পুটুস পুটুস বাদাম ফাটাচ্ছে আর খাচ্ছে আবির ও তাজিম| বাদাম চিবাতে চিবাতেই ক্লাসরুমে এসে ঢুকে মাহিন| ওদের দেখে মাহিন বলে, কীরে বাদাম নিয়ে ক্লাসে ঢুকে গেলি? দে দে, আমারেও দে ক’টা|
একটু হাসি দিয়ে আবির বলে, তোকে দেবো? না থাক, তুই ক্লাস নোংরা করে ফেলবি!
একটা আলতো ঘুষি দিয়ে মাহিন বলে, আমি খেলে নোংরা হবে আর তোরা খেলে ক্লাসটা ফকফকা থাকবে! না দেওয়ার ফন্দি বুঝি? দে জলদি!
হেসে দেয় সবাই| হাসতে হাসতেই আবির বাদাম এগিয়ে দেয়| ঠিক তখনই তাজিম বলে, এবারের বিশ্বকাপে আবারও তাদের সেভেন আপ খাওয়াবো|
মাহিনের হাসি মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়| মুখ ভার করেই মাহিন বলে, আর্জেন্টিনাও ৬ গোল খেয়েছে|
সাথে সাথে আবির বলে জার্মানিও ৮ গোল খেয়েছে| অথচ এরা সবাই একাধিকবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে|
তাজিম প্রসঙ্গ পাল্টে ঝটপট বলে, বাদ দে ওসব| খেলায় এমন গোল হবেই| গোল না হলে কি ফুটবলে মজা আছে? গত বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলাটা কার মনে আছে রে?
– থাকবে না মানে! এমবাপ্পেকে কি ভোলা যায়? মাহিন বলে|
মাহিনের কথায় তাজিম বলে, চ্যাম্পিয়ন হলো আর্জেন্টিনা, আর তুই কি না এমবাপ্পেকে মনে করছিস? মনে করছিলাম তুই আমার হয়ে আর্জেন্টিনার সাপোর্টে কথা বলবি|
গত বিশ্বকাপ মানে ২০২২-এর বিশ্বকাপ| ফাইনালে খেলেছিল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স| মূল খেলা ছিল ৩-৩ গোলের সমতায়| দুই দলের ছয়টি গোলের মধ্যে এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলটি ছিল স্মরণে রাখার মতো|
৮০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ১ গোল পরিশোধ করে ফ্রান্স| তখনো ফ্রান্স ২-১ গোলে পিছিয়ে| পেনাল্টির গোল শেষে কিক-অফের মাধ্যমে আবার খেলা শুরু| আর্জেন্টিনা পুরোপুরি বলের দখল নেওয়ার আগেই ফ্রান্সের মিডফিল্ডার থুরামের পায়ে পড়ে বল| থুরাম দ্রুত এগিয়ে যায়| একটু ডানে থুরামের সামনে দৌড়াচ্ছে সহ-খেলোয়াড় এমবাপ্পে| থুরাম চমৎকার ওয়ান-টু খেলে বলটা এগিয়ে দেয় এমবাপ্পেকে| এমবাপ্পে বলটা ধরে মুহূর্ত সময়ের সাথে সাথে আবার দেয় থুরামকে| মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময়| দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়া ফ্রান্স ততক্ষণে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ভেঙে ফেলে| এমবাপ্পে থেকে বল পেয়ে ঠিক তখনই থুরাম হালকা চিপে বল বাড়িয়ে দেয় ডি-বক্সে| ততক্ষণে এমবাপ্পে ডি-বক্সের ভেতরে প্রায়| এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে বল মাটিতে পড়ার আগেই, শূন্যে শরীর ভাসিয়ে ডান পায়ে মারে জোরালো ভলি! দৃষ্টিনন্দন আর অপূর্ব কারুকাজের সে ভলিতে বল সোজা জালে| গোল! ২-২!
স্মরণীয় এই মুহূর্তটাকে স্মরণ করে মাহিন বলে, এমবাপ্পের ভলিটা কি ভোলা যায়?
তাজিম ও আবির মাথা নাড়ে, কোনো কথা বলে না| মাহিনই আবার বলে, আজ ঢাকা স্টেডিয়াম খেলা আছে, দেখতে যাবি?
তাজিম হতাশার সুরে বলে, না রে! আর দু’দিন পর বিশ্বকাপ খেলা দেখব| এখন এসব গতিহীন অপরিকল্পিত খেলা দেখে মনটা খারাপ করতে চাই না|
সবাই চুপ হয়ে যায়| একটা হতাশা ওদের মনে| অর্ধশত বছর হয়ে গেল, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা তো দূরের কথা; বাছাইয়ের প্রথম ধাপই পার হতে পারে না| ক্লাস শুরু হতে এখনো বাকি আছে| অনেক শিক্ষার্থী এসে গেছে| হই চই, খুনসুটি চলছে| চলছে ছোটাছুটি, লাফ-ঝাঁপ| কেউ কেউ বসার সিট নিয়েও হালকা তর্ক বিতর্ক করছে| ক্লাস শুরুর আগে এমন দৃশ্য বলতে গেলে সবসময়ই হয়| এটাও যেনো স্কুল জীবনের আনন্দেরই একটি অংশ|
আবির, তাজিম, মাহিন- ওরা পাশাপাশি বসেছে| বিশ্বকাপ আর বাংলাদেশের খেলা তুলনা করে ওদের মনটা এখন একটু ভার| আচমকাই তাজিম বলে, আচ্ছা চল&, খেলা দেখতে যাই আজকে|
– হঠাৎ ডিসিশন চেঞ্জ করলি! মাহিন জিজ্ঞেস করে|
আবির বলে, ডিসিশন চেঞ্জের কী আছে? বিকালে ফ্রি আছি খেলা দেখে আসি, চল&| শত হোক, আমার দেশের খেলা তো! প্রিয় দলের খেলা তো!
তাজিম ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে, শোন&, গরিব মানুষেরা বড়লোকের মতো সুখ-আনন্দ করতে পারে না| তাই বলে কি তাদের নিজ¯^ আনন্দ-সুখ বন্ধ থাকে? মোটেই না| ঠিক না কথা?
দুজনেই মাথা নেড়ে জানায়, হ্যাঁ|
তাজিম আবার বলে, ফুটবলের জায়গাতে আমরা হলাম দরিদ্র, গরিব| বিশ্বকাপে যারা খেলে তারা হলো ফুটবলের বড়লোক| তাদের খেলার মতো আমাদের খেলা হবে না; তাই বলে কি আমরা আনন্দ করতে পারবো না? আমরা কি আমাদের ফুটবলকে অবহেলা করব?
– তাহলে? আবির জানতে চায়|
– আমাদের ফুটবল নিয়ে আমরা আনন্দ করবো| দেখবো|
ঢং ঢং ঢং ঘণ্টা পড়ে| ওরা সবাই দৌড়ে চলে যায় অ্যাসে¤^লিতে| অ্যাসে¤^লি শেষে ক্লাসে আসে| স্যার আসেন| ওরা তিনজন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ফিসফিসিয়ে কথা বলে| আজ যাবে খেলা দেখতে| আজকে দেশের অতি পরিচিত দল মোহামেডান আর আবাহনীর খেলা| নিয়মিত খেলা না দেখলেও ওরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখে| ওরা ওদের বাবার মুখে শুনেছে উনাদের সময়ে মোহামেডান আর আবাহনীর খেলার দিন নাকি বাংলাদেশ অঘোষিত ছুটি হয়ে যেত| পুরো ঢাকা শহরের সাথে সাথে সারাদেশে ছাদে ছাদে, বারান্দায় কিংবা মহল্লার কোনো না কোনো স্থানে মোহামেডান-আবাহনীর দলীয় পতাকা উড়তো| সে এক দারুণ দৃশ্য!
কিন্তু আজ আর আমাদের দেশের ফুটবলের সেই জৌলুস নেই| নেই মোহামেডান কিংবা আবাহনীর জৌলুসও|
ক্লাস শেষ করে বিকালে ওরা যায় ঢাকা স্টেডিয়ামে| গ্যালারিতে তেমন ভিড় নেই| তারপরও যারা এসেছে, তাদের চিৎকারে, বাঁশির শব্দে আর ছোট ছোট পতাকার উড়াউড়িতে এক ধরনের আনন্দ উচ্ছ্বাস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে| আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে| খেলা চলছে মোহামেডান ও আবাহনীর মধ্যে|
বলটা একবার এদিক, একবার ওদিক ছুটে বেড়ায়| মাঝে মাঝে ভুল পাস| কখনো অগোছালো আক্রমণ| এমন খেলা দেখে তাজিম মাহিনকে জিজ্ঞেস করে, কেমন লাগছে রে?
– আমার কাছে ভালোই লাগছে|
– কেমন গতিহীন বা অগোছালো মনে হয় না?
– এটা আমার দেশের খেলা, চমৎকার! এবারও ঝটপট জবাব দেয় মাহিন|
তাকে সমর্থন জানিয়ে আবির বলে, দেখ, আমরা এটুকু দেখেই তৃপ্ত| এর বেশি বল আমরা পাবো কোথায়?
হঠাৎ খেলাটা গতি পেয়ে যায়| মধ্যমাঠে মোহামেডানের তরুণ উইংগার আলতাপের পায়ে বল পড়ে| সে হালকা টাচে বল এগিয়ে দেয় সামনে দৌড়ানো মোহামেডানের স্ট্রাইকার রানাকে| সে বল পেয়ে একটুও না থেমে গতিশীল বলটি নিয়েই এগুতে থাকে| কয়েক সেকেন্ড এগিয়ে বামে পাস দেয় মোহামেডানেরই লেফট উইং কবিরকে| প্রতিপক্ষ আবাহনীর ডিফেন্ডার অলোক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করে| বেশ গতিময় হয়ে ওঠে খেলাটা| আবাহনীর অলোকের বাধায় কবির বলটি ব্যাকপাসে দিয়ে দেয় পুনরায় আলতাপের কাছে| আলতাপ পা উঁচিয়ে ইচ্ছে করে বলটা ছেড়ে দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে যায়| তাতেই বলটা আবার ধরে মোহামেডানের স্ট্রাইকার রানা| বলটা পেয়েই আবাহনীর রফিককে ড্রিবলিং দিয়ে মাঝমাঠ দিয়ে সোজা গোলের দিকে আগায়| ওকে আটকাতে আবাহনীর সজীব এগিয়ে আসে দ্রুত| রানাও সাথে সাথে ডানে হাবীবকে পাস দিয়েই সে দ্রুত এগিয়ে যায় আরও সামনে| ˆতরি হয় একটা গ্যাপ| মোহামেডানের রাইট উইং হাবীব বলটা ধরে ওই গ্যাপে থাকা রানাকে আবার দেয়| রানা বলটা পেয়ে এক পা দু’ পা করে একটু এগিয়ে দ্রুত শট নেয় গোলে| বিকট চিৎকার ওঠে স্টেডিয়ামে| মোহামেডানের বল আবাহনীর জাল ছুঁয়েছে|
আবির লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলে, দেখলি, কী অসাধারণ খেললো এখন আমার দেশের খেলোয়াড়রা|
মাহিন আর তাজিমের চোখ চকচক করছে| তাজিম মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলে, হয়তো একদিন… এরকম গোলই বিশ্বকাপেও হবে বাংলাদেশের হয়ে| তখন হয়তো আমরা কিংবা আমাদের পরের প্রজন্ম টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিবে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে|
এক বাদামওয়ালা যায় ওদের সামনে দিয়ে| ওরা বাদাম কিনে| আবার পুটুস পুটুস শব্দে বাদাম ফাটে| আজ পুটুস পুটুসের ভেতরে যেনো অন্য এক ছন্দ| আশার ছন্দ, অপেক্ষার ছন্দ|



