হতে হবে বড়

“কীরে পলাশ, যাবি আমার সাথে? তোকে আমি স্কুলে ভর্তি করে দেবো। আমার ছেলে শিমুলের সাথে থাকবি। ওরও একজন সঙ্গী দরকার। খালা তো আমাকে খুব আদর করতেন। তোকে মানুষ করে, তার ঋণ কিছুটা শোধ করতে চাই।”

কেঁদে ফেলল পলাশ। শাম্স ভাই প্রতিবার বাড়ি এলে, ওর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। নতুন জামা-জুতা, ক্রিকেট ব্যাট-বল, নানা রকম চকোলেট-বিস্কুট, ফল-মূল আরও কত কী! কিন্তু ভাইয়া চলে যাওয়ার পর ওর আর ওগুলো ব্যবহার করা বা খাওয়ার সুযোগ হয় না। মা মারা যাওয়ার পর, চার মাসের মাথায় বাবা এক নতুন মা ঘরে আনলেন। মায়ের সাথে পলাশের বয়সী এক ছেলেও এসেছে বাড়িতে। ওর নতুন মায়ের ছেলে। নাম রাফি। যে ওর বাবাকে বাবা বলে ডাকে, আর পলাশকে ভাইয়া। এমনিতে পলাশের খুব ভক্ত রাফি। সব কিছুতে পলাশের অনুকরণ করে। কিন্তু মায়ের এটা মোটেই পছন্দ নয়। পলাশের সব শখের জিনিস-পত্র মা রাফিকে দিয়ে দেন। বাবা প্রথম দিকে প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু মা যেভাবে চিৎকার চেঁচামেচি, কান্নাকাটি শুরু করেন, পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই তখন ভাবে, মাকে বুঝি বাবা সহ্য করতে পারছেন না। তাই বাবা এখন চুপচাপ থাকেন। চোখের সামনে নিজের ছেলের কষ্ট দেখেও এখন আর কিছু বলেন না। পলাশ এবার তাই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। বলে, ‘হ্যাঁ ভাইয়া, যাব। কিন্তু, ভাবি আমাকে পছন্দ করবে তো?’
: ‘তোর ভাবিকে আমি জানি বলেই বলছি। এই যে এত সব খেলনা, জামা-কাপড়, সব তোর ভাবির নিজের পছন্দে কেনা। খালার কথা বলতে গিয়ে, এখনও সে চোখের পানিতে বুক ভাসায়। ওকেও তো খালা কম আদর করেননি। আমি তাহলে খালুকে বলি, কি বলিস?’

পলাশের আব্বু প্রথমটায় আপত্তি করলেও, পলাশকে রাজি দেখে, শেষ পর্যন্ত যেতে দিলেন। কিন্তু, বার বার অনুরোধ জানালেন, ওর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে। ছেলেকে বিদায় জানাতে গিয়ে, বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন কিছুক্ষণ। বললেন, ‘ভালো করে পড়াশুনা করবি। বড়দের কথা মেনে চলবি। ক’দিন পরপর আমি গিয়ে তোকে দেখে আসবো।’

পলাশের কণ্ঠ, কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসছিল। তাই সে কিছুই বলতে পারেনি তার আব্বুকে।
শাম্স ভাইয়ার বাসায় এসে, পলাশ রীতিমতো অবাক। ভাবিরা এত ভালো হতে পারে, এখানে না এলে সে জানতেই পারতো না। খুব আদর করেন ওকে। শিমুলকে যেমন আদর করেন, পলাশকেও। নিজের ছেলে বলে শিমুলের আলাদাভাবে বেশি যত্ন নেবেন, এমন কখনও হতে দেখেনি পলাশ। আব্বু মাঝে-মধ্যে দেখতে আসেন, পুকুরের তাজা মাছ, বাগানের টাটকা শাক-সবজি, ফল-মূল আর চাল-ডাল নিয়ে। শাম্স ভাইয়া এসব দেখে রাগ হন। আব্বু তখন বুঝিয়ে বলেন, এটা তিনি তার নিজের মনকে খুশি রাখতে করেন। তাছাড়া ছেলে এখানে ভালো আছে, ভালোমতো পড়াশুনা করছে দেখেই তিনি খুশি। পলাশ যখন দশম শ্রেণিতে উঠলো, ভাইয়া-ভাবি দু’জনই ওর প্রতি বিশেষ যত্নবান হলেন। ওর রেজাল্টে তার প্রমাণ মিলল। গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়েছে পলাশ। খুশিতে আব্বু শাম্স ভাইকে বুকে জড়িয়ে কাঁদলেন। বললেন, ‘এর সমস্ত কৃতিত্বই তোমার বাবা। আমার ছেলে বাড়িতে ওর নতুন মায়ের কাছে থাকলে, এমন রেজাল্ট করতে পারতো না, জানি। তোমাকে ওর অভিভাবকত্ব দিয়ে দিলাম। যে লাইনে খুশি ওকে ভর্তি করাতে পারো। শুধু কত টাকা-পয়সা লাগবে, এটা আমাকে বলবে। আর, কিছুদিনের জন্য আমাদের বাড়ি বেড়াতে যাবে। ওর মা এবার খুব করে বলে দিয়েছে। পলাশ তো অনেক দিন হলো বাড়ি যায় না।’
: ‘ঠিক আছে খালু, আমরা সবাই যাব।’
পলাশ খুব অবাক হয়ে দেখলো, বাড়ি যাওয়ার পর মা ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। বললেন, ‘আসিস্ না কেন বাবা? আমাদের ওপর রাগ করেছিস? তুই কত ভালো ছাত্র হয়েছিস। বাড়িতে থাকলে রাফি তোর কাছে অনেক কিছু শিখতে পারতো।’
পলাশ এবার বুঝতে পারলো, আসলে আদরটা ওকে নয়, ওর রেজাল্টকে করা হচ্ছে। সব দেখে-শুনে শাম্স ভাইয়া বললেন, ‘কেউ যদি তোকে অবমূল্যায়ন করে কষ্ট দেয়, বুঝবি মানুষ হিসেবে এটা তার ব্যর্থতা। তোর নয়। আর নিজেকে যদি অনেক বেশি যোগ্য মানুষ হিসেবে প্রমাণ দিতে পারিস, তখন তোকে আর কারো কাছ থেকে আদর খুঁজে নিতে হবে না। সে নিজে সেঁধে এসে তোকে গুরুত্ব দেবে। তোর পাওনা ভালোবাসা নিজে থেকেই দিয়ে যাবে। চেষ্টা কর, জীবনে অনেক বড় হওয়ার। তোকে যেন কেউ অবহেলা বা অবজ্ঞার কথা কল্পনাতেও নিয়ে আসতে না পারে। মায়ের ব্যবহারে তোর তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। বুঝেছিস?’

ঠিকই বুঝেছিল পলাশ। যে ক’দিন বাড়ি ছিল, মা খুব আদর-যত্ন করেছেন। চলে আসার সময় কপালে চুমু দিয়ে বললেন, ‘যখনই বাড়ির কথা মনে হবে, চলে আসবি। আমাদের ভুলে যাস না যেন।’
চলে আসার সময় রাফির চেহারাটা হয়েছিল দেখার মতো। কেবলই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ভাইটাকে রেখে আসতে পলাশের সত্যিই খুব খারাপ লেগেছিল।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫