ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নস কার্স

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নস কার্স

কী? নাম শুনেই বুঝতে পেরেছো নিশ্চয়, যে এটা খুব ভালো কিছু না! ‘চ্যাম্পিয়নস কার্স বা শিরোপাধারীদের অভিশাপ!’ তো এটা আসলে কী? সেটা নিয়েই আজকের গল্প|

চ্যাম্পিয়নস কার্স মূলত ফুটবলের সাথেই সম্পর্কিত| ধরো, একটা দল এক আসরে বিশ্বকাপ জিতলো| কিন্তু, পরবর্তী আসরে সে গ্রুপ পর্বই পেরুতে পারলো না| মানে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিলো! এটাকেই কার্স হিসেবে ধরা হতো|
কিন্তু আধুনিক যুগে এটা একটা “ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নস কার্স” বা অভিশাপের মতো ট্রেন্ডে পরিণত হলো কীভাবে? সবসময়ই কি এমন ঘটেছে?

উত্তর হলো ‘না’| প্রতিটি বিশ্বকাপজয়ী দল পরের বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়— বিষয়টা এমন নয়| বিশেষ করে ২০০২ থেকে ২০১৮ এর মধ্যে চারটি বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দল গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে| ধারাবাহিকভাবেই এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছিলো| এজন্য মানুষ এ ঘটনাকে এভাবে নামকরণ করে ফেলেছে| তাহলে চলো, এবার জেনে নিই যে, ফুটবল ইতিহাসে এটা কতবার ঘটেছে!
আসলে এটা খুব বেশিবার ঘটেনি| কিন্তু যে সময়টুকু ঘটেছে সেটাই কিছুটা অলিখিত ভাগ্যে পরিণত হয়েছিলো|
তোমাদের মধ্যে অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী দলের কথা? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছো| দলটি ছিলো ফ্রান্স! জিনেদিন জিদানের সেই ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলো| কিন্তু, ২০০২ সালে গ্রুপ পর্বে বিদায় নিয়েছিলো খুব বাজেভাবে| শুধু কি তাই? ফ্রান্স গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচে একটিও গোল করতে পারেনি| উরুগুয়ের সাথে ড্র করলেও সেনেগালের সাথে ০-১ গোলে এবং ডেনমার্কের সাথে ০-২ গোলে পরাজিত হয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিদায় নিয়েছিলো|

রোনালদো, রোনালদিনিও, রিভালদো, রবার্তো কার্লোস, লুসিও, কাকাদের নিয়ে গড়া সাম্বা ফুটবলের দেশ ব্রাজিল ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিতলেও কিন্তু ২০০৬ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়নি!
তাই শুধু ঐ টাইমলাইনের জন্য ব্রাজিলকে ব্যতিক্রম বলা যেতেই পারে!

এবার একটু মনে করো ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের কথা? কী? ইতালির নাম মনে পড়তে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই? কেননা গত ২০১৪ সালের পরে যে তাকে আর বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতেই দেখোনি|
কারণ, তারা তো ২০১৮, ২০২২ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতেই পারছিলো না| ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলার টিকেট নিতে পারেনি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা| অনেক যদি-কিন্তুর পরে সুযোগ হলেও হতে পারে, যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকার করে তবে!

যাই হোক, আমরা আমাদের মূল গল্পে ফিরে আসি! তো, ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন পাউলো মালদিনি, জিয়ানলুইজি বুফনের ইতালিকে ২০১০ সালে আফ্রিকায় আয়োজিত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিতে হয়| শুধু তাই নয়! ইতালির একটিও ম্যাচ না জিতে গ্রুপ পর্বে বিদায় নেয়া ছিলো ১৯৭৪ সালের পরে ঘটা প্রথম ঘটনা! দুর্ভাগ্য কাকে বলে, বর্তমানে এটা ইতালির থেকে কেউ মনে হয় ভালো চিনে না|

২০১০ সালে উদীয়মান ইনিয়েস্তা, জাবি, ডেভিড ভিলা, শাবি আলোনসো, সার্জিও রামোস, ইকার ক্যাসিয়াসদের বিশ্বকাপ জেতা দল ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে টেবিলের ৩ ন¤^রে থেকে বিদায় নেয়| অস্ট্রেলিয়ার সাথে ৩-০ ব্যবধানে জিতলেও নেদারল্যান্ডসের সাথে ৫-১, চিলির সাথে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিলো| ২০১০ বিশ্বকাপে ফাইনালে হেরে যাওয়া নেদারল্যান্ডস প্রতিশোধটা একটু বেশিই কড়া নিয়ে ফেলেছিলো!

২০১৪ সালের ঘটনাবহুল বিশ্বকাপ সম্পর্কে তো অনেকেই জানো| জার্মানি ছিলো উড়ন্ত ডাইনোসর| যাকে সামনে পেতো তাকেই ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলতো| ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর ঘটনা তো ইতিহাসে জায়গা করেই রেখেছে|

তো, ২০১৪ সালে মেসুত ওজিল, থমাস মুলার, টনি ক্রুস, ফিলিপ লাম, মিরোস্লাভ ক্লোসা, ম্যানুয়াল নয়ারের দল আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলো| কিন্তু ২০১৮ সালে এসে জার্মানির অমন ভরাডুবি কেউ প্রত্যাশা করেনি আসলে| টেবিল টপার সুইডেনের সাথে ২-১ গোলে জিতলেও মেক্সিকোর সাথে ১-০ এবং সাউথ কোরিয়ার সাথে ২-০ গোলের পরাজয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিদায় নিতে হয়|
‘হাতি কাদায় পড়লে নাকি পিঁপড়াও লাথি দেয়!’
তারপরে অবশ্য এই কার্স আর কাজ করেনি| ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স কিন্তু ২০২২ সালেও ফাইনাল খেলেছে|

তোমরা অবশ্য বলতেই পারো যে, ২০০২ থেকে তো চ্যাম্পিয়নস কার্স ট্রেন্ড হিসেবে চলে আসছে| কিন্তু তার আগে কি কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি?
হ্যাঁ| ঘটেছে| এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে| কিন্তু ২০০২-২০১৮ এর মতো ধারাবাহিকতা ছিলো না কখনো|
– ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপ জেতা ইতালি পরবর্তী আসর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিয়েছিলো| ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়নি|
– ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালে পরপর দুইবার বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিল ১৯৬৬ সালে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়|
তাহলে এবারে ২০২৬ সালে কি সেই অভিশাপ আবার ফিরে আসবে ২০২২ বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনার জন্য? সেটা সময়ই বলে দিবে! আজকের মতো বিদায়|