[গত সংখ্যার পর]
কিছুক্ষণ পর একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে বলে- ওই ছাগলটাকে আমি কত উপকারই না করেছি। তার রাজত্বকালে ইগোধবির বডিগার্ড ছিলাম এই আমি। সারাক্ষণ তাকে চৌকি দিয়েছি। তার নিরাপত্তার খাতিরে রাতে ঘুমাইনি পর্যন্ত।
ভেড়া এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে। কেঁদে কেঁদে বলে- আমিও কি রাজাকে কম উপকার করেছি? আমার গা থেকে প্রতি বছর উল কেটে দিয়েছি তাকে। শীতকালে সেই উলের ওমে তার বাচ্চাদের নিয়ে তিনি আরামে রাত কাটিয়েছেন। অথচ রাজা আমাকে কতই না অপবাদ দিলেন। আমি নাকি ঘাসপাতা লতা খাই। যেখানে সেখানে মুখ দিই। বলি, আমি এত খাই বলেই তো রাজাকে বস্তা বস্তা উল দিতে পারি। আমার এই উপকারের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন রাজা!
এবার শূকর রাগে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বলে- আমাকেও কি কম জ্বালিয়েছে ইগোধবি? নানা অপবাদ দিয়েছে আমাকে! আমি নাকি ময়লা আবর্জনার মধ্যে থাকি। কাদা-কচু খাই। ধুলাবালু ও নোংরা জায়গা বেশি পছন্দ নাকি আমার। বলি, আমার ওই ময়লা আবর্জনাটাই রাজার চোখে পড়ল? আমি যে মস্তবড় এক চাষি, সেকথা বেমালুম ভুলে গেলেন তিনি? আমার কাজের কোনোই স্বীকৃতি নেই? রাজার বিঘা বিঘা জমির মাটি আমি নাক দিয়ে গুঁতিয়ে, উল্টিয়ে পাল্টিয়ে চাষ করে দিয়েছি। শূকর আরো বলে- ছোট্ট উইপোকার মন নিয়ে কি রাজাগিরি করা যায়? এতোদিন রাজা থেকেও নিজের মনটাই বড় করতে পারেননি ইগোধবি।
শূকরের কথার রেশ ধরে গাভি আবার বলে- কী ভেবেছে ইগোধবি! চিরকাল রাজা থাকতে চান তিনি? নিজেকে তিনি কী মনে করেন? বড় লাটসাব হয়ে গেছেন বুঝি?
এভাবে বিড়ালের রাজসভায় ছাগলের বিরুদ্ধে উষ্মার ফুলঝুরি ফুটতে থাকে। পুরনো রাজার নির্বুদ্ধিতায় অনেকে হাসাহাসিও করে। অনেকে নাচানাচি করে। এটা ওটা বলাবলি করে। ইগোধবিকে এখন ভয় নেই কারোর। তাছাড়া সবাই যখন এক সাথে, তখন ভয় কীসের! আসুক দুর্ভিক্ষ। ওসব থোড়াই কেয়ার। সবাই একত্রে থাকলে ঝড়ঝঞ্ঝা কিছুই করতে পারে না।
পরিশেষে বিড়ালরাজা মেলোডি সবার মতামত শুনে ঘোষণা করলেন- ভাইসব, তোমরা শোনো তাহলে। প্রথমে তোমাদের মধ্য থেকে একজন চলে যাও ইগোধবির কাছে। তাকে এই বার্তা দিয়ে আসো যে, এখন থেকে রাজভাণ্ডারে তাকে খাদ্যশস্য জমা দিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে কারো কোনো ছাড় নেই। আইন সবার জন্যই সমান। এটাই নতুন রাজা মেলোডির সিদ্ধান্ত। কেউ একজন গিয়ে ছাগলকে এ আদেশ শুনিয়ে আসো।
রাজার এমন আদেশ পেয়ে একটি শালিক পাখি চলে যায় ইগোধবির কাছে। ছাগল রাজার পরম বন্ধু ছিল এই শালিক। সে মাঝে মধ্যেই রাজা ইগোধবির গায়ের উকুন বেছে দিতো। কিন্তু এখন সে খেপেছে খুব। তাই শালিকই প্রথমে রাজি হয় নতুন রাজার সিদ্ধান্ত পুরান রাজাকে জানিয়ে দিতে। সাথে করে সে নিয়ে যায় রাজদরবারের ঘোষণাপত্র। পুরান রাজা ইগোধবির কানের কাছে গিয়ে শালিক ঘোষণাপত্র পাঠ করে শুনায়। কিন্তু এতেও ছাগলের ঘাড় সোজা হয় না। সেই আগের মতোই ঘাড় কাত করে থাকেন তিনি। ইগোধবি তার পুরনো গদির উপরই বসে থাকেন। তাকে কেউ মানুক আর না-ই মানুক, তিনি নিজেকে রাজা সাজিয়েই বসে থাকেন।
রাজা মেলোডি এবার তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মচারী গাভিকে পাঠালেন। গাভিকে বিড়াল রাজা বলে দিলেন- যাও, ছাগলটাকে ধরে নিয়ে আসো। সাথে করে মোটা একগাছি দড়ি নিয়ে যাও। আসতে না চাইলে তাকে বেঁধে নিয়ে আসবে দরবারে। গাভিকে সহযোগিতা করার জন্য তার সাথে আরো পাঁচ-সাতটা পশুকে পাঠানো হলো। বলে দেয়া হলো, ছাগল স্বেচ্ছায় আসতে না চাইলে তাকে জোর করে বেঁধে নিয়ে আসবে। কোনো রকম গড়িমসি করলে গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসবে দরবারে। রাজার আদেশ অমান্য করায় ইগোধবিকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
নতুন রাজার আদেশ পেয়ে সবাই মহাউল্লাসে ফেটে পড়ে। সোৎসাহে সবাই ছাগলের পুরনো প্রাসাদে চলে যায়। সাথে এক গাছি দড়ি নিতেও ভুলে না কেউ। গিয়ে দেখে, ছাগল ইগোধবি সেই আগের ভঙ্গিতেই পুরনো গদিতে বসে আছেন। পায়ের ওপর পা তুলে মুখ গোমড়া করে বসে আছেন তিনি।
আমি বিড়ালের দরবারে যাব না। সবাইকে দেখে ইগোধবি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে চিৎকার দেন। তারপর বলেন- আমিই এই বনের রাজা। অন্য কেউ রাজা হতে পারে না। এক বার যে রাজা হন, তিনি চিরকালই রাজা রয়ে যান।
ছাগলের কথা শুনে ভেড়া বলে, হে আমাদের পুরনো রাজা! আপনার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, আপনি স্বেচ্ছায় চলুন। তা না হলে, আঙুল আমাদের বাঁকা করতে হবে। আমরা আপনাকে এই দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাব। স্বেচ্ছায় গেলে সেটাই হবে আপনার বুদ্ধিমানের কাজ। তা না হলে, এই দড়ি গলায় উঠবে আপনার। আপনাকে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাব আমরা।
কিন্তু ছাগলের সেই একই কথা। তিনি যাবেন না। নতুন রাজার দরবারে যাবেন না ইগোধবি। মেলোডিকে তিনি রাজাই মানেন না। ছাগল ঘাড় কাত করে বসে রইলেন।
অবশেষে সবাই মিলে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরল ছাগলকে। তারপর গলায় পরিয়ে দেয়া হলো দড়ি। দড়ির অন্যপ্রান্ত গাভির লেজের সাথে টাইট করে বাঁধা হলো। গাভি এবার হাঁটতে শুরু করে। সেই সাথে টান পড়ে ছাগলের গলায়। কিন্তু ছাগল যাবেন না! সামনের পা দুটো মাটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। গাভির লেজে বাঁধা দড়িতে টান পড়ে ছাগলের গলায়। টান যতই বাড়ে, ছাগলের ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো ততই শক্ত হয়ে ওঠে। রাজ দরবারে কিছুতেই যাবেন না ছাগল।
অন্যরাও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। তাই, অন্য প্রান্তে গাভির লেজে বাঁধা দড়ি ধরে টানতে শুরু করে সবাই। এবার ছাগলের গোঁয়ার্তুমী আর দেখে কে? গাভি যতই সামনে এগোয়, ছাগল ততই শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সামনের দু’পা ঠেস দিয়ে এমনভাবে দাঁড়ায়, যেন টেনে টেনে তাকে কেউ সরাতে না পারে।
উমবির দাদু নাকাসাঙ্গো বলেন- সে এক এলাহি কাণ্ড ঘটে যায় দাদু! দেখার মতোই দৃশ্য বটে। ছাগলের গলায় দড়ি বেঁধে সবাই টানছে। কিন্তু ছাগল নড়ছে না, ঠায় দাঁড়িয়েই আছে।
গাভির টানাটানি আর ছাগলের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো দেখে পশুর দল খুশিতে হাততালি দেয়। ‘হুর রে হো, হুর রে হো, হুর রে হো’! চিৎকারে মুখরিত হয় চারদিক। পশুরা সবাই স্লোগান দেয় :
‘জোরছে টানো মারো টান-
ছাগল রাজার নেইরে মান’।
‘নতুন রাজার দরবারে-
হিঁচড়ে টেনে নিই তারে’।
‘হেই-ও ওরে হেই-ও-
ছাগল রাজা গেঁইও’!
‘এই ছাগলের শরম নাই-
হাততালি দে তাইরে নাই’।
এভাবে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় বনরাজ্য।
উমবির দাদু এবার বলেন, ‘শুনলে তো দাদু? এই হলো ছাগলের ঘাড়ত্যাড়ামির গল্প। তখন থেকে ছাগলের গলায় দড়ি বেঁধে টানাটানি করলে, ছাগল আর সামনে বাড়ে না। ভাবে, তাকে বুঝি বিড়ালের রাজ দরবারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যতই তুমি দড়ি ধরে টানো, ছাগল ততই শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। একটুও নড়ে না, একটুও চড়ে না।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



