আমার বেড়ে ওঠা (৫ম পর্ব)

0
3

বড় আপার কাছ থেকেই শোনা, তিনি যখন হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতেন, আমি চুপচাপ পাশে বসে শুনতাম। হারমোনিয়াম নিয়ে নাড়া-চাড়া করলেও খুব ডিসটার্ব করতাম না। এই যে আমার চুপচাপ থাকা, এতে গানের শিক্ষকও অবাক হতেন। তিনি আমাকে কোলে রেখে আপাকে গান শেখাতেন।
আপা আরও বলতেন, কলেরগান শুরু হলে তুইতো খেলা ছেড়ে দিয়ে আমার কোলে বসে গান শুনতি। গান ছিলো তোর খুব প্রিয় বিষয়।
বাসার সবাই মিলে মাঝে মাঝে আমরা টকি দেখতে যেতাম, সেকথা আমার একটু-আধটু মনে আছে। বড় হলে আম্মার কাছে জেনেছি, আব্বা মাসের বেতন পেলে সবাইকে নিয়ে একবার সিনেমা দেখতে নিয়ে যেতেন।
এই সিনেমার পূর্ব নাম ছিলো ‘টকি’। টক থেকে টকি। পূর্বে সিনেমা ছিলো নির্বাক। সিনেমা হলের বিশাল পর্দায় শুধু জীবন্ত ও চলন্ত ছবি ভেসে উঠতো। নায়ক-নায়িকা বা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মুখ নাড়াতো কিন্তু তাদের কন্ঠ থেকে কথা বা শব্দ বের হতো না। এই যুগকে বা এই সময়কে বলা হতো নির্বাক ছবির যুগ। সম্ভবতঃ ৩০ দশক পর্যন্ত ছিলো এই যুগ। ৪০ দশক থেকে সবাক ছবির শুরু। বর্তমান সময়ে যেমনটি রয়েছে। ছবি কথা বলে; সুতরাং এর নাম হলো ‘টকি’। খুব বিস্ময়ের বিষয় ছিলো সেটা। মানুষ তখন অবাক হয়ে ভাবতো, এসব কি করে সম্ভব হচ্ছে। সিনেমা হলের নামও ছিলো টকি হাউজ। দিনাজপুর শহরে একটি হলের নামও ছিলো লিলি টকিজ। এখনও সে সিনেমা হলটি আছে কিনা আমার জানা নেই। এর পাশে অর্থাৎ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে আর একটি সিনেমা হল ছিলো, যার নাম ছিলো বোস্তান সিনেমা হল। তখন যারা সিনেমা দেখতো, তারা বলতো, চল টকি দেখতে যাই।
আব্বা বেছে বেছে ভালো ছবি দেখতেন। টকি হলের ম্যানেজারের কাছে আগেই জেনে নিতেন, ছবিটি কেমন, ছবির বিষয়বস্তু কি ইত্যাদি। আম্মার কাছ থেকেই এসব শোনা, তিনি আরও বলেছেন, সবচেয়ে পেছনের ভালো সিটে বসে আমরা টকি বা সিনেমা দেখতাম।
এই যে বোস্তান সিনেমা হলের কথা বললাম, এর সামনে এক জনসভা হয়েছিলো। ১৯৫২ কি ৫৩ সালে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খানের জনসভা। সামনের কাতারেই আব্বার কোলে বসেছিলাম। সম্ভবত সেটাই আমার প্রথম জনসভায় যোগদান। কিছুই আমার মনে নেই। শুধু এটুকুই আমার মনে আছে, একজন মানুষ কথা বলছিলো আর অনেক মানুষ নিশ্চুপ থেকে তার কথা শুনছিলো। পরবর্তী জীবনে বন্ধুদের কাছে যখন এ কথা বলতাম, তখন ওরা বলতো, তুই গুল মারছিস।
আসলে লিয়াকত আলী খানের চেহারা বা তাঁর কথা কিছুই মনে নাই। মনে থাকার কথাও না। বড় হলে আব্বা মাঝে মাঝে বলতেন, তুই তো লিয়াকত আলী খানকে দেখেছিস! বলতাম, না আব্বা আমার মনে নাই। বলতেন, কেনো মিটিং-এর পর আমি যে হ্যান্ডশেক করলাম, তুই আমার কোলে ছিলি। তোকেও একটু আদর করলেন।
আব্বা মুসলিম লীগ করতেন। মুসলিম লীগ নেতাদের তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন, ভালো বাসতেন। আমাদের বসার ঘরে পাকিস্তানের স্থপতি কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কায়দে মিল্লাত লিয়াকত আলী খানের যুগল ছবি বহুদিন টাঙানো ছিলো।
১৯৫৪ সালের দিকে আব্বা দেবীগঞ্জে বদলী হলেন। দেবীগঞ্জ তখন ছিলো বৃহত্তর দিনাজপুরের একটি থানা। এখন দেবীগঞ্জ পড়েছে পঞ্চগড় জেলায়। করতোয়া নদীর পাশে বন-জঙ্গল সমৃদ্ধ একটি পাহাড়ী এলাকার মতো মনে হতো দেবীগঞ্জকে। এখানকার ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। করতোয়া নদী থেকে পাথরের একটি রাস্তা ডোমারের দিকে গেছে, এই রাস্তাটাই ছিলো তখনকার দিনে একমাত্র রাস্তা। এই রাস্তার পাশেই ছিলো আমাদের বাসা। টঙ্গের মতো বাসা। কাঠের গুঁড়ির উপর পাটাতন। তার উপর বাসা। চুন-সুড়কির দেওয়াল। টিনের ছাদ। বাংলো টাইপ। বন-জঙ্গলের সংঝে বা পাশে এমন ঘরই বোধ করি তৈরি করা হয়। দেওয়াল ঘেরা বিশাল বাড়ি। বাড়ির ভেতর আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, বেদানা, ডালিম, জাম্বুরা, পেয়ারা ইত্যাদির গাছ। দু’টি থাকার ঘর ও একটি রান্নাঘর ও স্টোর, এই নিয়ে আমাদের বাসা-বাড়ি। বাড়ির ভেতর কুয়াতলা এবং বাইরে কলতলা। কূপের পানি দিয়ে সব কাজ সারা হতো, শুধু খাবার পানি সংগ্রহ করা হতো টিউবওয়েলের পানি থেকে। এদিক থেকে আমরা সত্যি ভাগ্যবান, শিশুকাল থেকে টিউবওয়েলের পানি পান করার সৌভাগ্য লাভ করেছি, যখন সারাদেশের অধিকাংশ মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করতো নদী, দিঘি, পুকুর বা বিল থেকে। আমাদের বাইরের টিউবওয়েলটাকে ঘিরে সারাক্ষণই একটা জটলা পাকিয়ে থাকতো। আশ-পাশের পড়শীরা এখান থেকেই খাবার পানি সংগ্রহ করতো। (চলবে)

প্রকাশকাল : নভেম্বর ২০১০