রাজধানী ডাকার থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে বাম্বালির সেদিউ নামক গ্রামে তার জন্ম। সেনেগালের অন্যান্য গ্রামের মতো এটিও ছিলো খুবই দরিদ্র। বাবা ছিলেন স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। গ্রামে চিরাচরিত কাজ ছিলো পশু চড়ানো অথবা কৃষি। দুয়েকজন যারা এগুলোর গণ্ডি পেরোতে চাইতো, তারা সর্বোচ্চ গৎবাঁধা পড়াশোনার দিকেই ছুটতেন। আশপাশের ৩৪ টি গ্রামের মধ্যে ছিলো না কোনো হাসপাতাল। স্থানীয়রা সন্তান জন্মদান করতো নিজ বাড়িতেই। অসুখ হলেও ছিলো না কোনো চিকিৎসার সুযোগ।
তেমনই এক কুঁড়েঘরে জন্ম নেওয়া শিশুটিরও আর সুযোগ হয়নি পরিবারের দরিদ্রতা ছাপিয়ে পড়াশোনা করার। মাত্র ৭ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় জীবন হয়ে পড়ে আরো কঠিন।
কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ২০০২ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে সেনেগালের ভালো পার্ফরম্যান্স ফুটবলের প্রতি আলাদাভাবে দাগ কেটেছিলো ১০ বছর বয়সী শিশুটির মনে।
যেখানে তিন বেলা মুখে দেয়ার খাবার পাওয়া ছিলো দুষ্কর, সেখানে ফুটবলের প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়া বিলাসিতা আর সময় অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।
পরিবারের অপছন্দনীয় জেনেও ছেঁড়া জুতো জোড়া অথবা খালি পায়েই ছুটতো মাঠের দিকে। ফুটবল না থাকলেও জাম্বুরা, কাপড়ের তৈরি বল বা অন্য কোনো শক্ত জিনিস নিয়েই হতো খেলা।
১৫ বছর বয়সে যখন বাড়ি থেকে কোনোভাবেই ফুটবল খেলার ব্যাপারে সমর্থন পেলো না, তখন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গেল অজানা অচেনা বন্ধুর পথে। যেখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের পরিবর্তন!
হ্যাঁ! বলছিলাম সেনেগালের পোস্টার বয় ‘সাদিও মানে’র গল্প।
তো পরিবারের লোকজন কোনো খোঁজ না পেয়ে হাল ছেড়ে দেয়। তার প্রায় ১ বছর পরে বাড়িতে ফোন করে মায়ের সাথে কথা বলে মানে। জানায় যে, সে এখন ফ্রান্সে! তার মা তো বিশ্বাস করে না। ভাবে যে, এখনও সেনেগালের কোনো এক প্রান্তেই হয়তো আছে তার ছেলে। কিছুদিন পরে যখন ছেলেকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পান, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তাদের ছেলে তাদের ভাবনার সকল গণ্ডি পেরিয়ে স্বপ্নপূরণ করতে চলে গেছে।
পরের গল্পগুলো মানের ইউরোপ জয়ের। ক্যারিয়ারের প্রথম ক্লাব ছিলো ফ্রান্সের ‘মেৎজ’। সেখান থেকে গন্তব্য পরিবর্তন হয়ে সাদিও মানে চলে যায় অস্ট্রিয়াতে। রেড বুল সালজবার্গের হয়ে ৮৭ ম্যাচে ৪৫ গোল এবং ৩২ অ্যাসিস্টের পরে তাঁর দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতা ও গতি নজর কাড়ে ইংল্যান্ডের। এরপর চলে আসেন প্রিমিয়ার লিগের সাউদাম্পটনে। সেখানে তিনি প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাট্রিকের রেকর্ড গড়েন মাত্র ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের মধ্যে ৩ গোল করে। অতঃপর সাউদাম্পটনের হয়ে ৭৫ ম্যাচে ২৫ গোল ও ১৪ অ্যাসিস্টের পরে চলে যান প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ও সফল ক্লাব লিভারপুলে। সেখানেই সারা বিশ্ব ভালো করে চিনতে পারে সাদিও মানেকে। ৬ বছরের সফলতা শেষে পাড়ি জমান জার্মানির জায়ান্ট ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে। সেখানে এক বছর অতিক্রান্ত করার পরে বর্তমানে সৌদি আরবের প্রো-লিগে আল নাসরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সতীর্থ হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন।
সাদিও মানে তাঁর এই তারকা খ্যাতি এবং খেলোয়াড়ি জীবনে শুধু নিজেকে নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি তার সেই পুরনো অজপাড়া গাঁ এবং সেখানের মানুষের দুঃখ দূর্দশার কথা ভুলে যাননি।
সাদিও নিজ গ্রামে হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন। তৈরি করেছেন স্কুলও, যে স্কুলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়া হয়।
নতুন একটি গ্যাস স্টেশন তৈরিতেও করেছেন অর্থায়ন। গ্রামের শিশুদের মাঝে বিতরণ করেছেন ক্রীড়াসামগ্রী এবং তৈরি করে দিয়েছেন স্টেডিয়াম। এছাড়াও ডাকঘর, এমনকি একটি শহরের জন্য ৪জি নেটওয়ার্কের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন সাদিও মানে। সেনেগালের এই অতিদরিদ্র অঞ্চলের সবাইকে প্রতি মাসে ৭০ ইউরোও দিয়ে থাকেন মানে।
হাসপাতাল তৈরির পেছনে তার ৭ বছর বয়সের একটি স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“
আমরা সেদিন একটি মাঠে খেলছিলাম। এ সময় আমার এক চাচাতো ভাই এসে বলল ‘ সাদিও, তোমার বাবা মারা গেছে’। আমি উত্তর দিই, তুমি কি সত্যি বলছো!’ আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো মশকরা করছে। আমি সত্যিই বিষয়টি বুঝতে পারিনি। বাবার পেটে ব্যথা ছিল। কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল না থাকায় স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কিছু ওষুধ দিয়ে ব্যথা সারানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয় না পরে চিকিৎসার জন্য তাকে পাশের একটি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেখানেই তিনি মারা যান।
”
২০১৯ সালে মানের একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর গভীর জীবনবোধ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন,
“
আমি কেন ১০টি ফেরারি গাড়ি, ২০টি ডায়মন্ডের ঘড়ি বা ২টি বিমান কিনবো? আমি চাইলেই এগুলো কিনতে পারি। কিন্তু এই জিনিসগুলো আমার এবং বিশ্বের জন্য কী কাজে আসবে?
”
“
আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম এবং একসময় মাঠে কাজ করতাম। কঠিন সময়ে আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে, আমি ফুটবল খেলেছি খালি পায়ে। আমার লেখাপড়ার সুযোগ এবং আরও অনেক কিছু ছিল না। কিন্তু আজ ফুটবলের মাধ্যমে যা উপার্জন করি তা দিয়ে মানুষের সাহায্য করতে পারি।
”
সাদিও মানে এক সময় তার ভাঙা আইফোন ব্যবহারের জন্যেও বিশ্বব্যাপী আলোচনায় ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন যে, এটা তার এক বন্ধুর দেয়া উপহার তিনি তার বন্ধুর প্রতি সম্মান জানাতেই ফোনটি পরিবর্তন করেননি।
চ্যারিটি তো অনেকেই করে। কিন্তু সাদিও মানে চান যে, তার এই দানের কথা, সমাজসেবার কথা বাইরে প্রচার না করতে। শুধু যে দান করতেন, তা না। তাকে মসজিদের ওজুখানা পরিষ্কার করতেও দেখা গেছে। ভালো কাজের জন্য তার তারকাখ্যাতি কখনোই তার বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
সাদিও মানে হচ্ছেন এমন একজন যিনি চাননি তার অতীত ভুলে যেতে, চাননি বিলাসিতা ও তারকাখ্যাতিতে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলতে, চাননি নিজেকে মানুষের স্পর্শের বাহিরে নিয়ে যেতে। তিনি সর্বদা নিজ অতীতকে আঁকড়ে ধরে নিজ সম্প্রদায় ও নিজ দেশের মানুষের জন্যেই কাজ করে যেতে চেয়েছেন।
তিনি তার সম্প্রদায়ের জন্য হয়ে আছেন ‘অসাধারণের মাঝেও খুবই সাধারণ একটি তারকা। যাকে ছোঁয়া যায়, ধরা যায়, স্পর্শ করা যায়।’
লিভারপুলের স্লোগানটা যেন নিজ গ্রামকে বলা সাদিও মানের অব্যক্ত কথা – “You’ll Never Walk Alone”
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



