৩০২৫ সাল।
এইচ.এম. রুম থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনে ইয়ার্ডের মতো খোলা জায়গায় এসে দাঁড়াল। সেখানে পার্কিং করা আছে ছোট বড় কয়েকটি উড়ন্ত যান। যানগুলো কোনোটি সসারের মতো গোলাকৃতি, কোনোটি হেলিকপ্টারের আদলের কিন্তু ত্রিভূজাকৃতির। সে একটি ত্রিভূজাকৃতির ছোট্ট যানে চড়ে বসল। যানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুতবেগে চলতে লাগল। ৫ মিনিটে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যানটি আস্তে আস্তে একটি বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিঙের ছাদে ল্যান্ড করল। এটি তার অফিসের বিল্ডিং।
অফিসে ঢুকেই এইচ.এম. ডানহাতের দু’আঙুল তুলে ভি-কেটে দেয়ালে লাগানো একটি বড় মনিটর চালু করল। স্ক্রিনে বিভিন্ন ছবি দৃশ্যান্তর হতে লাগল। এমন সময় রুমে ঢুকল এস.এম.। সে মনিটরের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল, মি. এইচ.এম, চলো না আজকে একটু ভ্রমণে বেরুনো যাক। অফিসে তো তেমন কাজ নেই।
এইচ.এম. মনিটর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে এস. এম.-এর দিকে তাকিয়ে বলল, কোথায়?
— বিনোদন পার্কে।
— সেটি কোথায়?
— এখান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরে— ‘ওল্ড ইয়র্ক’ শহরে।
— সেখানে কী দেখার আছে?
— সেখানে আছে বিভিন্ন নতুন নতুন প্রাণী; যেগুলোকে এ.আই. প্রযুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে। আরো আছে এক হাজার বছর আগের মানুষ! যাদেরকে অনেক যত্নে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
— আমরা তো কেউ মানুষ দেখিনি, শুনেছি এই মানুষই নাকি আমাদের পূর্বপুরুষ। তাহলে চলো। এইচ.এম. উঠে দাঁড়াল। এরপর ডানহাতের বুড়ো আঙুল তুলে ইশারা করা মাত্র মনিটরটি অফ হয়ে গেল। দু’পা এগিয়ে সে দরজার সামনে দাঁড়াতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজাটি খুলে গেল। এস.এম. তার পিছু পিছু চলতে লাগল।
দু’জন তাদের অফিসের ছাদে পার্কিং করা মাঝারি গোছের একটি সসারের মতো যানে চড়ে বসল। যানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে চলল। অশেপাশে অনেক যান উড়ে চলছে। এইচ.এম. জানালা দিয়ে নিচে তাকাল। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, অনেক মানব-রোবট গাড়ির গতিতে চলাচল করছে। রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ। তবে প্রাচীন পৃথিবীর কোনো উদ্ভিদ এখানে নেই। সেগুলো বিলুপ্তি হবার ফলে এ.আই. প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির হাইব্রিড উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এইচ.এম. ও এস.এম. যান থেকে নেমে বিনোদন পার্কে ঢুকে পড়ল। পার্কটির বেশ সুনাম শুনেছে এস.এম.। দেখার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে ভ্রমণের সুযোগ হয়নি তার।
পার্কে ঢুকেই দু’জনেরই সারা শরীর জুড়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। কেমন সব আজব আজব প্রাণী! ডানাওয়ালা কিছু প্রাণী রয়েছে— যেগুলো দেখতে কোনোটা রূপকথা গল্পের পরির মতো, কোনোটি বা পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো, এমনকি সিংহেরও ডানা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে হাতি ও তিমির সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক প্রাণী, রয়েছে বক ও কচ্ছপ এবং গরুর মাথা ও মোরগের দেহ নিয়ে প্রাণী। এ যেন সুকুমার রায়ের ‘‘আবোল-তাবোল’’ ছড়ার সেই প্রাণিজগৎ!
— এগুলো কি মানুষ এবং বিভিন্ন পশু-পাখির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সার্জারি করে সৃষ্টি করা হয়েছে? হঠাৎ এইচ.এম. প্রশ্ন করল এস.এম. কে।
— না, এগুলো হলো হাইব্রিড প্রাণী। মানুষ এবং বিভিন্ন পশু-পাখির ডি.এন.এ. ব্যবহার করে এ.আই প্রযুক্তির সাহায্যে এগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে।
— সত্যি অভিনব সব সৃষ্টি।
— হ্যাঁ। এবার চলো আমাদের পূর্বপুরুষ মানুষকে দেখি।
ওরা দু’জন কিছুদূর হেঁটে এসে একটি হল রুমের ভিতরে ঢুকল। রুমটি বেশ বড় কিন্তু গ্লাস দিয়ে পার্টিশন করা। অক্সিজেন ঢোকার জন্য মাঝে-মাঝে ছোট বলের মতো ছিদ্র রয়েছে। গ্লাসের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মানুষ হাঁটাচলা করছে।
— ওগুলোই তাহলে মানুষ? এ তো আমাদের মতোই দেখতে! এইচ.এম.
চেঁচিয়ে ওঠে।
— ওনাদেরই তো হাইব্রিড রূপ আমরা, চেহারার মিল তো থাকবেই। এস.এম. জবাব দেয়।
— কিন্তু এর পূর্বে যে পশুপাখি দেখলাম সেগুলো তো প্রাচীন পৃথিবীর পশুপাখির সাথে কোনো মিল নেই।
— সেগুলো প্রাচীন পৃথিবীর দূর্লভ পশু-পাখি এবং মানুষের ডি.এন.এ.-এর
সংমিশণে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের শুধু মানুষের ডি.এন.এ. থেকে
এ.আই. প্রযুক্তি দিয়ে উন্নত করে হাইব্রিড-মানব রূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।
— কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন : আমাদের আদিপুরুষ অর্থাৎ মানুষ একেবারে কমে গেল কেনো? তারাই তো আমাদের সৃষ্টি করেছিল।
— নিজেদেরকে অনেক উন্নত করতে চেয়েছিল আদিপুরুষেরা— এই জন্য তারা হাইব্রিড মানব অর্থাৎ আমাদের সৃষ্টি করেছিল। এটা অবশ্যই মানতে হবে যে, তাদের চেয়ে আমাদের বুদ্ধিমত্তা অনেক বেশি। যেমন, আমরা কথা না বলেও একে অপরের মনোভাব বুঝতে পারি অর্থাৎ আমরা কারো মস্তিষ্কের নিউরনে ঢুকে তার সব মনোভাব রিড করতে পারি— সে কী ভাবছে তা পড়ে ফেলতে পারি। আমাদের মস্তিষ্কের গঠন এতই উন্নত যে অনেকের ভবিষ্যতের কথাও বলে দিতে পারি।
— তা তো জানি। কিন্তু আমার প্রশ্ন : মানুষ অস্তিত্বের সংকটে পড়ল কেনো?
— ‘হাইব্রিড-মানব’-এর অধিক সৃষ্টিই এর মূলকারণ। তারা চেয়েছিল প্রযুক্তির উন্নয়ন কিন্তু এরও যে কুফল আছে তা আন্দাজ করতে পারেনি। অনেকটা ফ্রাঙ্কেস্টাইনের দানবের মতো ঘটনা ঘটেছে।
— এখন ‘মানবসমাজ’কে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়?
— প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের বংশবৃদ্ধি খুব কম হচ্ছে। তাই ক্লোন পদ্ধতিতে তাদের বংশবৃদ্ধি করা যেতে পারে— তাতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু তা প্রাকৃতিক উপায়ের মতো এত নিরাপদ হবে না।
— কেনো?
— ক্লোন পদ্ধতিতে নানা সমস্যা রয়েছে। এতে একই চেহারার অনেক মানুষ সৃষ্টি হবে, তাদের সত্ত্বাও এক হবে। এতে সংকট বৃদ্ধি পাবে।
— তাহলে উপায়?
— প্রাকৃতিক নিয়মে বংশবৃদ্ধিই সবচেয়ে ভালো উপায়, এতে কম হলেও ‘খাঁটি মানুষ’ পাওয়া যাবে।
এস.এম.-এর কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে যায় এইচ.এম.। গ্লাসের বলের ভিতর দিয়ে কান পেতে ভেতরের মানুষগুলোর মৃদুস্বরে কথাবার্তা শুনতে থাকে। ওদের কথা শুনে মনটা বিষণ্নতায় ভরে ওঠে তার। অশ্রুসজল চোখে এস.এম.-এর দিকে তাকিয়ে বলে, একটি কথা : আমরা কি আর ‘মানুষ’-রূপে ফিরে যেতে পারি না?
— না, সে প্রযুক্তি আমাদের জানা নেই। ম্লানমুখে বলে এস.এম.।
এইচ.এম. আর প্রশ্ন করে না। ভেজাচোখ টিস্যু পেপার দিয়ে মুছতে মুছতে নীরবে রুম থেকে বের হয়ে যায়। এস.এম. তাকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



