আমাদের বাসা-বাড়ির পেছনটা সম্ভবতঃ পশ্চিম দিকটা ছিলো ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এর ভেতরের একটি অংশে সাঁওতাল সম্প্রদায় বাস করতো। দক্ষিণ দিকে থাকতেন গোয়েন্দা বিভাগের লোক। অফিস কাম বাসা। বলতে ভুলে গেছি, আমাদেরটাও ছিলো অফিস-কাম বাসা। পূর্বদিকে রাস্তা। রাস্তার ওপারে ঝাউগাছ বেষ্টিত একটি সুন্দর সাদাবাড়ি। যতোদূর মনে পড়ে এখানে একা এবং নিঃসঙ্গভাবে বসবাস করতেন সঙ্গীতসম্রাট আব্বাসউদ্দীনের এক ভাই।
এই বাড়ির পাশ দিয়ে স্কুলে যেতাম। খুব ভালো লাগতো। বড় বড় ঝাউগাছ থেকে শোঁ শোঁ শন্ শন্ শব্দ হতো। অনেকটা সমুদ্রের আওয়াজের মতো। মাতাল হাওয়া ছিলো আমাদের নিত্যসহচর। এ হাওয়ায় এক সুরমূর্ছনা ছিলো, এখন যাকে তোমরা মিউজিক বলো। বাণীহীন শব্দমূর্ছনা। এই মূর্ছনা আমাদের দেহ-মনে যে তাল সৃষ্টি করেছে, এখনও তা পলে পলে অনুভব করি। নিঃশব্দ গুন গুন আমার জীবন থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি।
বলছিলাম, স্কুলে যেতাম। কিন্তু কিভাবে স্কুলে যেতাম, তাতো জিজ্ঞেস করলে না? ঝাউগাছওয়ালা বাড়ির পেছনেই ছিলো ঘনবন। এই ঘনবনের ভেতর দিয়ে মকবুল চাচার (আব্বার অফিসের পিয়ন, যিনি আমাদের সঙ্গেই বসবাস করতেন) ঘাড়ে বসে স্কুলে যেতাম। মকবুল চাচা বলতেন, আমি তোমার ঘোড়া, তুমি আমাকে থাপ্পড় দিলে আমি দ্রুত ছুটবো।
আমি থাপ্পড় দিতাম না, আব্বা ‘না’ করেছিলেন। বলেছিলেন, মকবুল তোমার মুরুব্বি, তার সাথে উত্তম আচরণ করবে। । মকবুল চাচা অবশ্য মুরুব্বির মতো থাকতেন না। আমাদের ‘ সঙ্গে ছিলো তার সহজ-সম্পর্ক। বন্ধু বা খেলার সাথী ছিলেন তিনি। খুব প্রশ্রয় দিতেন। কোনো দোষ-ত্রুটি করলে আব্বা-আম্মার কাছে নালিশ করতেন না। নিজেই সংশোধন করে দিতেন।
বলছিলাম, ঘন-বনের কথা! এই বনের বেশিরভাগ ছিলো বাঘ-ঝাড়। ঝাড় মানে জঙ্গল। যে জঙ্গলে বাঘ বাস করতো, তাকে বলা হতো বাঘ-ঝাড়। অর্থাৎ এই বনে বাঘ বাস করতো। উঁচু বৃক্ষ বা গাছ কম ছিলো, ছিলো অসংখ্য গুল্মলতা আর পাটগাছের মতো ঝাড়। বনের মধ্য দিয়ে সরু হাঁটা পথ ছিলো। সে পথ দিয়ে মকবুল চাচা খুব সতর্কভাবে হেঁটে যেতেন। আমি ঘাড়ে বসে থাকতাম। কথা বলতাম না। বললে বাঘ শুনতে পাবে, শুনলে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই ধরনের আতংক নিয়ে আমরা বাঘঝাড়ের বন পার হতাম। সরুপথের দু’ধারে দেখতাম সাঁওতাল মহিলারা বাঘঝাড় কাটছে। এসব কেটে বোঝা বানিয়ে ওরা বাজারে বিক্রি করতো। লোকেরা রান্না-বান্নার জন্য সেসব লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করতো। চারপাশে সাঁওতালরা কাজ-কর্ম করতো বলে আমরা ঐ সরুপথ দিয়ে চলাচল করতে সাহস পেতাম।
একদিনের কথা মনে আছে। এক সাঁওতাল মহিলা একটি ছোট বাঘকে দা’য়ের আঘাতে দু’টুকরা করে ফেলেছিলো। ঘটনাটা ঘটার ১ মিনিট পর ঐ পথ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। সাঁওতাল মহিলা বললেন, তাড়াতাড়ি ভাগো, এখনই বাঘের দল এসে যেতে পারে। আমরা ছুটে পালালাম। পরে শুনলাম, এসব নিত্যকার ঘটনা। সাঁওতাল মহিলারা খুব সাহসী। ওরা বাঘ-সাপ কোনো কিছুকে ভয় পায় না। হাতের ধারালো দা দিয়ে ওরা সবকিছু কেটে ফেলে। (চলবে)
প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০১০


