আব্বাজান কোলকাতায় গিয়ে উঠলেন আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীদের বাড়িতে। তখনকার দিনে নিকট আত্মীয় দূরে থাক, গাঁয়ের পড়শীরা পর্যন্ত শহরে বা নগরে এলে পরিচিত কারো না কারো বাড়িতে উঠতেন। এটাই ছিলো রেওয়াজ। না উঠলে শহরের মানুষ মনে কষ্ট পেতেন। শহরে যে আসতো, পরিচিত হলে তো কথা নেই, পরিচিত না হলে বা সরাসরি পরিচিত না হলে মুরুব্বিদের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে আসতেন। চিঠিতে লজিং রাখার, পড়ালেখার ব্যবস্থা করার বা চাকরি দেয়ার আবদার থাকতো। শহরের মানুষ এসব আবদার রক্ষা করার চেষ্টা করতো। এ ব্যাপারে কার্পণ্য বা অবহেলা করতো না। শহরে যারা বিত্তবান ছিলেন, তাদের তো মেহমানখানা বা মুসাফিরখানা থাকতো। থাকতো আলাদা বৈঠকখানাও। যারা মধ্যবিত্ত বা মোটামুটি স্বচ্ছল, তাদেরও থাকতো গেস্টরুম। মেহমান আসবে, মেহমান থাকবে- এটা ছিলো অনিবার্য বিষয়। এছাড়া থাকতো পেয়িং গেস্ট-এর ব্যবস্থা। সামান্য অর্থের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। শহরে যারা নতুন আসতো, তাদের জন্য এসব ছিলো আল্লাহর রহমত! অনেক বড়ো পাওনা! অনেক বড়ো পুরস্কার।
আব্বাজান লজিংমাস্টার বা পেয়িংগেস্ট ছিলেন না। তিনি আত্মীয়ের বাড়িতে এমনিই ছিলেন। তাঁকে থাকা-খাওয়ার জন্য কেনো অর্থ দিতে হতো না।
তখনও আমাদের তালুকদারী ছিলো। প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা পাওয়া যেতো। তালুকদারীর অর্থ তিন দাদার মধ্যে ভাগ হতো। আমার দাদার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন আমার আব্বাজান। সুতরাং তাঁর টাকা-পয়সার অভাব ছিলো না। আব্বার এক বোন আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছিলো ন্যাশনাল এক ডাক্তারের সাথে। তিনিও অবস্থাপন্ন ছিলেন। এলাকায়, অর্থাৎ বর্তমানের কবিরহাট উপজেলা এলাকায় তাঁকে সবাই বকু ডাক্তার বলে সম্বোধন করতো। তাঁর ভাই ছিলেন হাইকোর্টের জজ। যার ছেলে ছিলেন অভিনেতা আজিম। তিনিও এখন পরপারে।
আব্বাজান ছেয়েছিলেন ডাক্তারী পড়তে। ডাক্তারী পড়ার জন্য ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তিও হয়েছিলেন। এদিকে দেশ থেকে কলেরা ও বসন্ত নির্মূল করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বেশ তোড়জোর শুরু করে দিলো। সংবাদপত্রে লেখালেখি ও বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলো যে মাত্র ১ বছরের ট্রেনিং-এ স্যানেটারি ইন্সপেক্টরশিপ দেয়া হবে। প্রত্যেক থানায় একজন করে স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নেয়া হবে। যাদের ওপর দায়িত্ব থাকবে একটি নির্দিষ্ট থানায় যেনো কলেরা ও বসন্ত না হয় এবং থানার লোকজন যেনো স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন করতে পারে।
মহামারী কলেরায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষসহ আমার দাদা-দাদি ইনতেকাল করেছিলেন। আব্বাজানের বয়স ছিলো তখন মাত্র ১২ বছর। সে বয়সে তিনি এতিম হয়েছিলেন। দুঃখের সে স্মৃতি তাঁর কাছে ছিলো জাজ্বল্যমান। কলেরা শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, এ কথা তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি।
বিজ্ঞপ্তি পড়ে তিনি স্থির করলেন, স্যানেটারি ইন্সপেক্টর হবেন এবং দেশ থেকে কলেরা-বসন্ত তথা মহামারী নির্মূল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। আব্বাজান বরাবরই ছিলেন একরোখা ও জেদী মানুষ। একবার কোনো বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে একচুল পরিমাণ নড়াচড়া করতেন না। বলতেন ইস্তেখারা ও পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সিদ্ধান্তের ওপর স্থির থাকতে হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে আল্লাহ সাহায্য করেন।
আত্মীয়-স্বজনের বাধা উপেক্ষা করে কলেজের পড়া ছেড়ে আব্বাজান স্যানেটারি ইন্সপেক্টর হওয়ার জন্য ভর্তি হয়ে গেলেন। যথাসময়ে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৯ সালের প্রথমদিকে দিনাজপুর জেলা বোর্ডে চাকরি নিলেন। দিনাজপুর জেলা তখন অনেক বড় জেলা। ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলাসহ ছিলো এর ব্যাপ্তি। ২২টি ছিলো থানা।
পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কাল থেকে শুরু করে অনেক বছর ডিস্ট্রিক হেল্থ অফিসারের চার্জে ছিলেন। ভারত ভাগ হওয়ায় সনাতন ধর্মের লোকেরা ভারতে পাড়ি জমায়। উচ্চশিক্ষিতরা ছিলেন বেশিরভাগই সনাতন ধর্মের। তারা ভারতে চলে যাওয়ায় মুসলমান ‘হেলথ অফিসার’ হতে হলে কমপক্ষে এমবিবিএস পাস করতে হতো। মুসলমানরা তখনও ডাক্তারী পড়ায় বেশি এগিয়ে আসেনি। সে কারণে সিনিয়র স্যানেটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে আব্বাজানকে হেল্থ অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
আব্বাজান প্রথম বিয়ে করেন ছোটদাদার বড়ো মেয়েকে। সম্ভবতঃ ১৯২৮ সালে। তখন তিনি কোলকাতায় পড়ালেখা করছিলেন। ১৯২৯ সালে দিনাজপুরে চাকরিতে যাওয়ার প্রাক্কালে আব্বাজানের সংসারে প্রথম মেয়ে সন্তান আসে। নাম রাখেন শামসুন নাহার। ডাকনাম ছিলো নাহার। আমাদের এই বড়ো আপা খুব সুন্দরী ও মেধাবী ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি গানের চর্চাও করেছিলেন। আব্বাজান তাঁর জন্য গানের শিক্ষক রেখেছিলেন।
বড়আপা শৈশবেই মাতৃহারা হন। তাঁকে দেখাশোনার কেউ থাকে না। এদিকে আব্বাজানের সংগে এক সনাতন পরিবারের সখ্য হয়। তাঁরা সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাদের এক কুমারী মেয়েকে আব্বাজান বিয়ে করেন। তিনি বড়আপার লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। নব মুসলিম এই মা’টিও বেশি হায়াত পাননি। তবে যতোদিন বেঁচে ছিলেন আব্বার সংসারের সকল ঝক্কি-ঝামেলা আনন্দ-চিত্তে বহন করেছেন। বড়আপা বলতেনঃ “আব্বাজানের শখের শেষ ছিলো না। দাদার নামে ফুটবল খেলার শিল্ড ঘোষণা করেছিলেন। শিল্ডের নাম ছিল ‘ছাবের চ্যালেঞ্জ শিল্ড’। ১১ জন খেলোয়াড় বৈঠকখানার পাশেই থাকতো। তাদের ভরন-পোষণ আব্বাজানই বহন করতেন। এক রশাইতে প্রতিদিন ২০/২১ জনের রান্না-বান্না হতো। এসব ছাড়া ছিপ ফেলে মাছ ধরার একঝাঁক বন্ধু ছিলো আব্বাজানের। তাঁরা দল বেঁধে রামসাগর, জুলুম সাগর, শীবসাগর নামের প্রকাণ্ড দিঘিতে বড়শী ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করতেন। যাওয়ার আগে এবং ফিরে এসে সবাই মিলে দু’দণ্ড আড্ডা দিতেন। চা-নাস্তা ছাড়া কি আড্ডা জমতো?- সবই সামলাতেন এই মা।”
এই মা মারা যাওয়ার পর আব্বার একমাত্র অভিভাবক ছোট দাদা মুজাহিদ মিয়া তার বিধবা পুত্রবধূর সাথে আব্বার বিয়ে দেন। অর্থাৎ শ্যালক ও চাচাতো ভাইর বিধবা বউর সাথে আব্বার বিয়ে হয়। সম্ভবতঃ এই বিয়ে হয় ১৯৪৬ সালে। আব্বা ছিলেন বিপত্নীক আর আম্মা ছিলেন বিধবা। দু’জনের ঘরে দুঃখবহ দু’সন্তান ছিলো। দু’জন দুঃখিত ও শোকাবহ মানুষ যে নতুন সংসার গড়ে তুলেছিলেন, সে সংসারে আমি এসেছিলাম ১৯৪৮ সালের ৬ জুনে। আমার বড় বোন ও বড় ভাই ছিলো। দুলাভাই ছিদ্দিকউল্লাহ মিয়া। আমি দেখতে খুব নাদুস-নুদুস ছিলাম। আমার পেটটা অপেক্ষাকৃত বড় ছিলো।
আমার ছোটকালের প্রায় সব ঘটনা খুব রসিয়ে রসিয়ে বলতেন বড়আপা, দুলাভাই ও বড়ভাই মাসুদ। আজ এ দুনিয়াতে তারা কেউ নেই। সবাই পরপারে। আব্বাজানও পরপারে। মুরুব্বিদের মধ্যে বেঁচে আছেন আম্মাজান। ছোটকালে আম্মাজানও অনেক কাহিনী শোনাতেন। এখন আর শোনান না। অসুখ-বিসুখ সহ আনন্দ-বেদনায় বেঁচে আছে মাত্র।
আমার বয়স যখন দু’বছর, অর্থাৎ ১৯৫০ সালে আমার বড়আপার বিয়ে হয়। বিয়ের পর দিনাজপুর থেকে তিনি চলে যান নোয়াখালীতে। আমি তার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হই। আম্মার কাছে শোনা, তিনি বলেছেনঃ ‘তোকে তো দু’বছর পর্যন্ত লালন-পালন করেছে নাহার। তোর জন্য ওর পড়া হতো না, গান শেখা হতো না। তুই সব-সময় ওর সাথে থাকতি।’
শুনেছি বড়আপা চলে যাওয়ায় আমার আদর বেড়ে গিয়েছিলো। কিছুকাল আব্বা ঘরমুখী হয়েছিলেন। অফিসের পর বাসায় থেকে আমার যত্নআত্তি করতেন। বড়আপার অভাব আব্বাজান পূরণ করার চেষ্টা করতেন।
আমার জন্মের সময় আব্বা ছিলেন ডিস্ট্রিক হেল্থ অফিসারের চার্জে। বিরাট জেলা। মাঝে মাঝে তিনি সফরে থাকতেন। আবার টাকা-পয়সার জন্য নোয়াখালীর গ্রামেও যেতেন। সে সময়ে আমাকে দেখার জন্য কোনো না কোনো আত্মীয়কে বাসায় রেখে যেতেন। এমনিতে আব্বার পাতানো ছেলেমেয়ের অভাব ছিলো না। অনেকের নামও এখন আমার মনে আছে। জলিলভাই, কালাম ভাই, আরিফভাই, এতিমন আপা, রওশন আপাসহ আরো কতোজন- যাদের সবার নাম এখন আর মনে নেই। এরাও আসতেন, আমাদের দেখভাল করতেন।
মুদিপাড়ার যে বাড়িটায় আমরা থাকতাম, তাতে ছিলো বড় বড় চারটা ঘর। চারপাশে চারটা। মাঝে ছিলো বিরাট উঠান। বাড়ির বাইরে ছিলো ছোটখাট একটা মাঠ। মাঠটি ছিলো ঘাসে পরিপূর্ণ। সে মাঠে আব্বাজান একবার কোরবানি ঈদে উট জবাই করেছিলেন, সে চিত্র এখনও আমার চোখে ভাসে। ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য আমি দেখেছিলাম। আব্বাকে ঐ অবস্থায় দেখে আমার ভালো লাগেনি। ছোটকালে ঐ দৃশ্য যখনই মনে পড়েছে, তখনই আব্বাকে নিষ্ঠুর বা কঠিন হৃদয়ের মানুষ মনে হয়েছে। কিন্তু আব্বা ছিলেন নরম দিলের মানুষ। মানুষের দুঃখে ও কষ্টে তিনি কাঁদতেন, সহযোগিতার জন্য দৌড়ে যেতেন! দু’টি বিষয়কে আমি অনেকটা কাল এক করতে পারিনি। বড় হয়ে বুঝেছি এটা নিষ্ঠুরতা নয়, এটা নবীর সুন্নত।
সুন্দর ও মনোরমভাবে পশু জবাই করাও কোমল হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। একজন হৃদয়বান কোমল মনের মানুষই সুন্দরভাবে পশু জবাই করতে পারেন। আব্বা সারা জীবন এ কাজটা করেছেন, আমি পারিনি। একবার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। সে কারণে আর ওপথে যাইনি। (চলবে)
প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০১০



