ক্যান্ডি শব্দটা কান্ডা উডা রাতা থেকে এসেছে। (ইংরেজিতে Land of Mountains, আর বাংলায় ‘পাহাড়ের শহর’ বলা যেতে পারে)। শহরটি ভারতের তামিলনাড়ুর নিকটে।
সেই ক্যান্ডি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরের একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। সাদাসিধা তামিল পরিবারে তার জন্ম। বাবা চালাতেন একটি বিস্কুটের ফ্যাক্টরি।
পড়াশোনার জন্য বাবা তাকে পাঠিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে, কিন্তু ক্রিকেটের নেশায় এক মাসের বেশি টিকতে পারেননি সেখানে। দেশে ফিরেই তার কোচ সুনীল ফার্নান্দোর সান্নিধ্যে চলে গেছেন, যিনি তাকে বিশ্বসেরা হয়ে উঠতে সর্বদা ছায়ার মতো লেগে ছিলেন।
শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু সিংহলিজদের সাথে সংখ্যালঘু তামিলদের হানাহানিও মুত্তিয়াকে আটকাতে পারেনি। দাঙ্গার ফলে ১৯৮৩ সালে তাদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তি মুরালিকে কখনোই তামিল বলে কেউ উত্তেজিত করে তুলতে পারেনি। মুরালি ছোট থেকেই যে ছিলেন শান্ত, সৌম্য। সর্বদা থাকতেন মিষ্টি হাসিমুখে।
খেলোয়াড়ি জীবনের প্রতি পদে পদে তাকে যে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়েছে, তেমনটি অন্য কারো বেলায় ঘটলে খেলাটাই হয়তো ছেড়ে দিতেন। কিন্তু, মুরালি দেখিয়েছেন নিজের ধৈর্য এবং জয় করার মানসিকতা।
প্রাথমিক সময়ে মুরালি ছিলেন একজন মিডিয়াম পেস বোলার। কিন্তু, ছোটখাটো গড়নের হওয়ায় সেটা যে তার সাথে স্যুট করছে না, তা কোচ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারেন। ব্যাটিং তো তেমন পারতেন না। যা একটু ঐ বোলিংই, তাও খুব একটা কার্যকরী না। তাই কোচদের পরামর্শে তিনি বনে যান অফ স্পিনার। প্রাকৃতিকভাবেই তার কনুই কিছুটা বাঁকানো, যেজন্য স্পিন বোলিংয়ে এমনিতেই সুইং পাচ্ছিলেন। সেটা তাকে আরো অনুপ্রাণিত করে বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তনের জন্য। অবশ্য বোলিং অ্যাকশনের জন্য তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলোও খুব সহজ ছিলো না।
মুত্তিয়া মুরালিধরনের প্রথম অভিষেক হয় ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি টেস্ট ম্যাচে। সেটা তার জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু না হলেও তিনি সেখান থেকে নিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা। যা তার ক্যারিয়ারকে করেছিলো ১৯ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত।
২৬শে ডিসেম্বর, ১৯৯৫। অস্ট্রেলিয়া বনাম শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ চলমান। আম্পায়ার হিসেবে আছেন অস্ট্রেলিয়ান ড্যারেল হেয়ার। তরুণ মুরালির বোলিং অ্যাকশন তার কাছে সন্দেহজনক লাগলো এবং সাথে সাথেই তিনি একের পর এক নো বল ডাকতে থাকেন। পর পর ৭টি নো বল করেন, যেটাকে ক্রিকেটের ভাষায় ‘চাকিং’ বা অবৈধ অ্যাকশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যে কারণে তাকে আর ঐ ম্যাচে বল করাতে না পারলেও মাঠেই প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন অর্জুন রানাতুঙ্গা। এ ঘটনা পরবর্তীতে সারাবিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়।
মুরালিকে পাঠানো হয় University of Western Australia তে, বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার করার জন্য। সেখানে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, মুরালির হাত প্রাকৃতিকভাবেই বাঁকা হওয়ার কারণে বোলিংয়ের সময় এমন চাকিং মনে হয়। এরপর মুরালির অ্যাকশন বৈধতার সার্টিফিকেট পায়।
এ ঘটনার তিন বছর পর ১৯৯৮ সালে আবারও অস্ট্রেলিয়া সফরে যায় শ্রীলঙ্কা, এবার ত্রিদেশীয় সিরিজে। ততদিনে ক্রিকেটবিশ্বে একজন নতুন সেনসেশন ও রহস্যময় স্পিনার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন মুরালি। শিখেছেন Doosra, যা ব্যাটারদের কপালে সর্বদা চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিতে বাধ্য।
তখন পর্যন্ত তাঁর ৬ বছরের ক্যারিয়ারে উইকেট সংখ্যা একশ পূর্ণ হয়নি। কিন্তু, দুসরা শেখার পরের ১০ বছরে তিনি প্রায় সাতশো উইকেট শিকার করেন! এটার ব্যাপারে ইউটিউবে একটি ভিডিও বার্তাতেও জানিয়েছিলেন তিনি।
যাই হোক, সেবারের ত্রিদেশীয় সিরিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে আবারও তার বোলিং অ্যাকশনকে অবৈধ ঘোষণা করেন আম্পায়ার রস এমারসন। কিন্তু এবার আর কোনো অন্যায় সহ্য করলেন না তৎকালীন লঙ্কান অধিনায়ক অর্জুন রানাতুঙ্গা। একপর্যায়ে তিনি পুরো দলকে নিয়ে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরবর্তীতে আবার সমঝোতার মাধ্যমে ম্যাচ মাঠে গড়ায়। কিন্তু মুরালিকে করতে হয়েছিলো লেগস্পিন।
মুরালিকে পুনরায় নেয়া হয় পরীক্ষাগারে। চালানো হয় বিভিন্ন ল্যাবে বিভিন্ন পরীক্ষা। বলাবাহুল্য, মুরালি আবারও নির্দোষ প্রমাণিত হন।
২০০৪ সালে মুরালির অ্যাকশন আবারও সন্দেহের শিকার হয়। এবারে মুরালি বিরক্ত হয়ে নিজেই পরীক্ষার জন্য চলে যান এবং এক ধরনের কঠিন পরীক্ষা দেন। যেখানে তিনি হাতে প্রায় ২/৩ কেজি ওজনের ইক্যুইপমেন্ট পরে বোলিং টেস্ট দেন, যা ছিলো খুবই অস্বস্তিকর। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘ব্রেসটা এত ভারী আর অস্বস্তিকর ছিল যে, আমি ঠিকভাবে বলই করতে পারছিলাম না। এটা আমার সাথে একটা রসিকতার মতো ছিল। কিন্তু এটা করতেই হয়েছিল প্রমাণ করার জন্য যে, আমি প্রতারক নই।’
এবারও নির্দোষ প্রমাণিত হন তাঁর প্রাকৃতিকভাবে বাঁকা কনুইয়ের জন্য। এছাড়াও পূর্ববর্তী সময়ে আরও কয়েকবার নিজ বোর্ডের অধীনে বোলিং টেস্ট দিতে হয়েছিলো মুরালিকে।
বন্ধুরা, মুরালির ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখবে যে, পুরো সময়ে মুরালির গ্রাফ ছিলো উপরের দিকেই। ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড।
– ক্যারিয়ার শেষে টেস্টে ৮০০ এবং ওয়ানডেতে ৫৩৪ উইকেটের মালিক হয়েছিলেন।
– এক ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন সর্বোচ্চসংখ্যক ৬৭ বার।
– এক টেস্টে ১০ উইকেট নিয়েছেন সর্বোচ্চসংখ্যক ২২ বার।
– টেস্টে একমাত্র বোলার হিসেবে টানা ৪ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছেন দুই দুইবার!
– একমাত্র বোলার হিসেবে তিনটি আলাদা ভেন্যুতে ১০০ উইকেট শিকার করার কীর্তি একমাত্র আছে তারই।
এছাড়াও আরও অনেক কীর্তিতে কীর্তিমান হয়ে আছেন তিনি।
মুরালির ৮০০ উইকেট পূর্ণ করার ঘটনাটাও অনেক ইন্টারেস্টিং। চলো এটা জেনেই শেষ করি!
২০১০ সাল, শ্রীলঙ্কা বনাম ভারত, ১ম টেস্ট ম্যাচের আগেই মুরালি ঘোষণা দেন যে, এটাই তার শেষ ম্যাচ। তখন তার উইকেট সংখ্যা ৭৯২টি, মাত্র! টিমমেটরা বুঝালো যে ৮০০ উইকেট নেয়ার আগেই অবসর ঘোষণা না দেয়ার জন্য। যদি এই ম্যাচটিতে ৮ উইকেট না পান, তখন তো রেকর্ড হবে না!
এদিকে মুরালি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল! বললেন, হলে এই ম্যাচেই হবে। নাহলে হবে না। ঘোষণা যেহেতু দিয়েছি, তাই এটাই আমার শেষ ম্যাচ!
ম্যাচের ১ম ইনিংসে মুরালি নেন ৩ উইকেট। ২য় ইনিংসে লাগবে আরও ৫ টা! একে একে ভারতের যখন ৯ম উইকেটের পতন হয়, তখন মুরালির উইকেট সংখ্যা ৭৯৯! অর্থাৎ, শেষ উইকেটটি মুরালিকেই নিতে হবে, তবেই না ৮০০ পূর্ণ হবে!
সারাবিশ্ব তাকিয়ে আছে, পরিবার পরিজন, প্রিয়জন সবাই অপেক্ষায় আছে আর উত্তেজনায় নখ কাটছে!
বোলিং প্রান্ত থেকে মুরালি বল করলেন, ভারতের ব্যাটার ‘প্রজ্ঞ্যান ওঝা’ ডিফেন্স করতে গিয়ে ব্যাটের কোণায় লেগে বল চলে গেল স্লিপে থাকা মাহেলা জয়াবর্ধনের হাতে। পুরো গল স্টেডিয়াম লাফিয়ে উঠলো, যেন উল্লাসে ফেটে পড়েছে সবাই। এ আনন্দ শুধু ম্যাচ জয়ের জন্যই না, বরং মুরালির ৮০০ উইকেট পূর্ণ হওয়াতেও!
সতীর্থরা তাকে মাঠেই কাঁধে তুলে নেন এবং রাজার মতো করে বিদায় জানান। স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠলো-
‘800- Thank You Murali.’



