মাসুদ খেলার মাঠের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে চলা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিদিনই খেলে সে এই মাঠেই, ওই ছেলেদের সাথেই। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম।
ফুটবলে তার তুলনা নেই। মাঠের চারপাশে ড্রিবলিং দিয়ে চলতে থাকবে কিন্তু কারো সাধ্যে ও সাহসে কুলোয় না তাকে আটকায়। কারণও আছে বটে। মাসুদ এমনিতেই বেশ স্বাস্থ্যবান। এছাড়া গতি আর ক্ষিপ্রতায়ও অন্যরকম। বলা চলে ফুটবল খেলবার সময় রীতিমতো ভয়ংকর হয়ে ওঠে সে। আর প্রতিবার তার দলই বিজয়ী হয়। ফলে গত পরশু পর্যন্ত এক প্রকার গর্বই ছিলো তার এই ব্যাপারে যে, তাকে কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু গতকাল তার ভুল ভেঙে যায়।
মাসুদের পাড়ায় নতুন একটি ছেলে এসেছে মাসখানেক হলো। বেশ হালকাপাতলা গড়নের, নাম মাহাদী। বয়সে মাসুদের এক বছর ছোটো। এতদিন মাসুদের সাথেই বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলতো। অন্যান্য খেলোয়াড়দেরই মাসুদ বেশ ছোট করে দেখতো, ফলে বলাইবাহুল্য, মাহাদীকে গুনতোই না সে। অবশ্য এটা স্বাভাবিকই।
যাহোক, মাসুদ প্রায়ই লক্ষ করতো যে, অন্য খেলোয়াড়রা যাও তার আশেপাশে থাকতো, কিন্তু মাহাদী নামক ছেলেটি বেশ দূরে মাঠের এককোণেই থাকতো সবসময়। ফলে মাসুদ ভেবে নিয়েছিল, হয়তো মাহাদী একটু বেশি নিরাপদ থাকতে চায়- যার ফলে মাহাদীকে ভীতু হিসেবেই ধরে নিয়েছিলো সে। কিন্তু মাসুদের ধারণা যে ভুল ছিলো, তা সে টের পায় গতকাল।
প্রতিদিনের ন্যায় মাসুদ তার ভয়ানক ভঙ্গিতে পায়ে করে বল নিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে একজন এসে বলে আঘাত করে মাসুদের সামনে থেকে বল সরিয়ে নিয়ে যায়। গতি থামাতে থামাতে খানিক মুহূর্ত লেগে যায়। পিছনে ফিরে দেখলো মাহাদী বলটিকে মাঠের অন্যপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। মাসুদ পুরোপুরি হতবাক হয়ে যায়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সেও ছুটে গেলো মাহাদীর দিকে। গতির জন্যে মাহাদীর কাছে ঠিকই পৌঁছলো, কিন্তু তার কাছাকাছি যেতেই বলটি তার পাশের টিম মেম্বারের দিকে পাস করে মাসুদ ঐ খেলোয়াড়ের দিকে ফিরে ছুটে গেলো। মাসুদ সেখানে পৌঁছার আগেই মাহাদী টিম মেম্বারের কাছ থেকে বল নিয়ে সামনের আরেক টিম মেম্বারকে পাস করে দেয়। মাসুদ আবার তার দিকে ছুটলো। শেষমেষ মাসুদের নাগালের বাইরেই বল রয়ে গেলো। মাহাদীরা বল গোলপোস্টে ছুড়ে মারতে পেরেছিলো মোট তিনবার, এর মধ্যে একবার গোল হয়েছে। অন্যদিকে মাসুদরা বল নাগালেই পেলো না, ফলশ্রুতিতে গোল করার প্রশ্নই নেই। এভাবেই খেলা হয়, পরে মাগরিবের আজান হতেই মাহাদী খেলা রেখে সোজা মসজিদের দিকে হাঁটা ধরলো। খেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হওয়ায় টিমের অন্য খেলোয়াড়রাও তাকে অনুসরণ করলো, এমনকি মাসুদের টিমেরও অনেকে মাহাদীর পিছন পিছন মসজিদে চলে গেল। মাঠে শুধু মাসুদ আর তার ঘনিষ্ঠ দুইজন বন্ধু রয়েছে। তার বন্ধুরা তার দিকে তাকাতেই একটা ধমক দিলো সে আর নিজেও মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
গতকালের এমন হতবাক করা আর আচানক ঘটনাবলী মাসুদের কাছে আজ সকাল থেকেই কেন জানি মানসিকভাবে তার সার্বিক অবস্থাকে খারাপ প্রমাণিত করছে। তাকে মনে করাচ্ছে – তোমার আরো ভালো হতে হবে, এর মানে এই নয় যে পারদর্শিতায় ভালো হলেই চলবে। বরং তোমায় হতে হবে আন্তরিক সকল ক্ষেত্রে।
ফুটবল খেলা শেষ হয়ে গেছে খানিক আগেই। মাসুদ মাঠের মাঝামাঝিতে চলে আসে। সবাই তার দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু সে গম্ভীর অবস্থাতেই মাহাদীর সামনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বুকে। আজ মাসুদের মনে আনন্দের সত্যিকার রূপ ধরা দিয়েছে।
প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫



