একে ধরিয়ে দিন।
চিকন সরু গোঁফ। চেহারা শ্যামলা। চিকন-চাকন দেহ, ছয় ফুট লম্বা। যশোরের চলনসই একটা ভালো দৈনিকে ছবিসহ প্রকাশিত হয়েছে।
একে ধরিয়ে দিন। ধরিয়ে দিলে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে। যশোর হতে বাই পোস্টে পত্রিকার নিউজের ফটোকপি এসেছে শান্তর কাছে। সেই থেকে চিন্তার শেষ নেই। সাদুন, সজল, সুজন, অপু, সোহেল সবাই মিলে গোল বৈঠকে বসে গেল সন্ধ্যার পর।
তাহলে লোকটা যশোর থেকে পালিয়ে ঢাকার মিরপুরে আশ্রয় নিয়েছে। সাদুন ভাবতেই অবাক হচ্ছে বারবার। শিহরিত হচ্ছে সজল। শান্তর ডাকে ঘোর কাটে সজলের। বলে চটপট ডিসিশন নিতে হবে আমাদের। সময় নষ্ট করা যাবে না।
শান্ত সাবধান আর সতর্ক থাকতে বলে সবাইকে। লোকটা যেনো কোনো মতেই টের না পায়।
একদম। আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অপু বলে। ওর সাথে সাথে সবাই সায় দেয়।
আমাদের প্রথম কাজ হবে লোকটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাদের কন্ট্রোলে রাখব। প্রয়োজনে পৃথক পৃথকভাবে লোকটার সাথে গল্প গুজব করে ভালো বন্ধুত্ব তৈরি করতে হবে।
সবাই মনোযোগ দিয়ে শান্তর কথাগুলো শুনছে।
এই বিষয়ে সজল, সুজন অপু আর সোহেল লোকটিকে নজরবন্দি করে রাখবে। আমি আর সাদুন যোগাযোগ রাখব মিরপুর মডেল থানায়। ওসিকে সবকিছু খুলে বলে একজন অফিসারকে সাথে নিয়ে নেবো।
আজ এই পর্যন্ত। আমরা যে যার বাড়িতে চলে যাই। সবাই মোবাইল অন রাখবা। দরকার পড়লে ফোন করে ডেকে নেবো।
প্রতিদিনের মতো বিকেলে সবাই পত্রিকা পড়ে। সজলের বাসার পাশে দেয়ালে দৈনিক পত্রিকা সেঁটে দিয়ে যায়। অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে ওদের। একদিন পত্রিকা না পড়লে যেন পেটের ভাত হজম হয় না।
পত্রিকার ওপর চোখ রেখে সজল সুজনকে বলে, বন্ধু সামনের বাড়ির দোতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। চিনিস নাকি?
সুজন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সজলের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে, হেব্বি ইন্টারেস্টিং! চিনতে কতক্ষণ। চল আজ যাই সবাই মিলে।
কথা শুনে সজল বিরক্তিভাব প্রকাশ করে। আমি বলছি কী, আর তুই শুনলি কী? যদি না চেনার ভাব করে বাসায় ঢুকতে না দেয়। কিংবা গেট থেকেই বিদায় করে দেয়। তাহলে তো অপমান বোধ করবো। তোরা যা ভাবিস।
– পাগল হলি নাকি?
– কাঁচা কাজ আমি করি না।
চল না, গিয়েই দেখি লোকটা কী বলে?
বেশ। চল চল। সবাই এক বাক্যে সায় দেয়। যেমন ভাবা তেমন কাজ।
সবাই সারিবদ্ধভাবে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসে। কলিং বেল চাপতেই পাখির সুর ভেসে ওঠে। টিয়া পাখির কণ্ঠস্বর।
দরোজা খুলতেই সেই অচেনা লোকটির মুখাবয়ব সামনে এসে দাঁড়ায়। সবার বুক দুরুদুরু করছে। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে লোকটাকে দেখে।
আরে তোমরা? এসো এসো। ঘরের ভেতরে এসে বসো।
লজ্জার কিছু নেই। তোমরা চলে এসো ভেতরে। লোকটার কথায় প্রাণ ফিরে পায় সবাই। হুড়মুড় করে ড্রয়িং রুমে ঢুকে পড়ে।
আহ! বেহেশতখানা!!
মুখ ফসকে বলে ফেলে সজল।
সুজন এক মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, বুঝলি তোরা। মালদার পার্টি। আজ সেভেন আপ, মোজো না খেয়ে উঠছি না।
তাতো বুঝলাম। পরিচয় পর্ব সারতে পারলাম না, খাই খাই করলে কপালে ছাই পড়বে, সাদুন বলে।
শান্ত হিস হিস করে সবাইকে থামিয়ে দেয়। নরম গদির সোফাসেটের ওপর বসে দরোজা বরাবর তাকিয়ে থাকে। লোকটি ঘরে ঢুকতেই একে একে সালাম দিয়ে পরিচয় পর্বটা সেরে ফেলে।
– আমি শান্ত।
– আমি সাদুন
– আমি সজল
– আমি সুজন
– আমি অপু
– আমি সোহেল।
– আমরা সবাই এপাড়ার স্থানীয়। আপনি? শান্ত বলে।
– বেশ। বেশ। খুব খুশি হলাম। আমার নাম পলক খাকি। দশ বছর বিদেশ করে গত মাসে উগান্ডা থেকে দেশে ফিরেছি। এই পাড়ায় আমি নতুন। তাই ভেবেছি আমি তোমাদের ডেকে নিয়ে পরিচয় পর্বটা সেরে নেবো। এখন দেখছি আমার প্রতি তোমাদের অনেক আগ্রহ আর আন্তরিক টান রয়েছে। বসো তোমরা। আজ রাতে সবাই মিলে একসাথে ডিনার করবো বাসায় বসে।
ব্যস। কথায় কথায় অনেক কথা। লোকটির স্ত্রী বিদেশেই আছে বলে জানায়। কথার ফাঁকে সজলের দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার নাম তো সজল। ডাইনিং রুমে ফ্রিজ আছে। সেখান থেকে কোল্ড ড্রিংস নিয়ে এসো। টেবিলের ওপর কিছু ফলফলারি আছে, সেগুলো সাইজ করে নিয়ে এসো।
আচ্ছা ভাই। বলে সজল চলে গেল পাশের ঘরে। গল্প চলতে লাগলো সমান তালে ওদের মধ্যে। এর ফাঁকেই লোকটি রাতের খাবারের অর্ডার করে দিলো মোবাইলে।
জম্পেশ আড্ডা চলছে ওদের মধ্যে।
ডাইনিং রুমের পুরোটাই ‘খুব পরিপাটি’ সাজানো গোছানো। এক কথায় চমৎকার।
তার পাশের একটা রুম তালাবদ্ধ। উঁকি মেরে দেখে অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। আচানক চোখ পড়ে টেবিল পড়ে থাকা ডায়রির ওপর। হাত বাড়িয়ে নিয়ে পাতা উল্টে দেখে সজল। একের পর এক পাতা উল্টাতে থাকে ও। মাঝখানের পাতায় এসে থমকে দাঁড়ায়। ছবির প্যাকেট। ওপরে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা সাজু আহমেদ। যশোর স্টুডিও। চট করে ছবিগুলো মোবাইলের ক্যামেরা বন্দি করে নেয়। খটকা লাগে মনের ভেতর। লোকটা পরিচয় পর্বে বলেছে পলক খাকি। এখানে লেখা সাজু আহমেদ। যশোরের একটা বাড়ির ঠিকানা লেখা খামের ওপর।
ড্রিংসের বোতলগুলো টেবিলের ওপর রাখে। কেক বিস্কুট সাজিয়ে ফলফলারি কেটে নিয়ে চলে আসে ড্রয়িং রুমে। খাবার সমেত সজলও গল্পের আসরে যুক্ত হয়।
এমন সময় কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসে। দরোজা খুলতেই ডেলিভ্যারি ম্যান খাবার দেয়। পলক সাহেব বিল চুকিয়ে দিয়ে বিদায় করে লোকটিকে।
নাশতা খাওয়ার সাথে সাথে গল্প চলল রাত দশটা নাগাদ। রাতের ডিনার সেরে ওরা যে যার বাড়িতে ফিরে গেল।
এটা কী করে সম্ভব সজল! সোহেল জানতে চায়। সবাই হুড়মুড় করে ঝুঁকে পড়েছে সজলের মোবাইলের ওপর। একটার পর একটা ছবি দেখছে। শান্ত বলে পলক সাহেবের কথায় তো আমরা বুদ হয়ে গেছি। আমাদের গাড়ি কিনে দেবে। সেই গাড়িতে চড়ে চাইনিজ খেতে যাবো। দূর দূরান্তে ভ্রমণ করবো। আমরা পলক সাহেবের ব্যবসায়িক পার্টনার হবো। আমাদের অনেক ইনকাম বেড়ে যাবে। রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাবো। গড়গড় করে অপু বলে গেল। সোহেল বলে এক কাজ করা যায় না?
কী কাজ? সমস্বরে সবাই জানতে চায়। লোকটার কথামতো প্রতিদিন সন্ধ্যার পর গল্পের আসর জমাবো। লোকটার কাজ কী এটা জানতে হবে। লোকটাকে কোনোমতেই বুঝতে দেবো না আমরা অনেক কিছু জানি।
আর? সাদুন জানতে চায়।
আর এই ফাঁকে ঠিকানা বরাবর যশোরে উড়ো চিঠি লিখে পাঠাই। তবে বিস্তারিত লিখে পাঠাবো। যেমন কথা তেমন কাজ। শান্ত লিখে লিখে ফেলল এক মহাকাব্য। যথারীতি পোস্ট করা হলো কুরিয়ারের মাধ্যমে যশোরে। শান্ত ঠিকানায় নিজ মোবাইল নাম্বার টুকে দিতে ভুললো না।
চিঠির উত্তর আসার অপেক্ষায় দিন গুনতে লাগলো ওরা। এর মধ্যে প্রতিদিনের জম্পেশ আড্ডার আয়োজনটাও দিনে দিনে গভীর হতে লাগলো।
এর মধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্তকরণ করা হয়েছে।
যত দিন যাচ্ছে পলক সাহেব তার রূপ পাল্টাতে শুরু করলো। টের পেয়ে ওরাও সতর্কতার অবস্থান নিয়েছে। লোকটাকে বুঝতেও দেওয়া হয়নি কোন বিচ্ছুর খপ্পরে পড়েছে বাছাধন।
আজ দুপুরে চিঠিটার উত্তর ফেরত আসতেই আচমকিত লাফিয়ে ওঠে শান্ত। সবাইকে ডেকে জানিয়ে দেয়, আজ রাতে যা করার করতে হবে।
রাত বারোটা ঘড়ির কাটায়। থানায় সজল সুজন অপু আর সোহেল বসে আছে। খায়রুল দারোগাও সঙ্গে আছেন। তিনি শীতল গলায় বললেন, দেখো তোমরা বলছো অ্যারেস্ট করতে। ওর নামে যশোর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। আমি এক কাজ করি যশোর থানায় ফ্যাক্স বা মেইল করে দেই। আজ রাতে বিমানে করে যেনো ঢাকায় চলে আসে। তারপর ওদের সাথে নিয়ে একসাথে ঝটিকা অভিযানে যাবো। আমাদের আগ্রহ ওই তালা বদ্ধ ঘরে কী আছে ?
আজ গভীর রাতেই ওকে অ্যারেস্ট করবো। যশোর থানাকে সকল প্রকার সহযোগিতা করব আমরা। সাথে তোমরা থাকবা।
ঘড়ির কাটা রাত একটায় ছুঁই ছুঁই করছে। রাস্তা ফাঁকা। সুনসান রাত। মাঝেমধ্যে দুই একটা গাড়ি আসা যাওয়া করছে। রাতের রিকশাগুলো চলাচল করছে থেমে থেমে। পাড়ায় পাহারারত পাহারাদারের বাঁশির শব্দ কানে ভেসে আসছে। ওরা সবাই থানার সামনে পায়চারি করছে। থানার এক কোণায় চায়ের দোকানদার রাতভর চা বিক্রয় করছে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল দোকানের সামনে। চা খেলে যদি ক্লান্তি বোধ দূর হয়। শান্ত মোবাইলের বাটন চেপে ফোন দেয়। কথা বলার পর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। যাক আশ্বাস পাওয়া গেলো বাংলাদেশ বিমানে করে দশ সদস্য বিশিষ্ট একটি দল রওনা দিয়েছে।
খায়রুল দারোগার ফোন আসে। সবাই চলে আসে থানার সামনে। ১৪ সিটের মাইক্রো রেডি। চট করে সবাই মাইক্রোতে উঠে পড়ে। সবার সামনে বসেছেন খায়রুল দারোগা। গাড়ি সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে শান্তদের পাড়ার দিকে।
ফ্ল্যাটের সামনে মাইক্রো এসে দাঁড়ায়। খায়রুল দারোগার পেছন পেছন ৪/৫ জন কনস্টেবল সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসে। কলিং বেল চাপে। বারবার। টানা ৮/১০ বার বেল চাপার পর দরোজা খুলতেই ধাক্কা দিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ঘরে। ঘাবড়ে যায় পলক খাকি ওরফে সাজু আহমেদ। কী করবে বুঝে ওঠার আগেই তালা বদ্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় দারোগা।
এই তালা খুলুন পলক সাহেব।
না – মা – নে
কোনো মানে টানে নাই। তালা খুলুন। বাড়ি সার্চ করবো। আপনার বিরুদ্ধে এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে। যশোর থানায়।
তালা খুলতে গিয়ে হাত কাপাকাপি শুরু হলো লোকটির।
খুলুন তাড়াতাড়ি। চাপা ধমক দেয় খায়রুল দারোগা। খোলার সাথে সাথে দরোজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলে। পলকের দিকে তাকিয়ে বলে বাতি জ্বালান।
পলক খাকি বাতি জ্বালিয়ে দেয়।
বাতি জ্বালানোর সাথে সাথে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় দারোগার।
এরা কারা? কোথা থেকে এলো? আপনার বউ তো বিদেশ থাকে বলে। এতগুলো ছেলে পেলে কি আপনার?
বলেন আপনার ?
না। ভয় থরথর করে কাঁপতে থাকে। নারী ও শিশু পাচার করেন। প্রতিদিন রাতে এদেরকে খাবার খেতে দেওয়া হয়। যখন পুরো এলাকার সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে।
এরা কাদের বাচ্চা? দারোগা জানতে চায়।
এলাকার। যশোর খুলনা সাতক্ষীরা বাড়ি এদের।
দারোগা কঠোর স্বরে বলে, কনস্টেবল, অ্যারেস্ট হিম। ফোন দিয়ে আরেকটা গাড়ি আসতে বলো। বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মেঝেতে বসে ১৪/১৫ জন শিশু কিশোর তরুণ তরুণী খাবার খাচ্ছিল। পুলিশ দেখে প্রাণ ফিরে পেলো যেনো। যাক। এবার বাড়ি ফিরে যেতে পারব। মা বাবার কাছে।
হাতকড়া পড়িয়ে পলক খাকিকে গাড়িতে তোলা হলো। আরেকটা গাড়িতে বাচ্চাদের। সবাইকে গাড়িতে তুলে এগিয়ে আসে শান্তদের দিকে।
গুড জব শান্ত। তোমাদের জন্যে আজ ১৪/১৫ টা বাচ্চা প্রাণে বেঁচে গেলো। তানা হলে ভিনদেশে পাচার হয়ে গেলে মৃত্যু নির্ঘাত। এদের দেহের কিডনি, চোখ, লিভার, ফুসফুস অপারেশন করে নিয়ে এদের মেরে ফেলত।
অশেষ ধন্যবাদ তোমাদের। যশোর থেকে পুলিশ টিম থানায় বসে আছে। আমি এদের নিয়ে থানায় যাচ্ছি। তোমরা দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে নাও। সকালে নয়টার আগেই চলে আসবে।
আচ্ছা ভাই।
নারী ও শিশু পাচারকারীর মূল হোতা পলক খাকি গ্রেফতার হয়েছে। যেনো শান্তির নিশ্বাস ছাড়ল সবাই।
আসামিকে নিয়ে পুলিশের গাড়ি সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে থানার দিকে।
পুলিশের গাড়ির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওরা।
শান্ত বিড়বিড় করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ। আজ আমরা ভালো একটা কাজ করলাম। এইভাবে সংঘবদ্ধ থাকলে সকল সমস্যার সমাধান করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
সবাই শান্তর কথা সমস্বরে বলে উঠলো, ইনশাআল্লাহ।
চল ঘুমোতে যাই আমার বাসায়। থানায় যেতে হবে সকালে।
চল চল। আজ আমাদের কিশোর লিডার শান্তর বাসায় ঘুমোবো। বলতে বলতে শান্তর বাসার দিকে এগিয়ে গেলো ওরা।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



