বিশ্ব শিশু দিবসের কথা

0
2

প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব শিশু দিবস এসে হাজির হয়। এই দিনটির সাথে জড়িয়ে আছে শিশুর অধিকার, সুরক্ষা এবং শিশুর উন্নয়ন ও বিকাশের বিষয়টি। এবছর ৬ অক্টোবর দিবসটি পালন করা হবে। একই সাথে পালিত হবে শিশু অধিকার সপ্তাহ।
শিশুরা হচ্ছে ফুলের মতো। শিশু আছে বলেই বিশ্ব এত সুন্দর আর প্রাণবন্ত। বিশ্বকে সুন্দর করার পূর্বশর্ত হচ্ছে এই শিশুদের সুন্দর করে গড়ে তোলা। শিশুরাই জাতি গঠনের মূল ভিত্তি, সুন্দর আগামী প্রতিষ্ঠার কারিগর। তাই বিশ্বকে সুন্দর করার পূর্বশর্ত শিশুদের সুন্দর করে গড়ে তোলা। শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য পুষ্টি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুস্থ বিনোদনের বিকল্প নেই। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব।
বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ উদযাপনে ইউনিসেফ, ফুলকুঁড়ি আসরসহ বিভিন্ন শিশু সংগঠন ও দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার আয়োজনে শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, দেয়ালিকা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশু সংলাপ, ক্রীড়া, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও গোলটেবিল ˆবঠকের আয়োজন করে থাকে প্রতি বছর।
বিশ্ব শিশু দিবস কী করে এল
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার এই দিবসটি পালন করা হয়। সে কথা আগেই বলেছি। আর শিশু অধিকার সপ্তাহ হলো বিশ্ব শিশু দিবসকে কেন্দ্র করে শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে সপ্তাহব্যাপী পালন করা বিভিন্ন কর্মসূচি।
এই দিবসগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আনন্দ ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করা। বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের কার্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই দিবসগুলো পালন করা হয়। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ অধিকার ও উন্নয়ন ভাবনার জন্য এই দিনটি নির্ধারিত। তাই বিশ্বের সকল শিশুর জন্য এই দিনটির তাৎপর্য অপরিসীম।
প্রথম মহাযুদ্ধে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হলে ১৯২৪ সালে লিগ অব নেশনস্ প্রথম শিশু অধিকারের ওপর জেনেভা কনভেনশন ঘোষণা গ্রহণ করে। অবশ্য এর আগে শিশু অধিকার সম্পর্কে বহু দেশে অনেক আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভেঙে যায় লিগ অব নেশনস। জাতিসংঘ ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করে। সেই সনদে প্রথমেই বলা হলো শিশুদের কথা। প্রতিটি শিশুরই মানুষের মতো মানুষ হওয়ার অধিকার রয়েছে। শিশুদের আহার-আশ্রয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সাথে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের নিশ্চয়তা চাই। অগণিত, অসহায় অবহেলিত শিশুর সব রকমের সমস্যা সমাধান হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে শিশুর বেশ কয়েকটি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশুদের এই মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে বিশ্বের সমাজসচেতন মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করেন। এ লক্ষ্যেই গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ ইউনিয়ন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার বা ইউনিসেফ) ১৯৫২ সালে বিশ্বব্যাপী শিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ইউনিসেফ।
দিনটি পালনের জন্য নির্ধারিত হয় অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার। উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ৫ অক্টোবর বিশ্বের ৪০টি দেশ প্রথম বিশ্ব শিশু দিবস উদযাপন করে। ১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে শিশু অধিকার ঘোষণা। এই ঘোষণা তখন জাতিসংঘের ৭৮টি দেশ গ্রহণ করে। ফলে সময়ের সাথে সাথে শিশু অধিকারের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আবার গ্রহণ করে শিশু অধিকার সনদ। তখন জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬০টি। শিশু অধিকার সনদে সংযুক্ত ৫৪টি ধারা সম্পর্কে দশ বছর ধরে আলোচনার পরই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এই সনদ। এতে ১৮ বছর পর্যন্ত সব ছেলেমেয়েকে শিশু-কিশোর হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত সবাই শিশুদের এই বিশেষ অধিকারগুলো ভোগ করতে পারবে। এই সনদ অনুমোদনকারী ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

শিশুর অধিকার নিয়ে কথা
শিশুরা কতটুকু তাদের অধিকারগুলো ভোগ করছে? নাকি তা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমিত রয়েছে? এ বিষয়টি এখন বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজকের শিশু আগামী দিনের আলোকিত পৃথিবী গড়ার কারিগর। আজকে যে শিশু একদিন সে পৃথিবীকে চালিত করবে। দুঃখের বিষয় যে শিশু একদিন দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে সে শিশুকে আমরা বড় অবহেলায় অনাদরে লালন করছি। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ তত পরিচ্ছন্ন নয়। অবহেলা অনাদরে আমাদের শিশুরা বড় হয়। আমাদের সব শিশু সমানভাবে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। বড় হওয়ার সুন্দর পরিবেশ অনেক শিশুরই নেই, সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পথে নানান বাধাবিঘ্নতা, অনেক শিশু ফোটার আগে কুঁড়িতেই ঝরে যায়। ফুল হয়ে বিকশিত হয়ে সৌরভ ছড়াতে পারে না।
শিশুর মন কল্পনাপ্রবণ, কত কিছু করতে চায়। তার কল্পনাশক্তির বিকাশের পথকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। গল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনীবিষয়ক বই তাকে পড়তে দিতে হবে, যাতে করে তারা আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে। প্রত্যেক শিশু কিছু অধিকার নিয়েই জন্মায়। শিশুর সেই অধিকার প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি হলে শিশুর প্রতিভা বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। তাই শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুরা কলকারখানাসহ নানা জায়গায় কাজ করে নিজেদের উপার্জনে দুস্থ পঙ্গু অসহায় বাবা-মাসহ নিজেরা কোনো মতে বেঁচে আছে। সেই সব অসহায় শিশুর প্রতি নজর দিতে হবে। তাদেরকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশ শিশুশ্রম প্রচলিত আইনগুলোর শিশুর কল্যাণ চিন্তাপ্রসূত, আইন লঙ্ঘনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত দেখা যায়, কারণ শিশুদের বেশি মজুরি দিতে হয় না। শিশুর প্রাপ্য অধিকারের প্রতি সবাই সচেতন হতে পারলে শিশুর মেধা, মনন, সৃজনশীলতা বিকাশ তথা শিশুর প্রতিভা বিকাশ সহায়ক হবে।

বিশ্ব শিশু দিবসের আয়োজনগুলো শিশুদের অধিকার সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে উজ্জ্বল হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। সেই প্রেরণা সবাইকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
আজকে যে শিশু, সে-ই একদিন পরিপূর্ণ মানুষ হবে। আর এই পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য শিশুর চাই কতগুলো জিনিস। যেগুলো শিশুর পক্ষে একা কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয় যদি বড়রা সে সুযোগ সৃষ্টি করে না দেয়। যেমন- একটি পরিবারের আশ্রয়, পুষ্টির জন্য খাদ্য, রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা, সর্বোপরি স্নেহপ্রীতি-ভালোবাসাময় পরিবেশ। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় বড়রা যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, শিশুরা ঠিক ততটুকু অসহায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যুদ্ধ-বিগ্রহে শিশুরাই আক্রান্ত হয় সবার আগে। শিশুদের এই অসহায়ত্ব দূর করতে পারে বড়রা প্রয়োজনীয় কিছু চাহিদা মিটিয়ে। ওই চাহিদাগুলোই হলো শিশুর অধিকার। আজ যারা শিশু, ভবিষ্যতে তারাই হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার, শিশুর পিতা। এই ভবিষ্যৎ নাগরিকরা যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সে জন্য উপযুক্তভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে।

এই গড়ে ওঠার সর্বোত্তম সময়টি হচ্ছে শৈশব। শৈশবে যদি শিক্ষা থেকে কেউ বঞ্চিত হয়, যদি কেউ উপযুক্ত খাদ্য পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যদি কেউ ভালোবাসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে কী হবে? ভবিষ্যতে সমাজ একজন অশিক্ষিত, দুর্বল স্বাস্থ্যের, আত্মবিশ্বাসহীন, কখনোবা নিষ্ঠুর প্রকৃতির একজন নাগরিক পাবে। বিপরীতভাবে বললে সমাজ একজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সুশিক্ষিত আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল প্রকৃতির একজন মানুষকে হারাবে। তাই শিশুর সুন্দর আগামী নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব শিশু দিবস পালন তবেই সার্থক হবে।

প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫