শ্রেয়ার রেজাল্ট

0
0

সকাল থেকেই গুনগুন করে গান গাইছিল শ্রেয়া। যেন উড়ে উড়ে হাঁটছিল। কারণ, আজ শ্রেয়াদের রেজাল্ট দেবে।
এই রেজাল্ট দেয়ার দিনটি শ্রেয়ার খুব প্রিয়। শ্রেয়া ভাবে, কেন এমন দিন মাসে একবার করে আসে না? অন্তত বছরে ছয়বার আসলেও তো পারে। অথচ আসে মাত্র বছরে দুবার— হাফ ইয়ার্লি আর ফাইনাল রেজাল্টের দিন।
রান্নাঘরে কাজ করছিলেন মা। স্কুলে যাবার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে শ্রেয়া মায়ের কাছে গেল। মা পেছন ফিরে তাকালে শ্রেয়া বলল, যাচ্ছি মা। আজ রেজাল্ট দেবে। দোয়া কোরো।
মা তার হাত শ্রেয়ার মাথায় রেখে বললেন, তোকে তো সব সময় দোয়া করি। রেজাল্ট তো জানাই আছে। যা, সাবধানে যাস।
শ্রেয়া মিষ্টি করে হেসে স্কুলের পথে পা বাড়াল।

দুই.
আজ স্কুলে যেতে একটু দেরি হয়েছিল। শ্রেয়া স্কুলের গেটে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বেজে উঠল। তাই শ্রেয়াকে প্রায় ছুটে ক্লাসে গিয়ে বসতে হলো। এর পরপরই এলেন টিনা আপু।
টিনা আপু শ্রেয়াদের ক্লাসটিচার। নিজের চেয়ারে বসে তিনি বললেন, আজ তো দেখছি সবাই এসেছো। ক্লাস ভরা ছাত্রী দেখলে ভালো লাগে। যা হোক, আজ তোমাদের রেজাল্ট দেয়া হবে। আমি রোল নম্বর অনুসারে এক এক করে ডাকবো আর তোমরা এসে রেজাল্ট শিট নিয়ে যাবে। কেউ হইচই করবে না। তো শ্রেয়া, তুমি এসো।
শ্রেয়া সামনে গিয়ে দাঁড়ালে টিনা আপু ওর হাতে রেজাল্ট শিট তুলে দিলেন— আর এভাবে সবার হাতে রেজাল্ট শিট এসে গেল। তখন শুরু হলো ক্লাসমেটরা কে কেমন রেজাল্ট করেছে, তা দেখার প্রতিযোগিতা। শ্রেয়া দেখলো সে সেকেন্ড হয়েছে। ফার্স্ট হয়েছে ওদের ক্লাসের থার্ড গার্ল তুয়া। থার্ড হয়েছে রিয়া। রিয়ার রোল ছিল দশ— এ বছর সে অনেক ভালো রেজাল্ট করে অনেক সামনে চলে এসেছে।
সেকেন্ড কোনো খারাপ পজিশন নয়। সারা বছর পরিশ্রম করেও অনেকে সেকেন্ড হতে পারে না। শ্রেয়া হয়েছে। সে হিসেবে শ্রেয়ার খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু শ্রেয়া খুশি হতে পারল না। কারণ সে ছিল ফার্স্ট গার্ল। ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড হয়ে যাওয়া কোনো খুশির কথা নয়।
রেজাল্ট দেখে শ্রেয়ার চোখ ছলছল করে উঠল। শ্রেয়া ভাবলো, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করলাম, সব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিলাম, তারপরও সেকেন্ড হয়ে গেলাম! এ দুঃখ আমি সইবো কেমন করে?
মন খারাপ করে শ্রেয়া বসে রইল। এক সময় টিনা আপুর চোখ পড়লো শ্রেয়ার ওপর। তিনি বুঝতে পারলেন শ্রেয়ার মন খারাপ হয়েছে। তাই শ্রেয়াকে তার কাছে ডাকলেন তিনি। শ্রেয়া দুরুদুরু বুকে গিয়ে দাঁড়াল টিনা আপুর সামনে।
টিনা আপু বললেন, সব সাবজেক্টেই তুমি সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছো। শুধু অঙ্কটাতে একটু কম। এ নিয়ে মন খারাপ কোরো না।
শ্রেয়া বলল, নিজের জন্য নয়, বাবার জন্যে মন খারাপ লাগছে। বাবা খুব দুঃখ পাবেন এ রেজাল্ট দেখে।
: না, দুঃখ পাবেন না। কারণ তিনি জানেন, তিনি দুঃখ পেলে তুমিও দুঃখ পাবে। আজ আর ক্লাস হবে না। সোজা বাসায় গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দাও, ইনশাআল্লাহ আগামীবার তুমি অঙ্কে একশোতে একশো পাবে। কেউ তোমাকে সেকেন্ড করতে পারবে না। তো আমি এখন যাই। কাল আবার দেখা হবে। ভালো থেকো সবাই।
কথাগুলো বলে টিনা আপু ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

তিন.
মা জানতেন আজ শ্রেয়াদের রেজাল্ট দেবে। তাই বাসার সামনে রিকশা এসে দাঁড়াতেই তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তারপর হাত তুলে শ্রেয়াকে বললেন, এই যে আমি এখানে। এদিকে আয়।
বাসায় ঢোকার আগেই মায়ের মুখোমুখি হতে হবে, শ্রেয়া তা ভাবেনি। শ্রেয়া ভেবেছে মায়ের মন যখন ভালো থাকবে তখন তাকে রেজাল্টের কথা বলবে। কিন্তু সব প্ল্যান উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। শ্রেয়াকে দেখে মা বললেন, এতোক্ষণে এলি? সেই কখন থেকে আমি অপেক্ষা করছি। তো এবার মার্কস কতো উঠেছে? সাড়ে নয়শো অ্যাকসিড করেছে?
শ্রেয়া বলল, হ্যাঁ। নয়শো বাহাত্তর।
: নয়শো বা-হা-ত্ত-র! এ তো দারুণ রেজাল্ট! আজ তোকে আইসক্রিম খাওয়াবো। নাকি খালামণির বাসায় যাবি?
শ্রেয়ার গাল টিপে দিয়ে কথাগুলো বললেন মা। তা শুনে শ্রেয়া বলল, আমি কোথাও যাবো না। কিছু খাবো না মা।
: কোথাও যাবি না, কিছু খাবি না, কেন রে? হয়েছে কী?
শ্রেয়া বলল, কী আর হবে! মন ভালো নেই।
শ্রেয়া যতোই মন খারাপ করে কথাটা বলুক, মা তা বুঝতে পারলেন না। বরং মেয়ের মন খারাপ হয়েছে শুনে মায়ের বুক গর্বে ভরে গেল। মা ভাবলেন, নিশ্চয়ই হানড্রেড পারসেন্ট মার্কস পায়নি বলে মেয়ের মন খারাপ হয়েছে। ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই এক সমস্যা— একটু নম্বর কম পেলেই ওদের মন খারাপ হয়ে যায়। বুঝতেই চায় না যে এটা কম্পিটিশনের যুগ।
মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে মা বললেন, তুই সিক্সে উঠেছিলি নয়শো একান্ন পেয়ে। সেভেনে উঠছিস নয়শো বাহাত্তর পেয়ে। গতবারের চেয়ে একুশ নম্বর বেশি। তার পরও তোর মন খারাপ! বোকা নাকি!
শ্রেয়ার কান্না পাচ্ছিল। সে অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলল, বোকা নই মা। আমি এক হতভাগী। নয়শো বাহাত্তর পেয়েও ফার্স্ট হতে পারিনি।
: কী হতে পারিসনি?
: ফার্স্ট। নয়শো তিয়াত্তর পেয়ে তুয়া ফার্স্ট হয়েছে।
শ্রেয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে থমকে দাঁড়ালেন মা। সঙ্কুচিত শ্রেয়া মিনমিন করে বলল, তুয়া ফার্স্ট হয়েছে আর আমি সেকেন্ড। তুয়া হবে না কেন, বলো? এবার আমার ভাগ্যটাই খারাপ।
: ভাগ্যের দোষ দিচ্ছিস কেন? ভাগ্য তো বৃষ্টির মতো আকাশ থেকে পড়ে না। ভাগ্যকে পরিশ্রম করে গড়ে নিতে হয়। নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য অসফল মানুষরাই শুধু ভাগ্যের দোষ দেয়।
শ্রেয়া বলল, তুমি এভাবে বোলো না মা। ভাগ্যের হয়তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু আমি কী করবো? ইচ্ছে করে তো সেকেন্ড হইনি! মা, আমার রেজাল্ট দেখবে না?
বারান্দায় উঠতে উঠতে মা বললেন, বাবার আদরের মেয়ে। ওই রেজাল্ট তোর বাবাকে দেখাস। দেখিস, এর মাঝেও তিনি আনন্দ খুঁজে পাবেন।

চার.
রেজাল্ট দেখে বাবা শ্রেয়ার চুলগুলো নেড়ে দিয়ে আদর করলেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। ধীরে ধীরে জানালার সামনে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মায়ের কথা শুনে শ্রেয়ার যতো কষ্ট লেগেছিল, বাবার কথা না বলা শ্রেয়াকে তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিলো। বাবার মন খারাপ করে দেয়ার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হলো। আর সেই অপরাধবোধ শ্রেয়ার বুকে এতোটাই আঘাত করলো যে, শ্রেয়া ডুকরে কেঁদে উঠল।
তখনো বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার কানে কান্নার শব্দ যেতেই চমকে উঠে ঘুরে তাকালেন তিনি। অমনি তার বুকের ভেতর কেমন কেমন করে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে মা? কাঁদছিস কেন?
ডুকরে উঠে শ্রেয়া বলল, আমি তোমাকে দুঃখ দিয়েছি।
: বুঝলাম, বাবাকে দুঃখ দিয়ে তোর কান্না পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখ দিয়েছিস কেমন করে, তা তো বুঝলাম না।
বললেন বাবা। সে কথা শুনে শ্রেয়া বলল, তুমি বোকা নাকি! দেখতে পাওনি এবার আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে? আমি ফার্স্ট হতে পারিনি— সেকেন্ড হয়েছি বাবা।
বাবা বললেন, সে তো দেখেছিই। তাতে হয়েছেটা কী?
শ্রেয়া বলল, আবার বোকাদের মতো কথা বলছো। তোমার মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করেছে, তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
বাবা বললেন, প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল। পরে মনে হয়েছে, সব বছরই যে ফার্স্ট হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে অন্যদেরও সুযোগ দিতে হয়।
শ্রেয়া বলল, সুযোগ দেয়া না দেয়াটা তো ইচ্ছের ব্যাপার। কাউকে সুযোগ দেয়ার মতো ইচ্ছে আমার ছিল না। একটা অঙ্ক ভুল করেছি, সেই সুযোগে তুয়া ফার্স্ট হয়ে গেছে।
বাবা বললেন, এটাই নিয়ম। এমনই হয়ে এসেছে প্রতিটি সময়— যারা প্রতিভাবান, অন্যের ভুলের সুযোগ নিয়ে তারা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে।
: তাই?
অবাক হয়ে শ্রেয়া বাবার দিকে তাকাল। বাবা বললেন, অবশ্যই তাই। তুই হয়তো জানিস না, যতোবার তুই ফার্স্ট হয়েছিস, ততোবার তোর বেলাতেও সেই একই নিয়ম কাজ করেছে— অন্যের ভুলের সুযোগ নিয়ে তুই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিস। ফার্স্ট হয়ে গেছিস।
: কিন্তু বাবা, একেবারে থার্ড পজিশন থেকে তুয়া ফার্স্ট হয়ে গেল— একেবারে থার্ড থেকে ফার্স্ট! আর আমি— ছিঃ!
লজ্জা আর বেদনায় একাকার হয়ে গেল শ্রেয়ার কণ্ঠ।
বাবা খুব মিষ্টি করে হেসে শ্রেয়ার মাথায় হাত রাখলেন। ওর চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো ছিল, সেই চুল এলোমেলো করে দিয়ে তিনি বললেন, ফার্স্ট হয়েছে তো কী হয়েছে! এবার তুয়া হয়েছে, পরের বার তুই হবি। তবে আমি বলবো, ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়াটাই জীবনের বড়ো কথা নয়— স্বভাব-চরিত্র আর নীতি-আদর্শে দৃঢ় থেকে মানুষের মতো মানুষ হতে পারাটাই বড়ো কথা।
শ্রেয়া বলল, এ কথা তুমি আরেক দিন বলেছো।
বাবা বললেন, সারা জীবন বলবো। রেজাল্ট ভালো হতে হবে কর্মে ও আদর্শে। আরেকটি কথা— তোর নাম শ্রেয়া। এ শব্দটার অর্থ জানিস?
: জানি বাবা। কয়েকটা অর্থ রয়েছে এ শব্দের।
বাবা বললেন, সেই কয়টার মধ্যে একটা অর্থ শ্রেষ্ঠ, তা জানিস?
: জানি বাবা।
: আমি চাই তুই তেমন এক শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবি। স্বভাব-চরিত্র আর মানবতায় সবাইকে হারিয়ে ফার্স্ট হবি তুই। সে জন্যই অনেক আশায় ভর করে তোর নাম রেখেছি শ্রেয়া।
: তাই? সে জন্যেই আমার এ নাম রেখেছো, বাবা?
: হ্যাঁ মা, সে জন্যেই। তো শ্রেয়া, স্বভাব-চরিত্র আর মানবতায় আমার মনের মতো মানুষ হতে পারবি তো?
বাবার বুকে মাথা রেখে শ্রেয়া বলল, পারবো বাবা, পারবো। আমি তোমার মনের মতো হবো।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫