ঝড়ের রাতের অতিথি

0
4

সেদিন রাত থেকেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছিলো। দমকা হাওয়ায় চারপাশের গাছপালা মড়মড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম। ভোরের দিকে ঝড়ের বেগ কিছুটা কমলেও অন্ধকার আকাশ তখনও মেঘে ঢাকা ছিলো। ঘড়িতে তখন ফজরের ওয়াক্ত। রতনপুর গ্রামের রহমত আলী প্রতিদিনের মতো সেদিনও বিছানা ছেড়ে উঠলেন। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
চারপাশ তখনো একদম নিঝুম। রাস্তার ওপর ভেঙে পড়া গাছের ডালপালা মাড়িয়ে এগোতেই রহমত আলীর নজর গেল রাস্তার পাশের একটি বড় শিমুল গাছের নিচে। সেখানে আবছা আলোয় কী যেন একটা নড়াচড়া করছে। কাছে গিয়ে ছাতাটা একপাশে সরিয়ে তিনি চমকে উঠলেন। একটি বড় সাইজের বুনো ঘুঘু পাখি কাদার মধ্যে ডানা ঝাপটাচ্ছে। ঝড়ের তীব্র আঘাতে পাখিটির একটি ডানা ভেঙে গেছে, শরীরটা ভিজে একদম লেপ্টে আছে। তীব্র শীতে আর কষ্টে পাখিটি তখন আধমরা অবস্থা, চোখ দুটি প্রায় বোজা।

রহমত আলীর মনে দয়া হলো। তিনি নামাজ শেষে ফেরার পথে পাখিটিকে আলতো করে কুড়িয়ে নিলেন। নিজের গায়ের গরম চাদরের ভেতর লুকিয়ে সেটিকে পরম যত্নে বাড়ি নিয়ে এলেন।

বাড়িতে আসতেই তাঁর দুই সন্তান— দশ বছরের রাফি আর আট বছরের নুহা বাবাকে দেখেই ছুটে এলো। চাদরের ভেতর থেকে যখন আধমরা পাখিটি বের করা হলো, বাচ্চাদের চোখ দুটো মায়ায় ভরে উঠলো।
রহমত আলী বললেন, ‘ঝড়ে পাখিটার খুব কষ্ট হয়েছে রে। তোরা একটু সাহায্য কর, একে আমাদের সুস্থ করে তুলতে হবে।’
রাফি আর নুহা যেন এক নতুন দায়িত্বে মেতে উঠলো। রাফি দ্রুত ঘর থেকে একটা পুরনো জুতার বাক্স এনে তাতে শুকনো তুলা আর নরম কাপড় বিছিয়ে পাখিটির জন্য একটা ওম ওম বিছানা তৈরি করলো। নুহা তার মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এলো সামান্য ডেটল আর তুলা। রহমত আলী নিজে খুব সাবধানে পাখিটির ভাঙা ডানায় কাঠির টুকরো দিয়ে বেঁধে দিলেন, যাতে ডানাটি সোজা থাকে।

প্রথম দুদিন পাখিটি কিছুই খাচ্ছিলো না, শুধু ঝিমাতো। নুহা ড্রপার দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি তার ঠোঁটে দিতো, আর রাফি চালের খুঁদ ও গম ভেঙে গুঁড়ো করে পাখির মুখের কাছে ধরতো। বাচ্চাদের এই অক্লান্ত যত্ন আর ভালোবাসায় চার-পাঁচ দিন পর পাখিটি চোখ মেলে তাকালো। সে তার সুস্থ ডানাটি ঝাপটাতে শুরু করলো। দিন যত যেতে লাগলো, বাচ্চাদের সাথে পাখিটির এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল। রাফি খাঁচার বদলে তাকে ঘরের মধ্যেই মুক্ত রাখতো। নুহা ডাকলেই পাখিটি দুর্বল পায়ে হেঁটে তার হাতের তালুতে এসে বসতো।
দেখতে দেখতে তিন সপ্তাহ কেটে গেল। পাখিটির ভাঙা ডানা এখন পুরোপুরি জোড়া লেগেছে। সে এখন ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে ছোট ছোট উড়াল দিতে পারে।
রহমত আলী একদিন বিকেলে সন্তানদের ডেকে বললেন, ‘পাখিটা এখন সুস্থ। ওর আসল জায়গা এই বন্দি ঘর নয়, মুক্ত আকাশ। আজ আমাদের ওকে ছেড়ে দিতে হবে।’

রাফি আর নুহার মনটা একটু খারাপ হলেও তারা বুঝলো বাবার কথাই ঠিক। তারা সবাই মিলে পাখিটিকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালো। রাফি দুই হাতের তালুতে পাখিটিকে নিয়ে আলতো করে ওপরের দিকে তুলে ধরলো।

পাখিটি প্রথমে কিছুক্ষণ রাফি আর নুহার মুখের দিকে তাকালো, যেন অবলা জীবটি তার ভাষায় ধন্যবাদ জানাচ্ছিলো। তারপর একটি লম্বা ডাক দিয়ে ডানা দুটি মেলে ধরলো। বিকেলের সোনালি রোদের আলোয় ডানা ঝাপটে সে উড়ে চললো নীল আকাশের দিকে। মুক্ত আকাশে তার ডানা মেলার দৃশ্য দেখে রাফি ও নুহার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠলো। একটি আধমরা জীবনকে ভালোবেসে আবার আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার আনন্দ যে কতখানি, তা তারা সেদিন প্রথম অনুভব করলো।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬