প্রত্যাবর্তনের গল্প

0
0

Chokers বা চোকার্স-
কী? শব্দটি কি চেনা চেনা লাগে? কাদের কথা মনে পড়ছে? হ্যাঁ, আজ একদল চোকার্সের কথা বলবো।
চোকার্স শব্দের অর্থ ‘শ্বাসরোধকারী’। যে দল বেশিরভাগ সময়ই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ উপহার দেয়, তাদেরকে তো চোকার্স বলাই যায়।
হয়তো এ কারণেই প্রথম চোকার্স শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। এক সময় প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়াতে ত্রিদেশীয় একটা টুর্নামেন্ট হতো। ১৯৯৭-৯৮ সালে সেই টুর্নামেন্টের তিনটি দল হলো অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর নিউজিল্যান্ড। গ্রুপ পর্যায়ে মুখোমুখি হওয়া চার ম্যাচের চারটিতেই অস্ট্রেলিয়াকে যথাক্রমে ৬৭ রান, ৪৫ রান, ৫ উইকেট আর ৭ উইকেটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলো সাউথ আফ্রিকা। গ্রুপ পর্বের ৮ ম্যাচের মাঝে মাত্র ১টি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকা পরাজিত হয়। বাকি ৭ ম্যাচ জিতে ফাইনালিস্ট দলটি। আরেক ফাইনালিস্ট হলো অস্ট্রেলিয়া।
ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে অনুমিতভাবে ফেভারিট দক্ষিণ আফ্রিকাই। সেই টুর্নামেন্টে ফাইনাল হতো সিরিজের মতো। মানে ৩টি ম্যাচের ফাইনাল। প্রথম ফাইনালেই অস্ট্রেলিয়াকে ৬ রানে হারালো দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ট্রেলিয়ার তখন টুর্নামেন্ট জিততে হলে বাকি দুই ফাইনালের দুটিতেই জিততে হবে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা কেবল মাত্র আরেকটি ম্যাচটি জিতলেই হবে।
টানা ৫টি ম্যাচ হারার পর অস্ট্রেলিয়াকে জয়ী বলার পক্ষের লোক একদমই নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে স্টিভ ওয়াহ সংবাদ সম্মেলনে বলে উঠলেন যে, পরের দুটি ফাইনাল অস্ট্রেলিয়াই জিততে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, দক্ষিণ আফ্রিকা চাপের মুখে ভেঙে পড়ে, নার্ভ শক্ত রাখতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসলেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের কথা।
আর এদিকে তো অস্ট্রেলিয়ানরা স্লেজিং করাতে ওস্তাদ, সবাই ধরে নিল যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে জেতার জন্যেই স্টিভ এই কথা বলেছেন। তবে কারণ যেটাই হোক, পরের দুটো ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্টটির চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলো অস্ট্রেলিয়া, আর দক্ষিণ আফ্রিকা পেয়ে গেল চোকার্স তকমা!

সেই চোকার্স দক্ষিণ আফ্রিকার উত্থান পতন শেষে বিশ্বজয় করার গল্পই আজ করবো।
দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ক্রিকেট দল (ডাকনাম ‘প্রোটিয়াস- Proteas’) ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন দল। যাদের যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৯ সালে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলার মাধ্যমে। ক্রিকেট ইতিহাসের তৃতীয় টেস্ট-খেলুড়ে দেশ ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা।
১৮৮৯-১৯৭০ সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়মিতভাবে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলত। এই সময়ে কিছু চমৎকার পারফরম্যান্স থাকলেও তারা বিশ্ব ক্রিকেটে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।
এরপরেই তাদের উপর নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিগত বর্ণবৈষম্যমূলক ‘এপারথেইড’ নীতির কারণে আইসিসি তাদেরকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করে। ১৯৭০-১৯৯১ সাল পর্যন্ত ২১ বছরের দীর্ঘ এই নির্বাসনের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব ক্রিকেট থেকে একরকম বিচ্ছিন্নই হয়ে যায়। তবে তাদের ফিরে আসার গল্পটিও কম মজাদার নয়!
১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে এসেই ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়। দুর্দান্ত পেস বোলিং আক্রমণ ও টপ লেভেলের ফিটনেস ভিত্তিক দলের জন্য তারা পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই ফিরে আসার পরেও কেন যে ভাগ্য তাদের সহায় হচ্ছিলো না। এটি একবার দুবার নয়, বরং বারংবার। এজন্যই তো শেষমেশ তারা নিজেদের ‘চোকার্স’ বানিয়েই ফেললো। তাদের কিছু ব্যর্থতার ঘটনা বলি-

১৯৯২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল : দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে ১০ মিনিটের বৃষ্টিতে ম্যাচ বন্ধ ছিলো। আর এর ফলে বৃষ্টি আইনের কারণে ২২ বলে ২১ রান থেকে পরিসংখ্যান হঠাৎ করে হয়ে যায় ১ বলে ২২ রান- যেটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না। তাই অদ্ভুত পরাজয় মেনে নিতেই হলো।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ওভারে দরকার ছিল ৯ রান, ১ বল বাকি থাকতে স্কোর টাই হলেও তারা ফাইনালে উঠতে পারেনি। কারণ গ্রুপপর্বে অস্ট্রেলিয়া তাদের হারিয়েছিল।
২০০৩ বিশ্বকাপ নিজেদের মাটিতে খেললেও গ্রুপপর্ব থেকেই বাদ পড়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। কারণ Duckworth–Lewis পদ্ধতি ভুল বুঝে জয় নিশ্চিত করার পরও ম্যাচ টাই করে বসে। আর কোনো উইকেট না হারালে ডিএলএস পদ্ধতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪৫তম ওভার শেষে জয়ের জন্য প্রয়োজন ২২৯ রান, দক্ষিণ আফ্রিকা এমনই জানত। প্রথম চার বলে ওয়াইডে চারসহ দক্ষিণ আফ্রিকা তোলে ৭ রান। পঞ্চম বলে ছক্কা মারেন বাউচার। এরপর উল্লাসও করেন, কারণ প্রয়োজনীয় ১৩ রান যে উঠে গেছে! শেষ বলটি সুন্দর করে ডিফেন্স করেন, রান নেয়ার ইচ্ছে কিংবা চেষ্টা কোনটাই করেননি। ভুলটা অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা। মূলত জয়ের জন্য ৪৫তম ওভার শেষে তাদের প্রয়োজন ছিল ২৩০ রান, ২২৯ রান করলে ম্যাচ হতো টাই। শেষ পর্যন্ত হয়েছে সেটিই। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে তারা হয়ে পড়ে ব্যর্থ দর্শক।
২০০৭ বিশ্বকাপে তো গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশও সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়েছিলো। তবুও নকআউট পর্বে উঠেছিলো তারা। কিন্তু সেমিফাইনালে খুব বাজেভাবে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায়।

২০১৫ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে গিয়ে হেরে যাওয়ার ঘটনা তো সবার মনে দাগ কেটে আছে। মি.৩৬০ ডিগ্রি খ্যাত এবি ডি ভিলিয়ার্সও সেদিন নিজের নার্ভ ধরে রাখতে পারেননি। ফলাফল, নার্ভ হারিয়ে বাজে বোলিং এবং ফিল্ডিংয়ের দরুণ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হৃদয়বিদারক পরাজয়।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের কথা তো এবহ-ত রাও প্রত্যক্ষ করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে অপ্রতিরোধ্য ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা। ফাইনালেও ভালো বোলিং করে ভারতকে ১৭৬ রানে আটকে ফেলে। ব্যাটিংয়েও ভালো শুরু হয়। এমনকি ভারতও ধরে নিয়েছিলো, এবারের চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকাই। কিন্তু শেষ কয়েক ওভারের খামখেয়ালিতে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চোকার্সরা নিজেরাও হয়তো ততদিনে নিজেদেরকে চোকার্স হিসেবেই বরণ করে নিয়েছে।

গল্পের এবারের অংশটুকু ফিরে আসার। সকল বাধা ভেঙে দেয়ার।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের একেকটা সাইকেল চলে ২ বছর ধরে। ২০২৩-২০২৫ সাইকেলের ফাইনালিস্ট ছিলো অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ আফ্রিকা।
এবারে আর না আছে কোনো ভুল, না আছে নার্ভ হারানো। দুর্দান্ত পারফর্মেন্স করে চ্যাম্পিয়ন Cape of Good Hope এর দেশ ‘দক্ষিণ আফ্রিকা’।
ফাইনালের ১ম ইনিংসে ডাক মারা এইডেন মার্করাম ২য় ইনিংসে অনবদ্য ১৩৬ রান করেন, ঘুচিয়েছেন ২০২৪ বিশ্বকাপের নিজের করা ভুলের আক্ষেপ। হয়েছেন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ এবং ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্টও। আর বোলিংয়ে রাবাদা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ছোট খাটো গড়নের কৃষ্ণাঙ্গ কাপ্তান টেম্বা বাভুমা যেন পুরো ম্যাচ জুড়ে ছিলেন বরফের মতো শীতল। অবশেষে, ট্রফি হাতে তার তৃপ্ত মুখে ছিলো এক শান্ত হাসি!
বাভুমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, তার নামের অর্থ কী?
বাভুমা বলেছিলেন, Temba- অর্থাৎ Hope বা আশা। এ নাম তার দাদি রেখেছিলেন।
দীর্ঘ ২৭ বছর পরে সেই Temba তার দেশের আশা পূরণ করেছেন, লিখেছেন অনবদ্য এক প্রত্যাবর্তনের গল্প।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫