বৈশাখ এলেই আমাদের দেশে শুরু হয় ঝড়ের দাপট। বিকেলের আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে যায়, দমকা হাওয়া বইতে থাকে, বিদ্যুৎ চমকায়, আর মেঘ গর্জে ওঠে। এই সময়েই কখনো কখনো বৃষ্টির ফোঁটার বদলে আকাশ থেকে টুপটাপ পড়ে বরফের ছোট ছোট টুকরা। আমরা যাকে বলি শিলাবৃষ্টি।
কিন্তু ভেবে দেখেছো, এত গরমের দিনে আকাশে বরফ এলো কোথা থেকে?
চলো, গল্পের মতো করে জানি।
আকাশের অনেক উপরে আছে বিশাল বিশাল মেঘ। এই মেঘের ভেতরে সবসময়ই ছোট ছোট পানির ফোঁটা ভেসে বেড়ায়। যখন বজ্রঝড় শুরু হয়, তখন মেঘের ভেতরে তৈরি হয় খুব শক্তিশালী বাতাস, যা নিচ থেকে উপরের দিকে উঠে যায়। এই বাতাস এত জোরে ওঠে যে ছোট পানির ফোঁটাগুলোকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়।
উপরে যত উঠা যায়, তত ঠান্ডা। এতটাই ঠান্ডা যে সেই পানির ফোঁটাগুলো জমে বরফ হয়ে যায়। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না।
এই বরফ কণাগুলো আবার বাতাসে ভেসে নিচে নামে, আবার উপরে ওঠে। এইভাবে বারবার ওঠানামা করতে করতে প্রতিবারই তাদের গায়ে নতুন করে পানির স্তর জমে এবং সেটাও ঠান্ডায় বরফ হয়ে যায়। ঠিক যেমন তুমি পেঁয়াজের খোসা একটার পর একটা দেখো, শিলার ভেতরেও তেমন স্তর তৈরি হয়।
একসময় বরফের টুকরাটি এত বড় হয়ে যায় যে মেঘের ভেতরের বাতাস আর তাকে ধরে রাখতে পারে না। তখন সেটি ধপ করে মাটিতে পড়ে। এটাই শিলাবৃষ্টি।
তুমি যদি শিলা হাতে নিয়ে দেখো, কখনো তা সাদা ঘোলাটে, আবার কখনো কাচের মতো স্বচ্ছ। এরও আছে মজার কারণ।
যখন পানি খুব দ্রুত জমে যায়, তখন তার ভেতরে ছোট ছোট বাতাস আটকে পড়ে। তখন শিলা সাদা বা দুধের মতো দেখায়। আর যখন ধীরে ধীরে জমে, তখন বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে শিলা হয় একেবারে স্বচ্ছ, যেন কাচের টুকরো।
শিলাবৃষ্টি দেখতে মজার হলেও সবসময় নিরাপদ নয়। ছোট শিলা হাতে নিয়ে খেলা করা যায়, কিন্তু বড় শিলা হলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় ঘরের টিনের চাল ফুটো হয়ে যায়, গাড়ির কাচ ভেঙে যায়, এমনকি গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খুব বড় শিলা মানুষ বা পশুপাখির জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
পৃথিবীর কিছু জায়গায় শিলাবৃষ্টি বেশি হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় এত বেশি শিলা পড়ে যে সেই জায়গাগুলোর নামই হয়ে গেছে হেইল অ্যালি। সেখানে বছরে কয়েকদিন নিয়ম করে শিলাবৃষ্টি দেখা যায়।
আরেকটি মজার তথ্য জানো, কখনো কখনো একটি শিলা মেঘের ভেতরে অনেকবার উঠানামা করে বলে সেটি খুব বড় হয়ে যায়। ইতিহাসে এমন শিলাও পাওয়া গেছে, যা প্রায় একটি ক্রিকেট বলের মতো বড় ছিল।
তাই পরের বার যখন আকাশে ঝড় উঠবে আর টুপটাপ করে শিলা পড়বে, তখন ভয় না পেয়ে মনে মনে ভাবতে পারো, তুমি যেন আকাশের এক দারুণ বিজ্ঞান পরীক্ষার ফল দেখছো।
প্রকৃতি সত্যিই আশ্চর্যময়। কখনো সে মেঘ হয়ে ভাসে, কখনো বৃষ্টি হয়ে নামে, আর কখনো বরফের টুকরো হয়ে আমাদের চমকে দেয়।



