কী অবস্থা?
কেমন আচ্ছো?
বিশ্বকাপ খেলা দেখছো তো?
দেখতে হবে…! না দেখলে হবে না…!
গত পর্বে তো আমরা বিশ্বকাপের অভিশাপ নিয়ে আলোচনা করেছি। এবারে তাহলে ফুটবল ফ্যানদের নিয়ে আলোচনা করি! বিশ্বকাপের চলমান আমেজ ছাড়া এগুলো তো তেমন জমবে না, তাই না?
এবার ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। প্রতিটি আসরেই কিন্তু কিছু না কিছু রেয়ার মোমেন্ট থাকে, যেগুলো ফুটবল ফ্যানেরাই তৈরি করে। কেমন ফ্যানেরা? এই যেমন মনে করো যে, সম্প্রতি আমেরিকার মেয়র জোহরান মামদানি আর্সেনালের জার্সির আদলে পাঞ্জাবি বানিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করে নেটিজেন মহলকে মোটামুটি অবাক বানিয়ে রেখেছিলো কিছুদিন! যাই হোক। আমরা আমাদের কাজের কথাতে আসি!

প্রিন্স শেখ ফাহাদ :
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ। সেবারের চ্যাম্পিয়ন ছিলো ইতালি। কিন্তু ঘটনা তাদের নিয়ে না! সেই বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেয়া কুয়েতের সাথে ফ্রান্সের ম্যাচ চলমান। বুঝতেই পারছো দুই দলের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। তাই ফ্রান্স খুব সহজেই কুয়েতের জালে বারংবার বল জড়াচ্ছে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ৩-০ হয়ে গেলো স্কোরলাইন। কিন্তু এ দৃশ্য গ্যালারি থেকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না কুয়েতের রাজপুত্র শেখ ফাহাদ আল আহমেদ আল জাবের আল সাবাহ! তিনি একই সাথে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও ছিলেন।
মূল কাহিনি শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। ৭৯ মিনিটে কুয়েত একটি গোল করে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করে। তারপরে খেলা চলাকালে হঠাৎ বাঁশির শব্দ শুনে কুয়েতের সকল খেলোয়াড় দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা দাঁড়ায়নি। তারা এই সুযোগে আরেকটি গোল করে ফেলে। এমন ঘটনায় নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি শেখ ফাহাদ, নেমে পড়লেন মাঠে এবং রেফারি মিরোস্লাভ স্টুপারকে চাপ দিতে থাকলেন। কেনো বাঁশি বেজেছিলো। কিন্তু রেফারি তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হন যে, বাঁশি গ্যালারি থেকে এসেছে। শেষমেশ রাজপুত্রের এমন সপ্তম মেজাজ দেখে রেফারি সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হন। যা ছিলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিরল ঘটনা।
পরে অবশ্য দুজনকেই খেসারত গুণতে হয়েছিলো! রেফারি মিরোস্লাভ স্টুপার আজীবন নিষিদ্ধ হয়। কুয়েতি প্রিন্সকেও জরিমানা করা হয়েছিলো।
হোসে রিচার্ড গ্যালাগো ও তার বন্ধু সিজার দাজা :
কলম্বিয়ার হোসে রিচার্ড মাত্র ৯ বছর বয়সেই Usher’s syndrome এ আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতা তাকে ফুটবল ফ্যান হওয়া থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু সিজার দাজা এমন এক অভিনব পদ্ধতি বের করেছিলেন, যার মাধ্যমে হোসে রিচার্ডকে পাস, ফাউল, কর্নার, পেনাল্টি এবং গোলের উত্তেজনা রিয়েল-টাইমেই বুঝিয়ে দিতেন।
মূলত সিজার একটি ছোট কাঠের বোর্ড ব্যবহার করতেন, যা আদতে একটি ফুটবল মাঠের মতোই দেখতে ছিলো। তিনি নিজের হাত দিয়ে হোসের হাত ধরতেন তারপরে সেই বোর্ডের ওপর হাত রাখতেন এবং বিশেষ কিছু স্পর্শ ও হাতের ইশারার মাধ্যমে সবকিছু বুঝিয়ে দিতেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের সাথে কলম্বিয়ার ম্যাচ চলাকালীন কলম্বিয়ার ৩-০ গোলের জয়ে রিচার্ড এবং সিজারের এমন পদ্ধতিতে খেলা উপভোগ করার মুহূর্তটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো।

ব্রাজিলিয়ান দাদু :
ক্লোভিস অ্যাকোস্টা ফার্নান্দেস। যিনি বিখ্যাত ‘ব্রাজিলিয়ান দাদু’ বা ‘গাউচো দা কোপা’ হিসেবে। তিনি ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে একটানা ৭টি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে গ্যালারিতে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের দ্বাদশ খেলোয়াড়। হাতে একটি ডামি বিশ্বকাপ নিয়ে তিনি ৬০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করে ব্রাজিলের প্রায় ১৫০টিরও বেশি ম্যাচ উপভোগ করেছেন।
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্রাজিল বনাম জার্মানি ম্যাচে ব্রাজিল ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার সময় তার আইকনিক ছবিটা ছিলো পুরো ব্রাজিলের প্রতিচ্ছবি। কাপ বুকে জড়িয়ে কান্নাভেজা মুদিত চোখে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি আজও ব্রাজিলের দুঃখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ম্যাচ শেষে তিনি তাঁর প্রিয় ট্রফিটি একজন জার্মান সমর্থকের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটি ফাইনালে নিয়ে যাও, তোমরাই এটি পাওয়ার যোগ্য।’
ক্লোভিস অ্যাকোস্টা ফার্নান্দেস ক্যান্সারের সাথে ৯ বছর লড়াই করে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৬০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
হাভিয়ের ও তার স্ত্রী :
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ বন্ধুদের সাথে দেখার জন্য মেক্সিকান হাভিয়ের সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু শেষমুহূর্তে বাঁধ সাধে তার স্ত্রী। হাভিয়েরের আর যাওয়া হয় না।
কিন্তু বন্ধুরা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তারা অদ্ভুত মজার কাণ্ড করার পরিকল্পনা করে ফেলেন। তারা হাভিয়েরের একটি হুবহু, লাইফ-সাইজ কার্ড বোর্ড দিয়ে হাভিয়েরের মতো দেখতে হুবহু ছবি তৈরি করে। ছবিটির গায়ে লিখে দেয় যে ‘আমার বউ আমাকে আসতে দেয়নি।’ পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে মেক্সিকোর ফ্যানরা কার্ডবোর্ডটি নিয়ে স্টেডিয়ামে গেছেন। ছবিটিকে দেখিয়েছেন, এমনকি ট্রেনের সিটেও বসিয়েছেন।
এ ঘটনা সোস্যাল মিডিয়ায় এত ভাইরাল হয় যে, শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর স্পনসররা হাভিয়েরের স্ত্রীকে রাজি করিয়ে হাভিয়েরকে ফ্লাইটে করে রাশিয়ায় নিয়ে আসে!
অ্যান্ডি মিলনে :
ইংল্যান্ডের এমন এক পাগলা সমর্থক, যে কি না তার ৬২ বছর বয়সে মোট ৯টি বিশ্বকাপ দেখেছেন। ৮টি পুরুষ বিশ্বকাপ, ১টি মহিলা বিশ্বকাপ। শুধু কি তাই? এবারের বিশ্বকাপ দেখার জন্য নিজের বাড়ি-ঘর পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন!
তোমরা তো জানোই এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের মূল্য কেমন। এবারের বিশ্বকাপে চড়া টিকিট মূল্যের ভীড়ে একজন সমর্থক যদি গ্রুপ পর্বসহ প্রতিটি নক আউট ম্যাচও দেখতে চান, তাইলে তাকে গুণতে হবে ৫,২২৫ পাউন্ড (প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা)! একটু দামি গ্যালারির জন্য তো ১২ হাজার পাউন্ড পার হয়ে যাবে (প্রায় ২০ লক্ষ টাকা)। তাহলে বুঝতেই পারছো যে, কেনো অ্যান্ডি মিলনেকে বাড়ি বিক্রি করতে হলো!
লি কোর্মিশ :
কানাডার একজন নাগরিক। যে কি না এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ দেখার রেকর্ড গড়েছেন। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার থুলানি এনগকোবার ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত বিশ্বকাপে ৩১টি ম্যাচ দেখে সর্বোচ্চ ম্যাচ দেখার রেকর্ড গড়ে রেখেছিলেন।
কিন্তু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এসে লি কোর্মিশ ৪১টি ম্যাচ দেখে রেকর্ডটি নিজের করে নেন!
হেলি গারাগোজো :
অ্যান্ডি মিলনের মতোই আরেকজন খেলা পাগল ভেনেজুয়েলিয়ান ব্যবসায়ী। যে কি না ১৯৮২ থেকে সারা বিশ্ব ঘুরে ঘুরে ৯টি বিশ্বকাপ দেখেছেন। কিন্তু তিনি খেয়ালই করেননি হয়তো যে, তিনি এই ৯টি বিশ্বকাপ দেখতে ভ্রমণ করে ফেলেছেন প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার কিলোমিটার পথ। যা কি না প্রায় ৫ বার পৃথিবী ঘুরে আসার সমান!
আজ এ পর্যন্তই। কথা হবে আগামী কোনো পর্বে অন্য কোনো খেলার গল্প নিয়ে।
প্রকাশকাল: জুুলাই ২০২৬



