রেজাল্ট খারাপ হয় কেন?

0
0

রাহান ও রাকিব দুজন ভাই। একজন এর বয়স ১৫ আর একজনের ১৭ বছর। একদিন তাদের স্কুলের ফলাফল দেয়। রাহান চুপচাপ মন খারাপ। কারণ তার রেজাল্ট খারাপ। আর রাকিবের ভালো ফলাফল এসেছে। ওখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। তারপর তার রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজতে চেষ্টা করলাম। শিশুর বিকাশের সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। শিশুকে বেড়ে উঠতে হলে এগুলো খেয়াল রাখতে হবে। ভাবলাম নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় হয়েছে।
শুরুতে তার খাদ্যাভাস সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। এরপর যা পেলাম তা হলো তার সবসময় হজমের সমস্যা, যার কারণে রাতে ঘুম হয় না। পড়াশোনায় বেশিক্ষণ মনোযোগ দিতে পারে না। মনে রাখতে পারে না। এক কথায় প্রায় বেশিরভাগ দিন অসুস্থ আর পেটের সমস্যা। সে নিয়মিত শাকসবজি খেত না। কিন্তু যখন বাজারে যেত বাজারে খাবার ভালো লাগতো। তারপর তার অভিভাবককে শাকসবজি, আর সুষম খাবার কীভাবে খাওয়াবেন, কিছু খাবারের রেসিপি ও কৌশল সম্পর্কে জানালাম।
বন্ধুরা তোমরা কি জানো নিয়মিত শাকসবজি খেলে কী হয়? আমরা বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেলস পাবো। এই ভিটামিন, মিনারেলস আমাদের শরীরে পুষ্টির জোগান দিবে যা সামগ্রিক শরীরে শারীরিক, মানসিক ও পড়াশোনায় আগ্রহ বৃদ্ধি করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য ছাড়াও ওজন নিয়ন্ত্রণে, কর্মদক্ষতায়, খেলাধুলায় কর্মতৎপরতা বাড়বে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। দেখা যাচ্ছে শিশুর বিকাশে নানা বিষয় জড়িত। এগুলো যে রোগ শোক তা নয়, এর অনেক অভ্যাসগত। অবশ্য তা রোগ ডেকে আনে সময় সময়। তবে সাবধান থাকলে বিভিন্ন রোগ সংক্রমণ সহজেই আমাদের কাবু করতে পারবে না। এতে আমরা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একজন সুস্থ সবল জাতি হিসেবে গড়ে উঠবো। শিশুর সঠিক বিকাশ ঘটবে।
আমাদের দেশে বর্তমানে বাড়ন্ত বয়সে শিশুরা শাকসবজি খেতে অনীহা বা খেতে চায় না। এটা শিশুর সমস্যা নয়, অভিভাবকের সমস্যা। কারণ অভিভাবকরা শিশু উপযোগী করে খাবার গড়ে তুলতে পারছে না। অভিভাবকরা মনে করেন আমরা যা রান্না করি শিশু তা-ই খেতে বাধ্য। ঠিক তখনই শিশু খেতে অনীহা প্রকাশ করে। তার জন্য কী ধরনের খাবার উপযোগী সেটা দেখে খাবার তৈরি করতে হবে। বড়দের মতো তারা খাবার খেতে চাইবে না। তারা খাবারের টেস্ট বা স্বাদ না পেলে খেতে চাবেই না। শিশুরা সবসময় দেখে শেখে। খাবারের টেবিলে যখন কাউকে দেখবে খেতে তখন সে খেতে চাইবে। এজন্য পরিবারের সবাই যখন খাবে তখন তাকেও একটি থালা দিতে হবে। শিশু খাবার ফেলে দিবে, নোংরা হবে ঘর এ ভেবে অনেক অভিভাবক শিশুকে খাবার দিতে চান না। পরিবারে সবাই যখন সব ধরনের খাবার গ্রহণ করবে তখন সে দেখে দেখে ঠিক একদিন না একদিন গ্রহণ করবে। শিশুকে এক খাবার ৩ দিন পরপর দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। অনেক অভিভাবক শিশুকে মাখিয়ে খাবার খাওয়ায়। মাখিয়ে খাবার খেলে খাবারের মধ্যে কী আছে তা চিনতে ও বুঝতে পারে না। খাবারকে চিনতে ও জানতে আগ্রহ করতে হবে। প্রয়োজনে সপ্তাহে একদিন বাজারে নিয়ে যেতে হবে। কোন সবজি, শাক তার ভালো লাগে তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
সাধারণত শিশুরা সবজি খেতে চায় না। এই অন্যভ্যাসের ফলে টিনএজে গিয়ে শিশুদের শাকসবজি না খাওয়ার সমস্যা আরো বড় আকার ধারণ করে যা শিশুর বিকাশে জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। পড়াশোনায় মন বসানো কষ্টকর হয়। ফলে রেজাল্ট খারাপ হয়। শিশুরা যেন সুষম খাবার খায় সে ধরনের অভ্যাস ছোট থেকে গড়ে তুলতে হবে। যেমন শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, ফল সব ধরনের খাবার তার শরীরে বাড়ন্ত বয়সে প্রয়োজন। আমরা যখন খাবার খাই তখন প্রধান তিনটি ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট পাই যেমন কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট। এসব বিপাক করতে ভিটামিন, মিনারেলস দরকার। শাকসবজি থেকে ভিটামিন, মিনারেলস পাবে। শিশুরা পর্যাপ্ত শাকসবজি না খেলে এসব ভিটামিন, মিনারেলস পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। আর পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ার ফলে শিশুরা মস্তিষ্কসহ শারীরিক, মানসিক এর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ঘটে। এই সময় সঠিক পুষ্টির অভাব হলে তাদের আইকিউ দুর্বল হয়ে যাবে। শিক্ষাগত পারফরম্যান্স খারাপ হবে, বিশেষ করে যেসব শিশু কিশোররা স্কুলে পড়ে। বাংলাদেশে অনেক স্কুলে ক্যান্টিনে প্যাকেটজাত ও ফাস্টফুড খাবার থাকে বেশি। এগুলো হাতের কাছে সহজলভ্য হওয়ায় অনেক অভিভাবক যেমন টিফিনে খেতে বলে তেমনি আবার ঘরের মধ্যেই রেখে দেয়। যেমন চকলেট, চিপস, প্যাকেটজাত জুস ইত্যাদি। এটি যে শিশুর জন্য ক্ষতিকর সেটি অভিভাবকরা খেয়াল করছে না। মনে করছে শিশুরা খুব খুশি এটি দিলে, তাই দেয়।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ শিশু পুষ্টি প্রতিবেদন, ২০২৫-এ বলা হয়েছে আমাদের দেশে ৪৬ শতাংশ শিশু শাকসবজি ও ফল খায় না আর ৫৯ শতাংশ শিশু মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পানীয় গ্রহণ করে। বাংলাদেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুর স্বাস্থ্যে খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ কম। ইউনিসেফ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ^ব্যাপী স্কুলগামী শিশু কিশোরদের মধ্যে বর্তমানে কম ওজনের তুলনায় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থুলতা। এটি শিশুদের ওজন বাড়লেও পুষ্টিহীনতা থেকে যাওয়ায় এটি দ্বিগুণ বোঝা হয়ে উঠেছে। এজন্য ইউনিসেফ পরামর্শ দিয়েছে শিশুরা যেন সুষম খাবার খায়। তারা অতি প্রক্রিয়াজাত, ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড ও কোলা ড্রিংকস সবজি ও ফলের তুলনায় বেশি খায়। এতে শরীরে ভিটামিনের অভাব তৈরি হয়। এগুলো ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, স্থুলতা, ফ্যাটি লিভারসহ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এখনই প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। কিশোরকিশোরীরা আজকাল টিভি, মিডিয়া, অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়, অনলাইনে খাবারের অর্ডার দেয়। পুষ্টির অভাব ও খাবারের আসক্তি ফলে শিশুরা আজকাল নানা ধরনের খাবার খায়। এসব শিশু কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে পড়তে পারে। শিশুরা দিনদিন প্যাকেটজাত খাবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এজন্য ছোট থেকেই ঘরের তৈরি খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে। খাবার এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে শিশুকে জানাতে হবে।

কয়েকটি উপায়
১। প্রিয় খাবারের সঙ্গে সবজি মেশান : শিশুর যে খাবার পছন্দের সেই খাবারের মধ্যে সবজি মিশিয়ে খাবার দিতে পারেন।
২। প্রেজেন্টেশন পরিবর্তন করুন : গরম, ঠান্ডা, লম্বা করে, ভাজা করে, ডুবিয়ে রেখে, কাঁচা অবস্থায়, ভাপে সিদ্ধ বিভিন্ন উপায়ে সবজি দেওয়ার চেষ্টা করুন। দেখতে পাবেন কোনটা তার পছন্দের।
৩। সন্তান শাকসবজি খেলে তার প্রশংসা করুন : সন্তান যখন খাবার গ্রহণ করবে তখন যেভাবে বলা যেতে পারে তুমি এত সুন্দর করে খেয়েছো আমার খুব ভালো লেগেছে।
৪। খাবার মজাদার করে তুলুন : বাচ্চাদের খাবারে সুগন্ধযুক্ত মসলা, চাল, টপিং, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা. টমেটো সস, পনির দিয়ে খাবারের অফার করুন।
৫। শাকসবজি প্রস্তুত এবং রান্নার কাজে সন্তানকে রাখুন।
৬। বাজারে সবজি কেনাকেটায় রাখুন : সবজি কেনাকাটাতে নিয়ে যান, তাকে সবজি বেছে নিতে দিন ।
৭। উৎসাহ বাড়াতে সবজি ব্যবহার করুন : আপনার সন্তানের প্রিয় বই বা খেলনায় সবজির স্টিকার লাগিয়ে দিতে পারেন।
৮। খাবারকে বিভিন্ন আকৃতির তৈরি করুন : তার পছন্দের খাবার কিংবা কার্টুনের মতো, কেকের মতো, পিঠার মতো, লাভ আকৃতির কিংবা তার পছন্দের যেকোনো জিনিসের মতো বিভিন্ন আকৃতির করে খাবার পরিবেশন করুন।
৯। সবজির সাথে সস যোগ করুন : সুস্বাদু উপায়ে সবজি পরিবেশন করলে শিশুরা নিজে খেতে আগ্রহী হবে। যেমন পনিরের সস, ফুলকপি, গাজরে টমেটো সস ইত্যাদি ব্যবহার করলে খাবারের আগ্রহ বাড়বে।
ফুলকুঁড়ি বন্ধুরা, আশা করি বুঝতে পেরেছ বিকাশ সঠিক মতো না হলে অনেক বিষয়ে তুমি পিছিয়ে পড়বে। আর তোমার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকবে। এখনই সাবধান।

প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫