ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে শোজঙ্গর প্রাইমারি স্কুলের প্রাঙ্গণ থেকে। শেষ ঘণ্টা নয় এটি, তবু দেয়াল টপকানোর এই প্রতিযোগিতায় সবাই ছুটছে ফুটবল মাঠের দিকে। কেবল ইয়ামিন পিছিয়ে। তার সরু আঙুলগুলো পিছলে পড়ছে ভেজা ইটের গায়ে। জালাল স্যারের বেতের আঘাতের চেয়ে দেয়ালটাই আজ বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইয়ামিনের জন্য স্কুলের এই দেয়াল শুধু ইট-সিমেন্টের তৈরি নয়, এটি তার অক্ষমতার প্রতীক। সে চায়ও না ওই দেয়াল টপকাতে। তার মন তখন ভেসে বেড়ায় ধানের মাঠে, পদ্মার বুকে, আকাশের নীলিমায়। কিন্তু স্কুলের নিয়ম, প্রতিদিন এই দেয়াল টপকাতেই হবে নইলে জালাল স্যারের বেতের কষাঘাত। আজও ইয়ামিনের হাত পিছলে গেল। সে নিচে পড়ে গেল, আর সবাই হাসতে হাসতে মাঠে ছুটে গেল।
এই নম্র ছেলেটির নাম ইয়ামিন। সে নিজেকে হারাতে ভালোবাসে বাদামি ধানের মাঠের প্রগাঢ়তায়, মহাপ্রবাহী পদ্মার তীর তার খেলার মাঠ, আর নীল আকাশ এই স্বপ্নবাজ ছেলেটির ভ্রমণস্থল। বাদামি ধানের মাঠে হারিয়ে যাওয়া এই স্বপ্নদর্শী কিশোরের জন্য পদ্মা শুধু নদী নয়, এক জীবন্ত সত্তা।
সকালে সে মাছ ধরার জাল গুছিয়ে দেয় বাবাকে। তার বাবা, রহিম মিয়া, পুরো গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ জেলে। পদ্মার বুকে তার জাল ছড়িয়ে পড়ে যেন এক অদৃশ্য জালিকরের হাতের মতো। ইয়ামিনের মা, রাবেয়া, ঘরের কোণে বসে চাল বেছে নেন, মাঝে মাঝে ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে হাসেন। তার ছোট বোন, মরিয়ম, ইয়ামিনের পিছু নেয় সবসময় যেন তার ছায়া।
বিকেলে ইয়ামিন নদীর ধারে বসে শাপলা গোনে। সাদা শাপলাগুলো নদীর বুকে ভেসে বেড়ায়, যেন আকাশের তারা জলে নেমে এসেছে। সে কল্পনা করে, একদিন সে বড় হয়ে নদী পার হবে, দূরের শহরে যাবে, স্কুলে পড়বে, ডাক্তার হবে। কিন্তু তারপরই সে ভাবে, নদী ছেড়ে সে কোথাও যেতে পারবে না। পদ্মা তার রক্তে মিশে আছে।
কিন্তু আজ বর্ষার রাগ দেখে মনে হচ্ছে, পদ্মা যেন লালসায় কাঁপছে।
গ্রামের মাতব্বররা বটতলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছে। ইয়ামিনের বাবা ফিরে এসে শুধু বললেন, ‘জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখো।’
ইয়ামিনের বুকটা ধক করে উঠল। সে জানে, এই কথার মানেই বিপদ। বর্ষার শুরু থেকেই পদ্মা যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। নদীর পানি দিন দিন উঁচু হচ্ছে, গ্রামের কূল ছাপিয়ে যাচ্ছে। রাতভর বৃষ্টি পড়ে- যেন আকাশ ফুটো হয়েছে।
ইয়ামিন রাতে স্বপ্ন দেখে সে গরুর পাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে নতুন জমিতে। সবুজ ফসলের মাঠ, উজ্জ্বল সূর্যালোক। কিন্তু ভোরবেলা মায়ের চিৎকারে ঘুম ভাঙতেই সে দেখে নদীর জল উঠে এসেছে উঠানের সিঁড়ি পর্যন্ত।
বাঁশের খুঁটিগুলো নড়ে উঠল প্রথম ঢেউয়ের সাথে।
ইয়ামিনের হাতের নিচে কাঁপছে মাটির প্রদীপের আলো, যেন তারই মতো ভীতু। গ্রামের দিকে তাকিয়ে সে দেখে, প্রতিবেশী রহিম মাস্টারের টিনের ঘরটা ভেসে যাচ্ছে পানিতে, যেন কাগজের নৌকা।
– ‘বাবা! আমাদের ঘর’
– ‘চুপ! ভেলায় উঠ!’
ইয়ামিনের বাবা নিঃশব্দে বসে রইলেন, তার কর্কশ হাতগুলো খালি। তার মা কাঁদতে কাঁদতে তার বোনকে শেষ শুকনো রুটির টুকরো খাওয়ালেন। আর ইয়ামিন? সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো একসময় যে তাদের জীবিকা দিত, আজ সে তাদের ধ্বংস করেছে এবং ভাবল, পদ্মা এত ক্ষুধার্ত কেন হতে হয়!
পাঁচ দিন পর ত্রাণ শিবিরের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ইয়ামিন আবিষ্কার করল, নদী শুধু ঘরই নেয়নি, ছিনিয়ে নিয়েছে তার স্কুলের খাতা, মায়ের লাল শাড়ি, বাবার জাল বোনার যন্ত্রপাতি।
ত্রাণ শিবিরে মানুষের ভিড়। কেউ কাঁদছে, কেউ চিৎকার করছে, কেউবা নিঃশব্দে বসে আছে, যেন সবাই মৃত। ইয়ামিনের বাবা এখনও কথা বলেন না, নিশ্চুপ ভাবনায় নিমগ্ন থাকেন। তার মা আগের মতো হাসেন না। মরিয়ম এখন সবসময় ইয়ামিনের কাছাকাছি থাকে, যেন ভয় পায় সে হারিয়ে যাবে।
রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে ইয়ামিন শুনল, নদীর ওপারের লোকজন বলছে ‘এই বন্যায় তো কিছুই তলিয়ে যায়নি, শুধু গরিবদের জীবনগুলো ডুবেছে।’
বছর ঘুরে যখন পানি নামল, ইয়ামিনের হাতে জমা হলো নতুন বই।
স্কুল আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু ইয়ামিনের মনে আর সেই আনন্দ নেই। সে এখন ভাবে, এই বইয়ের পাতাগুলোও কি একদিন পানিতে ভেসে যাবে? প্রতিটি বর্ষায় সে জেগে থাকে রাতভর, কানে ভেসে আসে সেই ভয়াবহ ধ্বনি, বাঁশের খুঁটিগুলো ভেঙে পড়ার শব্দ, পানির গর্জন, আর দূর থেকে শোজঙ্গর স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি… যে ঘণ্টা সে আর শুনতে পায় না।
ইয়ামিন এখনও স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার স্বপ্নের মধ্যে এখন ভয় ঢুকে গেছে। সে জানে, পদ্মা আবার ফিরে আসবে। আর তখন হয়তো তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে ফিরে আসে, কিন্তু তাদের চোখে আর আগের সেই আলো নেই। ইয়ামিনের বাবা নতুন করে জাল বুনতে শুরু করেছেন, কিন্তু তার হাতের জাল এখনও শক্তিহীন। মা এখনও রাতে কাঁদেন, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।
ইয়ামিন এখনও নদীর ধারে যায়। কিন্তু সে আর শাপলা গোনে না। সে এখন নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই নদী কি কখনও ক্ষমা করবে? শেষ বিকেলে, যখন সূর্য অস্ত যায়, ইয়ামিনের মনে হয়,পদ্মা যেন রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে। হয়তো এটা শুধুই সূর্যের আলো। নয়তো নদীই তাদের রক্ত চায়।
ইয়ামিন জানে, সে একদিন বড় হবে। হয়তো সে ডাক্তার হবে, হয়তো শিক্ষক। কিন্তু সে কখনও ভুলবে না সেই ভয়াবহ রাত, যখন পদ্মা তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।
আর প্রতিটি বর্ষায়, যখন আকাশ কালো হয়ে আসে, ইয়ামিনের হৃদয় কেঁপে ওঠে,কারণ সে জানে, পদ্মা আবার ক্ষুধার্ত হয়ে উঠতে পারে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



