গল্পরাজা সানাউল্লাহ নূরী

0
8

পৃথিবীর অন্যসব দেশের শিশুদের মতো আমাদের শিশুরাও মায়ের অথবা দাদীর কোলে ঘুমায় গান আর গল্প শুনতে শুনতে। আমরা যাকে বলি ঘুম পাড়ানো গান আর গল্প। তাদের গল্পকে বলা হয় রূপকথার গল্প। নূরী ভাইয়ের বেলায়ও এমন ঘটেছে। তার ছিল এরকম একজন স্নেহপরায়ণা বুদ্ধিমতী দাদী। তিনি বলতেন,‘দাদীর কথা ভাবলে আমি হঠাৎ এক অশ্বারোহী কিশোর যোদ্ধা হয়ে চলে যাই রূপকথার জগতে।’ অরণ্যের বৃক্ষ শাখায় দোলনা ঝুলিয়ে মুখে মুখে সুর করে ছন্দ মিলিয়ে দাদী শিশু নূরীকে কত ছড়াই না শোনাতেন। শিশু নূরী যখন একটু বড় হলেন, তখন তিনি নিজেই দাদীকে গল্প বলতে বাধ্য করতেন। দাদীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে দাদীর মুখে গল্প শুনতেন। দাদী আদুরে নাতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতেন, ‘এক টালমাটাল সাগর। তার এক কূল আছে। কিন্তু আরেক কূল? কেউ জানে না সেই ঠিকানা। চোখের সামনে কেবল ধু-ধু কুয়াশা। চাইতে গেলে ঘোর লাগে চোখে। পাহাড়ের মতন উঁচু একেকটা ঢেউ। সেই ঢেউয়ের বুকে ফণা তোলে মহা নাগ। লক্ষ মানিক হয়ে জ্বলে নাগের মাথার মণি। লক্ষ দৈত্য কাড়াকাড়ি করে সেই মানিক নিয়ে। তাদের দাপাদাপিতে উথাল-পাথাল করতো সাগরের পানি। সেই পানিতে ঘূর্ণিঝড় তোলে লক্ষ মাতাল ঘোড়া। সেই ঘূর্ণির ঝাপটায় দুরু দুরু কাঁপে পৃথিবী। কাঁপে তরু-লতা। ভয়ে চুপসে যায় পাখ-পাখালি। শুকিয়ে যায় জীবনের প্রাণ। কিন্তু ভয় পায় না কেবল একজন।’ আর অমনি নূরী জিজ্ঞেস করতেন,‘কী বলো দাদী! এ কী কথা! দৈত্য দানবের ভয় নেই এমন মানুষ আছে নাকি কোথাও?’ ‘আছে আছে। দাদু ভাই সে কথাই তো বলছি। শোনো তাহলে। নাম তার চম্পাবতী।’
এমনিভাবে গল্প শুনতে শুনতে ছোট্ট নূরী এক সময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতেন। বড় হয়ে তিনি দাদীর কাছে শোনা ওসব রূপকথার গল্পকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে কত মজার মজার গল্পই না লিখেছেন। যেমন ধরো নীল পদ্ম, সাত পদ্মকন্যা, মন পবনের নাও, সাগর কন্যা চম্পাবতী, সাগর কূলের গাঁ, কালো ভোমর, আরও কত কি! সাত-আট বছর বয়সে নূরী গাছে উঠতে শিখেছে। লবণের সাথে দু’একটা কাঁচা মরিচ মিশিয়ে কেমন করে সুস্বাদু কাঁচা-মিঠা আম গলধঃকরণ করতে হয় সেই বিদ্যাও বেশ রপ্ত হয়ে যায় তার। বাড়িতে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে খুব আদর করতেন। তাদের সাথে তিনি মজা করে আম খেতেন। আমের মৌসুমে সবসময় একটি ছুরি থাকতো তার লুঙ্গির কোমরের দিককার বাঁধনের তলায়। গাছের মাঝখানের ডালে উঠে ছুরিতে-কাঁচা কাঁচা আমের ফালি লবণ মেখে খেতেন তিনি। আর পুকুরের ঘাটে পানি আনতে যাওয়ার সময় রসিকতা করে একহাত দেখিয়ে দেয়ার মতলবে কাঁচা বা পাকা আমের চামড়া এবং আঁটি নিচে লাগসই করে কারোর মাথায় ফেলতেন। যেমন করে কাক কিংবা বাদুড় ফল খেয়ে আধা-খাওয়া আঁটি নিচে ফেলে দেয়। মাথায় আচমকা আঘাত খেয়ে হকচকিয়ে গিয়ে ওপরের দিকে তাকালে তখন নূরী গাছের ঘন ডালপাতার আড়ালে লুকিয়ে যেতেন। ব্যাপারটা কেউ সহজে ধরতে পারতো না। ভাবতো কোনো বেয়াড়া কাকের কাণ্ড এটা। শেষে দৃষ্টির তীক্ষ্ণ টর্চ ফেলে নূরীকে পাতার ভেতর দেখতে পেয়ে চোখ পাকিয়ে বলতেন, ‘ওরে দুষ্টু ছেলে, তোমার কাণ্ড এইটা! হ, গাছের থন নাইমবা না? তখন টের পাইবা, আমরাও কেমন মজা দেখাইতে পারি।’ এজন্য পরিবারের সদস্যরা নূরীকে গাছালো এবং কখনো কখনো গাছুয়া ইঁদুর বলে বিদ্রুপ করতেন।
আচ্ছা বলতো কে সে নূরী? হ্যাঁ, ফুলকুঁড়ি আসরের মরহুম কেন্দ্রীয় সভাপতি সবার প্রিয় সানাউল্লাহ নূরী ভাইয়ার কথাই তো বলছিলাম। এ মাসেই তো নুরী ভাইয়ার মৃত্যুবার্ষিকী। চলো না আমরা দু’হাত তুলে সবাই ভাইয়ার জন্য দোয়া করি।

 

প্রকাশকাল: জুন ২০২৬