আমার বেড়ে ওঠা (৪র্থ পর্ব)

0
3

উদ্যোগটা কেমন ছিলো জানো? প্রথম মুরগীর মাথাটা গলা থেকে পৃথক হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় মুরগীটি রক্তাক্ত কাটা গলা নিয়ে দৌড় দিয়েছে। প্রথমটায় ছুরি জোরে চালিয়েছিলাম আর দ্বিতীয়টায় ছুরি আস্তে চালিয়েছিলাম। কোনোটাই ঠিক মতো হয়নি।
আমার জন্ম হয়েছিলো দিনাজপুর জেলার সদর হাসপাতালে। সে কারণে আব্বাজান বলতেন- যে কালে শিশুদের জন্ম হতো আনাড়ী দাইদের হাতে, সে কালে তোমার জন্ম হয়েছে আধুনিক শিক্ষিত নার্সদের হাতে- সুতরাং তোমার চলনে-বলনে আধুনিকতা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।
খুব ছোটকালের স্মৃতি তেমন আর অবশিষ্ট নাই। তবে খতনা বা মুসলমানী করানোর পর আব্বাজান যে ‘জেয়াফত’ বা ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন এবং সে আয়োজনে অনেক লোক সমবেত হয়েছিলো, সে সব দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে। আমাকে লুঙ্গি-পাঞ্জাবী-পাগড়ী পরানো হয়েছিলো। মকবুল চাচা (আব্বার পিয়ন) তার দু’হাতের ওপর আমাকে বসিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এবং মানুষজন আমাকে আধুলি ও টাকা (মুদ্রা) দিচ্ছিলেন, তা আমার বেশ মনে আছে। বেশ একটা সরগরম বা হৈ-চৈ-এর অনুষ্ঠান ছিলো সেটা। মেহমানরা দোয়া করছিলেন, আমি যেনো ভালো মুসলমান হই। এই অনুষ্ঠানে কে যেন আমাকে বলেছিলেন, তুমি তো আজ থেকে মুসলমান হলে, এর আগে তুমি মুসলমান ছিলে না। আব্বার পাতানো ছেলে আফাজ ভাই বলেছিলেন- কথাটি ঠিক হলো না, আল্লাহর বাণী অনুযায়ী প্রতিটি শিশু মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে মা-বাবার কারণে শিশুটি ইয়াহুদি-খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করে।
এসব কথা নিয়ে ঐ অনুষ্ঠানে অনেক বাহস (তর্ক-বিতর্ক) হয়েছিলো। বেশ নাকি জমে উঠেছিলো সে অনুষ্ঠান। আমাদের এক মামা ছিলেন (মামার শ্যালক) পুলিশ। তাঁর নাম ছিলো আজিম মামা। তিনি ঐ বাহসে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুলিশ হলেও খুব ভদ্র ও নম্র মানুষ ছিলেন তিনি। স্কুলজীবনে তাঁর কাছ থেকেই এসব শুনেছি। বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন এই আজিম মামা। নোয়াখালীর চরমটুয়ার এক সম্ভ্রান্ত তালুকদার পরিবারে তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ আমলে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লোক সংগ্রহের সময় কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে যাচাই করতো যে, যাকে মনোনীত করা হচ্ছে সে সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক কিনা। এখন অবশ্য এসব দেখা হয় না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।
একটা ছোট্ট স্মৃতি এখনও আমার মনে জাগরুক আছে। তা হলো, আমার ৪ বছর ৪ মাস ৪ দিন বয়সে আমার ‘হাতেখড়ি’ হয়েছিলো। আমাদের সময়ে এ বিষয়টা বেশ চালু ছিলো। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মধ্যবিত্ত পরিবারে এসব হতো। অনুষ্ঠানটির নাম ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। এক এক এলাকায় এক এক রকম। তখন বুঝিনি। পরবর্তী সময় বড় হলে বুঝেছি। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘হাতে-খড়ি’। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ‘বিসমিল্লাহখানী’। হিন্দুরা শিশুর হাতেখড়ি (লেখার চক) দিতো সাড়ে তিন বছরে। অনুষ্ঠান সম্পর্কে বড় আপার বর্ণনা ছিলো এমন: ‘তোর বয়স যখন ৪ বছর ৪ মাস ৪ দিন হয়, সেদিনই আব্বাজান বিরাট করে মিলাদের আয়োজন করেছিলেন। বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও পাড়া-পড়শিদের দাওয়াত করেছিলেন। বারান্দা ও ভেতরের উঠানে বসেছিলেন পুরুষরা আর মহিলারা চারপাশের ঘরে। আব্বা বললেন, আমরা মুসলমানরা শিশুদের হাতে তো ‘খড়ি’ দেই না। আমরা পবিত্র কুরআনের শব্দ শেখাই। এ কারণে এই অনুষ্ঠানের নাম ‘বিসমিল্লাহখানী’। কিন্তু দিনাজপুরে তো ‘হাতেখড়ি’ই বলে। নাম যাই হোক না কেনো, শিশুর হাতে ‘বই-খাতা’ তুলে দেওয়ার জন্যই আজকের অনুষ্ঠান। আমরা আজ হিরণের (আমার ডাকনাম) হাতে আরবি কায়দা এবং বাংলা বাল্যশিক্ষা তুলে দেবো। ঘাষিপাড়া জামে মসজিদের ইমাম এই বিসমিল্লাহখানীর
উদ্বোধন করবেন। তোকে সেদিন আলিফ, বে, তে তখন আরবি অক্ষর ‘বা’ কে বে এবং ‘তা’ কে তে বলা হতো এবং অ, আ’র পাঠ দেয়া হয়েছিলো। তুই খুব অল্পতেই পাঠ গ্রহণ করতে পেরেছিলি। উপস্থিত সজ্জনেরা খুব খুশি হয়েছিলো। সেদিন তোর পরনে ছিলো টুপি-পাঞ্জাবী-পায়জামা। খুব সুন্দর লাগছিলো তোকে।’
আমার এই বড়আপার কথা বারবার আসবে। কেনো আসবে জানো? বড়আপার কাছে আমি বড় হয়েছি। বড়আপা আমাকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বড় করার জন্য চেষ্টাও করেছিলেন। বারবার কাছে টেনে নিয়েছিলেন। আমি বড় হই, বড় মানুষ হই, এটা তিনি আন্তরিকভাবে কামনা করতেন। কোনো বোন কোনো ভাইকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসে, এ এক বিরল অভিজ্ঞতা আমার জীবনে। (চলবে)

প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০১০