ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে খুব আদর করতেন। এই সুযোগে আমিও সবসময় মাকে নানা বাহানায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমার কাছে রাখতে চাইতাম। যাতে একটু বেশি করেই মায়ের আদর পাই। কখনো কখনো মা বলতেন, সারাদিন যদি এভাবে তোর কাছে বসে থাকি, তাহলে আমার সংসার কে দেখবে? কে তোকে ভালো-মন্দ রেঁধে খাওয়াবে? আমি তখন বলতাম- ‘মাগো, আমি ভালো-মন্দ খেতে চাই না। আমি যে তোমাকেই চাই মা।’
মা বলতেন, ‘বোকা ছেলে কোথাকার, এভাবে কেউ সারা দিন মাকে পাশে রাখতে চায়? তার চেয়ে বরং চল্ মায়ের কাজে সাহায্য র্ক। তাতে মা-ও একটু স্বস্তি পাবে। মায়ের পাশেও থাকা হবে।’
ওহ! তাইতো। মা যে সঠিক কথাই বলেছে। মা ঘরের কাজে লেগে পড়েন। আর আমি যখন যেটুকু পারি মায়ের কাজে হাত লাগাই। মা দারুণ খুশি আমার উপর।
সুখ-শান্তিতে ভরা আমাদের সংসার। সম্পদ বলতে তেমন কিছু নেই আমাদের। এই যে সংসারের ক’টা মানুষ আর তাদের স্নেহ-ভালোবাসা। এটাই অনেক আমাদের কাছে। আমরা ভাবতাম, বাবা সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়িতে ফিরে যদি দেখেন ঘরের কাজগুলো অগোছালো, তিনি হয়তো কিছু বলবেন না, কিন্তু বিষয়টি মোটেও ভালো দেখাবে না। খুব পরিপাটি একজন মানুষ আমার বাবা। নিজের যা আছে তা নিয়ে খুশি থাকতে চান।
আজ রুশুরও বড্ড খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে ওকে কিছু দেওয়া হয়নি। তাই খাঁচার মধ্যে ডানা ঝাপটে জানান দিচ্ছে আমি যেন ওকে কিছু খেতে দেই। আমার রুটিন তালিকায় ওর নামটিই সবার আগে। ঘুম থেকে উঠেই ওকে একনজর দেখে নিই। সারা রাত ওর ঘুম কেমন হয়েছে? ওকে দেখলেই আমি তা বুঝতে পারি। পুরনো পানি ফেলে ওর পাত্রে কিছুটা নতুন পানি দেই। যাতে ও তেষ্টা মিটিয়ে পান করতে পারে। ওর জন্য আমার ভারি মায়া।
আমার জন্য অনেকে আছে। ওর জন্য আমি ছাড়া আর কেউ নেই। কেউ কেউ বলে, পাখি পোষার শখটা নাকি বিশ্রী। এতে পাখির স্বাধীনতা খর্ব হয়। পড়াশোনায়ও বিঘ্ন ঘটে।
বাবা কাজ থেকে ফিরে এসে আজ একটু বেশিই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। বাবার একটা দারুণ অভ্যাস আছে, যখনই শরীরটা ভালো লাগে না, তখনই আমাকে কাছে ডেকে নেন। কাছে বসিয়ে শিক্ষামূলক দু’চারটা কথা বলেন। বাবার কথাগুলো শুনতে আমার খুবই চমৎকার লাগে। তিনি সাধারণ কথাটাকেও অসাধারণভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তার ছোট ছোট বাক্যের কথা শোনার আমি দারুণ ভক্ত।
বাবার সেই চিরচেনা রূপটা আজকে কেন জানি আমার কছে অচেনা মনে হলো। চেহারায় গাম্ভীর্য। মনটা বিষণ্নতায় ভারী। তখন আমি বললাম- বাবা, কী হয়েছে তোমার?
তিনি বললেন, আমার কিছু হয়নি বাবা। তুই তো জানিস, আমি অসুস্থ। দেহে কত যে রোগ বাসা বেঁধেছে সে কথা হয়তো নিজেও জানি না।
বাবা আমাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বাবা, তুই আমাদের একমাত্র সন্তান। প্রত্যেক বাবা মা-ই চায় তার সন্তানটি মানুষের মতো মানুষ হোক। আজ যে কথা না বললেই নয়, শিশু হলেও আমি তোর বুদ্ধিমত্তা আর মনুষ্যত্ব জ্ঞানে সততার যে ছাপ দেখেছি, আশা করি এটিই তোকে জীবনে অনেক বড় জায়গায় নিয়ে যাবে।’
কথাগুলো শোনার পর বাবাকে খুব বেশি আপন মনে হলো। বাবার খুব কাছে গিয়ে বসলাম। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি আর বাবাকে জাগালাম না। শুধু মাকে বললাম- ‘দেখো, বাবা কীসব বলছে!’ মা আমার দিকে মলিনমুখ করে তাকালেন। আমার মনটা আরও খারাপ হলো। তাহলে মা-ও নিশ্চয়ই জানে, বাবার সমস্যার কথা। তাহলে মা আমাকে সে কথা খুলে বলছে না কেন?
আমি মাকে বললাম- ‘বলো না মা, বাবার কী হয়েছে? বাবা ওরকম করছে কেন? মা কিছু না-বলে আঁচল দিয়ে মুখটি ঢাকলেন। শুধু এইটুকু বললেন, আল্লাহর কাছে বাবার জন্য দোয়া কর।
আমি তখন বললাম- ‘মাগো, আমি তো ছোট্ট মানুষ; আল্লাহ কি আমার কথা শুনবেন?’
‘কেন শুনবেন না?’ এইটুকু বলে মা কাঁদতে কাঁদতে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
চেয়ে দেখি মা রুশুর কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ালেও মা আমার উপস্থিতি টের পেলেন না। আমি বুঝতে পারলাম- মা একেবারেই অন্যমনস্ক। যে মানুষটিকে এতদিন সুস্থ দেখে আসছি সে হঠাৎ করে এতো অসুস্থ! কিছুই আমার মাথায় কাজ করছে না।
আমি বেশ ভাবনায় পড়ে গেলাম। বাবার কিছু হলে আমাদের কী হবে! মা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? আমিই-বা কী করবো।
বেশ কিছুদিন ধরে রুশুর দেখাশোনাও ঠিকমতো হচ্ছে না। খুব অস্থির হয়ে উঠেছে। বড়ই কু-ডাক ডাকছে ও। আমি ওকে ধমক দিয়ে বললাম, ‘আমার বন্ধু হয়ে কোথায় আমাকে সাহায্য করবে তা না, যত অশুভ কথা। ফের যদি আর এসব করিস তোকে আর বন্ধু বলে ভাববোই না। যা তাহলে আমায় ছেড়ে। আমিও তোকে মুক্ত করে দেবো।’
অনেকদিন ধরে বাবা বিছানায় পড়ে আছেন। কোনো কাজ করতে পারেন না। আয়-রোজগার সবই বন্ধ। সংসারে বাবাই ছিলেন একমাত্র আয়ের উৎস। সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই নেই আমাদের। বাবাকে যে একটু ভালো-মন্দ খেতে দেবো তা-ও পারছি না। দিন যতই যাচ্ছে বাবার শরীরের আর উন্নতি হচ্ছে না।
আমি মাকে বললাম- ‘আজ আর চুপ থেকো না, এবার তো বলো বাবার কী হয়েছে?’
‘যে কথা বলতে আমার জিব শুকিয়ে আসে। দম বন্ধ হয়ে যায়। সেই মরণ পথযাত্রী ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষটির কথা তোকে আর কিই বা বলবো?’
মায়ের কথাগুলো শুনে, আমি বাবার বুকের উপর নিজের বুকটি রেখে আলতো করে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। মনটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। এই বাবাকে আমি আর জড়িয়ে ধরতে পারবো না। তাকে আদর করে বলতে পারবো না বাবা। এই কথা আমি যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
হঠাৎ করে আমার রুশুর কথা মনে পড়লো। বেচারি কীরকম আছে তা-ও বলতে পারি না। ওর একটা জীবন আছে। আছে মানুষের মতো দুঃখ-বেদনা। ও আমার কাছে নগণ্য না, ও আমার বন্ধু। রুশু খাঁচার মধ্যে মন খারাপ করে বসে আছে। খাবার দিলেও রুশু মুখে নিচ্ছে না। আমি রুশুকে বললাম, নে রুশু, খাবারটা খা। ভারি অভিমানী হয়ে, ও আজ কিছুই মুখে দিলো না।
হঠাৎ মায়ের চিৎকার শুনে আমি ছুটে গেলাম। যেয়ে দেখি, মা বাবার শিয়রে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম- ‘মা, কী হয়েছে? অমন করে চিৎকার করলে যে!’ মা বললেন, ‘তোর বাবা আর নেই রে!…’
আমি যে কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। নির্বাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। এরপর বাবার কাছে গিয়ে তার শীতল হাতটি ধরে বললাম, এভাবে তুমি ফাঁকি দিলে!
বাবাই যখন আমাদের রক্তের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন, তখন আমিও আর রুশুকে বেঁধে রাখতে চাই না। আমি ওকে খাঁচার বাইরে এনে ছেড়ে দিয়ে বললাম, রুশু, তুই আজ থেকে মুক্ত। তোর স্বাধীনতায় আমি আর কখনো বাঁধা দেবো না। রুশু আমার দিকে তাকিয়ে আছে- ওর চোখ দুটোও ছলছল।
মাকে নিয়ে রওনা হলাম অজানার পথে। মা আর আমি দুজনে গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলছি। রুশুর কথা বড্ড মনে পড়ছে। ও শুধু পাখি নয়, ও আমার বন্ধু।
বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে এসেছি। হঠাৎ করে মাথার উপর তাকিয়ে দেখি একটা পাখি উড়ছে। বারবার আমার দিকে আসার চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য দেখে রুশুর কথা আরও বেশি মনে পড়ছে। এবার সে মায়ের মাথায় এসে পড়ল। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি, এ আমার বন্ধু রুশু।
ওকে বারবার তাড়িয়ে দেওয়ায় বিষণ্ন মনে রুশু একটা গাছের ডালে গিয়ে বসল। আমি সামনে অনেকদূর এগিয়ে গেছি। রুশু আমার পেছনে পড়েছে।
পেছনে তাকালাম। দেখি, একজন শিকারি ওর দিকে বন্দুক তাক করেছে। আমি সবকিছু ছেড়ে শিকারির দিকে দৌড় দিলাম। আর সজোরে চিৎকার দিয়ে বললাম-ওকে মেরো না শিকারি! ও আমার বন্ধু রুশু।
প্রকাশকাল: মে ২০২৫



