্তায় একটা শিশুকে খাবারের জন্য বিরক্ত করায় মানুষ কুকুরটাকে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এটা দেখে নিলয়ের কি যে কান্না। তখন থেকে ও একা হয়ে যায়। চাইলেই নিলয় রাস্তার অন্যান্য পথশিশুদের সাথে মেলামেশা করতে পারে। কিন্তু করে না। কারণ তারা ভালো নয় তারা নেশা করে, ছিনতাই করে, চুরি করে তাই ও তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না।
অক্টোবর মাসে মাঝে মাঝে শিশুর ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য মিছিল দেখে নিলয়। মিছিল দেখলেই ও ভাবে তাদের মতো শিশুদের জীবন হয়তো বদলে যাবে কিন্তু কিছুই হয় না। ওদের মতো শিশুরা সেই যাযাবর অবস্থাতেই জীবন কাটায়।

অনেকে মিছিল করে, মিটিং করে শিশু অধিকারের জন্য কিছু কিছুই করে না। নিলয়ের মতো শিশুরাও তো শিশু। এতিম বা রাস্তায় থাকে বলে কি তাদের বাঁচার অধিকার নেই? তাদেরও তো বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু আমাদের বেখেয়ালির জন্য তারা তাদের ন্যায্য অধিকার পায় না। আমাদের ভুলের জন্য তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
এর দায় কে নেবে?
কে দেবে এর জবাব?

প্রকাশকাল- এপ্রিল ২০২৬