ঘূর্ণন গতি- ৪

পর্ব-৪৬

0
3

ব্যাংকিং

প্রিয় বন্ধুরা, আশা করি ভালো আছো। আগের বেশ কিছু পর্বে আমরা ঘূর্ণন গতি নিয়ে জেনেছি। আজকের পর্বেও আমরা ঘূর্ণন গতির একটা বাস্তব উদাহরণ নিয়ে জানার চেষ্টা করবো। চলো তাহলে শুরু করা যাক।

তোমরা অনেকেই হয়তো সাইকেল চালাতে পারো। সাইকেল চালানোর সময় খেয়াল করেছো, সোজা চলার সময় সাইকেল সোজা থাকে অর্থাৎ ভূমির সাথে উলম্ব থাকে। কিন্তু তোমরা বাঁক নেয়ার সময় খেয়াল করেছো সাইকেল আরোহী সমেত যেদিকে বাঁক নেয় সেদিকে কাত হয়ে যায়। মোটর সাইকেলের ক্ষেত্রেও একই রকম আরো বেশি কাত হতে দেখা যায়। কিন্তু এর কারণ কী? সোজা চলার সময় যদি আমরা এমন কাত হতাম তাহলে সাইকেলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে আমরা পড়ে যেতাম। কিন্তু বাঁক নেয়ার সময় আমরা অনেকখানি কাত হয়ে বাঁক নেই। তারপরও ভারসাম্য নষ্ট হয় না। এর কারণ কী?

চলো আগে কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) সম্পর্কে একটু জেনে নিই। ধরো, তুমি একটি পাথর সুতার সঙ্গে বেঁধে মাথার ওপর বৃত্তাকারে ঘুরাচ্ছো। পাথরটি বৃত্তাকার পথে ঘুরতে পারছে কারণ সুতা তাকে সবসময় কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখছে। যদি হঠাৎ সুতা ছিঁড়ে যায়, পাথরটি আর বৃত্তাকার পথে না চলে স্পর্শক বরাবর সোজা চলে যায়। কিন্তু যখন আমরা তাকে বৃত্তাকার পথে ঘুরাই, তখন তার গতির দিক প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন করতে হয়। এই দিক পরিবর্তনের জন্য একটি বলের প্রয়োজন হয়, এই বলই হচ্ছে কেন্দ্রমুখী বল।

ঠিক একই কারণে, কেন্দ্রমুখী বল সরবরাহ করার জন্য সাইকেলের আরোহীকে কাত হয়ে বাঁক নিতে হয়। যদি আরোহী সোজা থাকেন বাইরের দিকে ছিটকে যাবে। এজন্য আরোহী বাঁকের দিকে কাত হয় যাতে এখানে কেন্দ্রের দিকে বলের উপাংশ তৈরি হয়।

আবার অনেক সময় তোমরা গাড়িতে যাওয়ার সময় খেয়াল করেছো গাড়ি যখন উচ্চগতিতে বাঁক নেয় তখন আমাদের বাঁকের বিপরীত দিকে ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হয়। আসলে জড়তার কারণে আমাদের শরীর সোজা পথে চলতে চায়। তাই গাড়ি বাঁক নিলে আমাদের মনে হয় আমরা বাইরের দিকে ছিটকে যাচ্ছি। কিন্তু গাড়ির সিটের সাথে আমাদের শরীরের ঘর্ষণ এখানে প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল দেয় । তাই আমরা ছিটকে যাই না।

আবার গাড়িটিকে বাঁকের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখার জন্য কেন্দ্রমুখী বল প্রয়োজন হয়। যদি এই বল যথেষ্ট না হয়, তাহলে গাড়িটি রাস্তার বাইরের দিকে পিছলে যেতে পারে। এখানে যে কেন্দ্রমুখী বলের দরকার হয় তা আসে রাস্তার সাথে চাকার ঘর্ষণ থেকে। ধরো, একটি গাড়ি ধীরে ধীরে বাঁক নিচ্ছে। তখন ঘর্ষণ বল সহজেই গাড়িটিকে প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল দিতে পারে। কিন্তু যদি গাড়ির গতি অনেক বেশি হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বলও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় যদি ঘর্ষণ বল পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে গাড়ি পিছলে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে বা ভেজা রাস্তায় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়, কারণ তখন ঘর্ষণ কমে যায়।
এই সমস্যার সমাধানে রাস্তার বাঁকগুলোকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। বাঁকের বাইরের অংশকে ভেতরের অংশের তুলনায় কিছুটা উঁচু করে দেওয়া হয়। ফলে রাস্তা সামান্য কাত হয়ে যায়। এই কাত হয়ে থাকা রাস্তার নামই হলো ব্যাংকড রোড (Banked Road) এবং এই পদ্ধতিই হলো রাস্তার ব্যাংকিং।
যখন রাস্তা কাত হয়ে থাকে, তখন গাড়ির উপর রাস্তা যে লম্ব প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে, সেটি আর পুরোপুরি উলম্ব থাকে না। এর একটি অংশ বাঁকের কেন্দ্রের দিকে নির্দেশ করে। এই কেন্দ্রমুখী অংশটিই গাড়িকে বাঁক নিতে সাহায্য করে। ফলে গাড়িকে আর সম্পূর্ণভাবে ঘর্ষণের ওপর নির্ভর করতে হয় না। রাস্তার ঢাল নিজেই কেন্দ্রমুখী বলের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। এ কারণেই ব্যাংকড রাস্তায় গাড়ি তুলনামূলক বেশি নিরাপদে এবং বেশি গতিতে বাঁক নিতে পারে। তাই রেসিট্র্যাক গুলোতে উচ্চগতিতে নিরাপদে বাঁক নেয়ার জন্য অনেক বেশি কাত করে রাস্তা তৈরি করা হয়। একই ভাবে রেললাইনের বাঁকেও বাইরের অংশ উচু করা হয়। বন্ধুরা, রাস্তার বাঁকগুলো দেখতে সাধারণ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কারণ।
তাহলে আজ এ পর্যন্তই। আল্লাহ হাফিজ।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬