অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ফিউচার ওয়ার্ল্ড

0
0

ছেলেটিকে দেখে অবাক হয় রোনুষ। কোথা থেকে, কীভাবে ও এখানে এলো? ও তো ওদের কেউ নয়? চেহারাতেও তেমন মিল নেই। তবে ওর মতো হাত-পা, চোখ-মুখ সব আছে। ছেলেটির জ্ঞান ফেরার পর অস্ফুট স্বরে বলে, আমার বই দাও; আমি বই পড়তেই বেশি ভালোবাসি। তোমার ‘ইয়ার-ব্লুটুথ’ নাও।
রোনুষ একটু অবাক হয়। এমন অদ্ভুত ভাষা সে কখনো শোনেনি। ভাষার শব্দ শুনে মনে হচ্ছে এটি কোনো আদিকালের ‘ডেড ভাষা’। রোনুষ তাড়াতাড়ি ওর বামহাতের বৃদ্ধাঙুলি মাথার বামপাশে স্পর্শ করে। মস্তিষ্কের ‘সেন্স অর্গান’ থেকে সংকেত দেয়— ভাষাটি কয়েক হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রচলিত ছিল। পরে মঙ্গল গ্রহেও ভাষাটি বিস্তার লাভ করে। ভাষাটির নাম ‘বাংলা ভাষা’।
রোনুষ ভাবে— এটা তাহলে মানুষের ভাষা! এ ভাষায় এখন তো কেউ কথা বলে না। বলবেই বা কেমন করে, মানুষ থাকলে তো! শুধু এ ভাষা কেনো, প্রাচীন পৃথিবীর কোনো ভাষাই বর্তমান পৃবিীতে প্রচলিত নেই।
মানুষ প্রজাতি বিলুপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হ্যাঁ, কিছু বইতে মানুষের ভাষা লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে প্রাচীন পৃথিবীর বইগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য। এআই প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে থাকে। এই প্রযুক্তির পূর্বে মানুষ তাদের নিজ কোষ থেকে ‘ক্লোনমানব’ তৈরি করেছিল। কিন্তু তাদের নিয়ে বিপত্তি দেখা দেয়। চেহারা এবং সত্তা একই হওয়ায় মানুষ বিপাকে পড়ে। এরপর মানববিজ্ঞানীরা রোবটমানব তৈরি করে। এরপর আসে এআই প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ ‘হাইব্রিড-মানব’ তৈরি করে। এরা দেখতে অনেকটা মানুষের মতো মনে হলেও বুদ্ধিমত্তায় মানুষের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি। প্রাচীন পৃথিবীর মানুষের মস্তিষ্কে সর্বোচ্চ ৩.২ পেটাবাইট ডাটা ধারণ করতে পারত। বর্তমানে হাইব্রিড-মানব এর ১০ হাজার গুণ ডাটা ধারণ করতে পারে। এজন্য তাদের আলাদা করে বুক কিংবা ফেসবুক পড়তে হয় না। জন্ম থেকেই তাদের মস্তিষ্কে সবকিছু লোড করা থাকে।
ছেলেটি আবার চেঁচিয়ে ওঠে, আমার বই, আমাকে দাও। এ রুমটি অচেনা লাগছে কেনো? কোথায় আমি?
ছেলেটির ভাষা বোঝার জন্য রোনুষ আবার বামহাতের কনিষ্ট আঙুল তুলে মাথার বাম পাশে স্পর্শ করে। ওর ভাষা রোনুষের ভাষায় রূপান্তরিত হবার পর কথোপকথন শুরু হয় :
— তুমি এসেছো পৃথিবীতে। কিন্তু তুমি কি মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছো? তোমার নাম কী?
: আমার নাম স্বনন। আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। লাইব্রেরি রুমে আমি একটি মজার বই পড়ছিলাম। বইটি পড়া এখনো শেষ হয়নি। বইটি আমার চাই।
— এখন ৫০২৫ সাল। এ যুগে কেউ বই পড়ে না।
: কিন্তু আমার তো ওই বইটিই চাই।
— তুমি বইটির নাম বললে আমি তা খুঁজে দিতে পারি।
: সত্যি! স্বনন উৎফুল্ল হয়ে বলে, বইটির নাম ‘‘অ্যাডভাঞ্চার অব দ্য ফিউচার ওয়ার্ল্ড’’।
রোনুষ এবার তার ডানহাতের পাঁচটি আঙুল প্রসারিত করে মাথার ডনি পাশে স্পর্শ করে। মিনিটখানেক পর হাত নামিয়ে বলে, বইটি আমার মেমোরিতে নেই। তবে বইটি আমাদের ‘‘রিজার্ভ মেমোরি বোর্ড’’-এ খুঁজে দেখা যেতে পারে। ওইখানে প্রাচীন পৃথিবীর অনেক বইয়ের পিডিএফ ফাইল লোড করা আছে।
রোনুষ স্বননকে নিয়ে পাশের রুমে ঢুকে পড়ে।
রুমে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে। রোনুষ কিছুদূর হেঁটে গিয়ে একটি বড় মনিটরের সামনে দাঁড়ায়। রোনুষ তার ডানহাতটি শপথের ভঙিতে তুলে ধরে আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে। মনিটরে প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন বইয়ের নাম আসতে থাকে কিন্তু স্বননের বইটি খুঁজে পাওয়া যায় না। রোনুষ এবার স্বননের দিকে তাকিয়ে বলে, মঙ্গলে কিছু মানুষ প্রজাতির বসতি রয়েছে। ওখানে তোমার বইটি থাকতে পারে।
রোনুষ আবার তার ডানহাতটা মনিটর বরাবর তুলে ধরে আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে। মনিটরে বিভিন্ন বইয়ের নাম ও কভার দৃশ্যমান হতে থাকে। হঠাৎ স্বনন চেঁচিয়ে ওঠে, ওই যে লালরঙের কভার দেখা যাচ্ছে! ওটিই আমার বই।
স্বননের কথায় রোনুষ তর্জনী তুলে বইটির কভার স্থির করে।
: বইটি ওপেন করো। স্বনন উৎফুল্ল হয়ে বলে।
— বইটি ওপেন করা যাবে না।
: আরে! ওপেন না করলে পড়ব কীভাবে?
— ওপেন না করেই পড়া যাবে। তুমি এ চেয়ারটায় বসো। রোনুষ স্বননকে পাশের একটি চেয়ারে বসিয়ে দেয়। এরপর পকেট থেকে পেনড্রাইভের মতো সবুজ রঙের ছোট্ট একটি ডিভাইস কানে লাগিয়ে দিয়ে বলে, তুমি এখন মনে মনে পড়তে পারবে।
: কী বলছো এসব!
— দ্যাখোই না।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর স্বনন খুশিতে আপ্লুত হয়ে বলে, হ্যাঁ আমি বইটি পড়তে পারছি। কিন্তু একটা কথা,
চোখের সামনে কিংবা মনিটরে কোনো বই নেই অথচ আমি কীভাবে বইটি পড়তে পারছি। কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
— তোমার মস্তিষ্কের সঙ্গে কানের ডিভাইসের মাধ্যমে ওই বইয়ের মেমোরি সংযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এতেই…
: তোমাদের প্রযুক্তি এত উন্নত। স্বনন বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে।
— তুমি পাশের ছোট মনিটরটির দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, আরো অবাক হবে।
রোনুষের কথায় স্বনন পাশের মনিটরটির দিকে তাকিয়ে দেখে— স্বনন এতক্ষণ মনে মনে যা ভাবছিল তা ওই মনিটরে লেখা হয়ে ভাসছে।
স্বনন কী বলবে ভেবে পায় না কিছুক্ষণ একদৃষ্টে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর বলে, আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না তো?
— না। রোনুষ একটু থেমে বলে, তুমি এসব প্রযুক্তি শিখতে চাইলে এখানে থেকে যেতে পারো। তবে তার জন্য তোমার ব্রেন সার্জারি করতে হবে।
: কী বলছো এসব! আমি বাড়ি ফিরে যাবো। সাজির আমার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে। ও আর আমি একসঙ্গে বাড়ি যাই।
— কিন্তু কীভাবে যাবে? তুমি তো অতীত পৃথিবীতে আর কখনো ফিরে যেতে পারবে না।
: নাহ! আমি আমার দেশে ফিরতে চাই। স্বনন উত্তেজিত কণ্ঠে বলে।
— কোথায় তোমার দেশ?
: এই পৃথিবীতেই আমার দেশ। আমি আমার বাংলাদেশে যাবো। স্বনন কাঁদ-কাঁদ স্বরে বলে।
— বর্তমান পৃথিবীতে তোমার বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব নেই। থাকলে হয়তো তোমার পূর্বপুরুষের ভিটা দেখিয়ে আনতাম। বর্তমান পৃথিবী ‘এক বিশ্ব এক দেশ’— সবাই এক দেশের বাসিন্দা।
: তুমি মিথ্যে বলছো। আমি আমার দেশে ফিরে যাবই। স্বনন চিৎকার দিয়ে মাথা নাড়তে থাকে। এমন সময় ওর কানের ডিভাইসটা পড়ে যায়।
চিৎকার শুনে পাশে বসা বন্ধু সাজির ওর কান থেকে ‘ইয়ার ব্লুটুথ’টা খুলে নিয়ে বলে, বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছিস নাকি?
স্বনন সাজিরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, রোনুষ কই?
— রোনুষ কে? সাজিরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
: ওই যে এআই যুগের ‘হাইব্রিড-মানব’। ও বলছিল…
— এখন বুঝতে পারছি কী ঘটেছে। ইংল্যান্ড থেকে মামার দেওয়া ওই ‘ইয়ার-ব্লুটুথ’টা আসলে…
: কী বলছিস ছাতা কিছুই বুঝতে পারছি না।
— তোর ‘‘অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ফিউচার ওয়ার্ল্ড’’ বইটি আমি পড়ার জন্য নিয়ে যখন ‘ইয়ার-ব্লুটুথ’টা তোর কানে পরিয়ে দিলাম তখনই মনে মনে ভাবছিলাম কিছু একটা ঘটনা ঘটবে। পিকু মামা যা ট্যালেন্ট না?
সাজিরের কথায় স্বনন কিছু না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কৌতূহলভরে তাকিয়ে থাকে।
— এখনো বুঝতে পারছিস না। ওটি আসলে ‘ইয়ার-ব্লুটুথ’ না, ওটি ছিল আমার বিজ্ঞানী মামার নব আবিষ্কৃত ‘মনো টাইম ট্রাভেল’ যন্ত্র। ওটি কানে দেওয়া মাত্রই তুই আধ্যাত্মিকভাবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে চলে গিয়েছিলি। আমি ওটা তোর কান থেকে খুলতেই তুই বর্তমান পৃথিবীতে চলে এসেছিস। টিফিন পেরিয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে। এবার বাড়ি চল। সাজির চেয়ার থেকে উঠে তার হাতের ‘‘অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ফিউচার ওয়ার্ল্ড’’বইটি সেলফে রাখতে রাখতে বলে।
স্বনন কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে সাজিরের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে ঘাড় নেড়ে বলে, হ্যাঁ চল।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫