জ্যাক স্প্যারোর নাম জানো কি? দুনিয়া জোড়া যার খ্যাতি। অনেকেই হয়তো শুনেছো। তিনি কে ছিলেন জানো? নামজাদা মুসলিম বীর ইউসুফ রেইস ওরফে জ্যাক স্প্যারো। গভীর সাগরের সঙ্গে ছিলো যার মিতালি। বিশাল সাগরের সবকিছু তার নখদর্পণে। মহাসাগরের মহা নাবিক। তাই সবাই নাম দিয়েছিল ‘সাগর-সম্রাট’। তখনকার বিশ্বে সাগর সম্পর্কে এতো জ্ঞান, তার মতো আর একজনেরও ছিলো না।
ইউসুফ রেইসের জন্ম হয় ব্রিটেনে, সাগর তীরের এক গাঁয়ে। উপকূলীয় অঞ্চল কেন্টে ফ্যাভারশামে। এখানের লোকজন খুবই গরিব। মাছ ধরেই দিন কাটে তাদের। এই সাগরের বালুঘেরা জেলে পল্লীর এক পরিবারে ১৫৫৩ সালে জন্ম নেয় ছেলেটি, বাবা মা তার নাম রাখেন জ্যাক ওয়ার্ড।
তাদের বাড়ির একেবারে কাছেই সমুদ্র। ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে চলে আসে সাগর-পাড়ে। সাগরে জাহাজের ভৌঁ-ওঁ-ও ডাক যেন সে ঘুমের মধ্যেই শুনতে পায়। পাড়ার ছেলেদের সাথে সাঁতার কেটে, মাছ ধরে কাটে তার সামুদ্রিক জীবন। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকা জ্যাকের মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। সে হয়ে ওঠে এক চৌকস মাছ শিকারী, দক্ষ সাঁতারু।
তাই আকাশে মেঘের রঙ দেখেই জ্যাক বলে দিতে পারে সমুদ্র এখন কী চাইছে। ছোট ছোট ডিঙি নিয়ে সে তার বন্ধুদেরসহ মাছ ধরতে চলে যায় সাগর বুকে। সেখানে সে অন্যদের বুঝিয়ে দেয় কীভাবে সমুদ্রে চলাফেরা করতে হবে। তার জানার বহর দেখে বন্ধুরা অবাক হয়,
-‘আরে. কখন তুই এতকিছু শিখলি?
জ্যাক মাথা নেড়ে হাসে।
সাগরে সারাদিন রঙ-বেরঙের জাহাজ আসা-যাওয়া করে। কত কত দেশের জাহাজ। জাহাজের আশপাশে ঘুরেই দিন কাটে জ্যাকের, তবু কৌতূহল মেটে না। ভয়ে ভয়ে জাহাজের নাবিকদের সাথে কথা বলার সুযোগ খোঁজে। যে সাগরের কূল-কিনারা নাই সেই অতল পানির মাঝে অতবড় জাহাজখানা ভাসিয়ে রাখা তো যে সে লোকের কাজ নয়! পাখা ঝাপটানো সমুদ্র-পাখির ছুটে চলা! জ্যাক মুগ্ধ চোখে দেখে। তরুণ জ্যাক নাবিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে।
বুদ্ধিমান জ্যাকের যে কোনো কিছু শিখতে বেশি সময় দরকার হয় না। নাবিকরা তার জানার আগ্রহ দেখে খুশি হয়। খুঁটিনাটি বিষয়ে সে অল্প সময়েই বেশ তাড়াতাড়ি শিখে যায়। জ্যাক পারলে তখনি জাহাজের হাল ধরে! কিন্তু সে অত সহজ কাজ নয়।
সমুদ্রে যেমন নাবিকরা আসে তেমনি আসে বিভিন্ন দেশের জলদস্যুরা। তারা যেমন দুর্ধর্ষ, তেমনি দুঃসাহসী। তাদেরকে বেপরোয়া জ্যাকের খুব ভালো লাগে। সাগরের অলিগলি জানা জ্যাকের সাথে জল-দস্যুদের বন্ধুত্ব হতেও সময় লাগে না। জলদস্যুদের সাথে সাথে ঘুরে অনেককিছু তার জানা হয়ে যায়।
পাড়ার ছেলেদের নেতা জ্যাক তারই মতো দুঃসাহসী কয়েকজনকে বাছাই করে নেয়। ছোটখাটো একটি দল গঠন করে। তবে তার মতো সাঁতারু, হুঁশিয়ারীর অনন্য গুণ আর একজনেরও নেই। তারা একত্রে সমুদ্রে মাছ শিকার, সাঁতার প্রতিযোগিতা ছাড়াও ছোটখাটো দস্যুগিরি শুরু করে। আর এ কাজের মতো দারুণ কাজ আর একটিও মনে হয় না জ্যাকের। কোনো জাহাজে দলবল নিয়ে হানা দিয়ে ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় তারা ওস্তাদ হয়ে ওঠে।
এ সময় ব্রিটেনের সাথে স্পেনের যুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটেন ভূমধ্যসাগরে স্পেনের নৌবহরে দস্যুগিরির কাজের জন্য লোক খুঁজে বেড়ায়। জ্যাকের চাইতে কে আছে আর উপযুক্ত? ব্রিটেন সরকার জ্যাকের গোটা দলকে এ কাজে লাগিয়ে দেয়। একটা কাজের মতো কাজ পেয়ে তারা তো ভীষণ খুশি। ছুটোছুটি করে তারা ব্রিটেনের পক্ষে কাজ করতে থাকে। সরকারি দলে তার কদর বেড়ে যায়। তাদের ফরমাশ মতো কাজ করতে গিয়ে সে আরো নির্ভীক আর দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে।
কিছুদিন পর যুদ্ধ শেষ হয়। এবার কী করবে জ্যাক? যুদ্ধ শেষে সরকার জ্যাক বা তার দলের আর কোনো খবরই রাখে না। সরকারি কাজ পাওয়ার অনেক চেষ্টা করে জ্যাক। কিন্তু কোথাও কোনো পাত্তা পায় না। জ্যাক জাহাজ চালানোর আবেদন জানায়। দিনের পর দিন তাদের কাছে ধরনা দেয়। অথচ কারো এতটুকু সহানুভূতি পায় না। অনেকদিন অপেক্ষায় থাকে, ডাক পাওয়ার জন্য। কিন্তু কোনো সাড়া পায় না। জ্যাক রেগেমেগে তার দলবল নিয়ে এবার পুরোদমে জলদস্যুগিরিতে মেতে ওঠে। হয়ে ওঠে ভূমধ্যসাগরের ভয়ানক জলদস্যু। তার হাত থেকে গহীন সাগরে যে কোনো জাহাজের রক্ষা পাওয়া কঠিন। জ্যাকের বিরুদ্ধে জমা হয় অভিযোগের পর অভিযোগ। কিন্তু কেউ তার নাগাল পায় না।
১৬০৩ সালে ব্রিটেনের রাজা হন প্রথম জেমস। রাজা জ্যাক ও তার দলকে বন্দি করেন। তাদেরকে জোর করে জাহাজের শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দেন। জাহাজের ক্যাপ্টেনের বদলে শ্রমিকের কাজ করতে হবে তাকে? ভীষণ অপমানিত বোধ করে জ্যাক। কারো দাসগিরি করতে তো জন্ম হয়নি জ্যাকের! খাঁচায় পোরা বাঘের মতো গর্জে ওঠে সে।
ক্রুদ্ধ জ্যাক জাহাজসহ দলবল নিয়ে পালিয়ে যায় তিউনিশিয়ায়। মরক্কোর আবু রাকরাক এলাকায় এসে ঘাঁটি গাড়ে। এখানকার গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে ভূমধ্যসাগরে দস্যুগিরি করা বেশ সহজ। তখন তিউনিশিয়া ছিল উসমানী খিলাফতের অধীন। মুসলিম দেশে মুসলমানদের সাথে থাকতে থাকতে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয় জ্যাক। মুসলিম নাবিকদের নিয়ম শৃঙ্খলাময় জীবন তার বেশ ভালো লাগে।
সাধারণ মুসলমানদের কথায় ও কাজে সততায় মুগ্ধ হয় জ্যাক। মুসলমানদের বিশ্বাসপূর্ণ জীবন তাকে আমূল পাল্টে দেয়। ১৬০৯ সালে জ্যাক তার নাবিকদের নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। নিজের নাম পাল্টে রাখে ইউসুফ রেইস।
আবু রাকরাক এলাকায় ছিল অসংখ্য চড়ুই পাখি। নীল আকাশে ওড়া ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আর মনোরম প্রকৃতি জ্যাকের ভীষণ আপন মনে হয়। জ্যাক চড়ুইদের পেছনে প্রচুর সময় কাটায়। এদের সে ভীষণ ভালোবাসে, খাবার দেয়। হাজারো চড়ুই পাখির দেখভাল করে বেশ আনন্দ পায়। পাখির প্রতি এই দরদের জন্য স্থানীয় লোকেরা তাকে ডাকে- ‘আসফুর’ অর্থাৎ চড়ুই পাখি। এ কারণেই তার নাম হয়ে যায় ‘ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো’।
মুসলিম হওয়ার পর জ্যাকের জীবনধারা একেবারে পাল্টে যায়। আগের সব অনৈতিক কাজ থেকে সে দূরে সরে আসে। ওসমানী খিলাফতের সুলতান তার ভেতরের গুণাবলি দেখতে পেয়ে তাকে মর্যাদা দেন। তাকে উসমানী নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। উসমানী নৌবাহিনীর নাবিকদের প্রশিক্ষকও হন। সম্মান ও স্বীকৃতি জ্যাক স্প্যারোর কাজের দক্ষতা আরো বাড়িয়ে তোলে। এক সময়ে তিনি উসমানী নৌবাহিনীর একজন অসাধারণ নেতায় পরিণত হন।
রাজা ফার্দিনান্দ স্পেনের মুসলমানদের অত্যাচার শুরু করে। আন্দালুসের মরিস্কো মুসলমানদের ওপর খ্রিষ্টানরা অমানুষিক নির্যাতন চালায়। জোর করে খ্রিষ্টান বানানোর চেষ্টা করে। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ মুসলমান আশেপাশের দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে থাকে।
জ্যাক স্প্যারো ওরফে ইউসুফ রেইস এই নিপীড়িত অসহায় মানুষকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন আন্দালুসী মুসলমানদের বাঁচানোর জন্য। গোপনে আবার মরক্কোর জলদস্যুদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন। জ্যাক ও তাঁর জাহাজের সব নাবিক মিলে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন মুসলমানদের বাঁচাতে। তিনি তাঁর রহস্যময় সামুদ্রিক জ্ঞান ও নির্ভীক যুদ্ধনীতি দিয়ে শত্রুদেরকে ঘায়েল করেন।
জ্যাক স্প্যারোর শক্তি, বুদ্ধি আর অসাধারণ কৌশল দেখে সবাই অবাক হতো। তার নাম শুনলেই খ্রিষ্টানরা ভয় পেয়ে পেতো। বাকী জীবন জুলুমের শিকার মানুষের কল্যাণে কাজ করে যান জ্যাক স্প্যারো।
নিজের জন্য কিছুই করেননি ইউসুফ, মানুষের সেবায় জীবন বিলিয়ে দেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজও জ্যাক স্প্যারোর মতো একজন বীর নাবিক, সেবাকারী মানুষের জন্ম হয়নি। ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর আদেশমতো মানুষের জন্যই কাজ করে গেছেন। পেয়েছেন জগৎ জোড়া খ্যাতি, সম্মান, অর্থ পুরস্কার এবং মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা।
এই মহান মুসলিম বীর ৭০ বছর বয়সে ১৬২২ সালে তিউনেসিয়ায় ইন্তেকাল করেন।
হলিউড এর ‘পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান’ সিনেমার সিরিজ তৈরি করা হয়েছে এই বিশ্বজয়ী সমুদ্র-বীর জ্যাক স্প্যারোর জীবন কাহিনী নিয়ে । বিখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনি তৈরি করেন এই সিনেমা। ২০১১ সালে বানানো এই সিনেমার এখন চতুর্থ সিরিজ চলছে। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল সিনেমা। অসম্ভব জনপ্রিয় এ সিরিজের নাম প্রতিটি মানুষ জানে, কিন্তু ইউসুফ রেইস স্প্যারোর নাম কেউ জানে না। ইউসুফের জীবনী নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস-নাটক-চলচ্চিত্র-কার্টুন-সিরিজ ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। কিন্তু হলিউডের সিনেমা নির্মাতারা কখনোই এই মুসলিম বীরের আসল পরিচয় প্রকাশ করেনি।
প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫


