আমার যখন আধো আধো বুঝজ্ঞান হয় আমরা তখন পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানায় বসবাস করি। সম্ভবত আমি তখন দেবীগঞ্জ ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি। কতো হবে তখন বয়স? খুব বেশি হলে সাত কি আট। আব্বাজানের কাছে জেনেছিলাম চার বছর চার মাস চারদিনের দিন আমাকে ‘হাতেখড়ি’ দেয়া হয়। ‘হাতেখড়ি’ দেয়ার চলটা সম্ভবত এখনও আছে। আমার আব্বাজান অনুষ্ঠানপ্রিয় খুব ফরমাল মানুষ ছিলেন। ‘মোহাম্মদী পঞ্জিকা’ দেখে তিনি দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য ছিলো তাঁর কাছে বড় বিষয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ঐতিহ্যকে ধারণ ও প্রসারিত করার চেষ্টা করেছেন। বলতেন, ‘আমরা এখানকার ধর্মান্তরিত মুসলমান নই। আমরা এসেছি ইয়েমেন থেকে। আমরা সৈয়দ নই, শেখ।’
নোয়াখালীর সুধারাম থানার সুন্দলপুর গ্রামে কয়েক শতাব্দী আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁরা একসাথে অনেকেই এসেছিলেন। আমাদের গ্রামে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে দু’জনের নাম পাওয়া যায়। একজনের নাম জমির শাহ, আরেক জনের নাম সমুদ্র শাহ। আব্বা বলেছিলেন, সমুদ্র শাহ নামটি প্রকৃত নাম নয়। সমুদ্রপথে তাঁরা এসেছিলেন বলে তাঁর নাম হয়ে যায় সমুদ্র শাহ। তাঁর আসল নামটি ধামাচাপা পড়ে যায়। রাজশাহীর শাহ মখদুম এবং ঢাকার আজিমপুরের শাহ সাহেবরা এঁদের আত্মীয়। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁরা এদেশে এসেছিলেন বলে জানা যায়। যখন তাঁরা এসেছিলেন, কোন্ শতকে এবং কোন্ সালে আব্বা ঠিকই বলেছিলেন, কিন্তু আমার এখন সে সব আর মনে নেই। আর সত্যি কথা বলতে কি! ছোটকালে আব্বার সেসব কথায় খুব একটা মনোযোগ দিতাম না। কথাগুলো আমার কাছে খুব পছন্দসইও ছিলো না। আমি ঐতিহ্য নিয়ে খুব মাথা ঘামাতাম না। মাথা ঘামাতাম আধুনিকতা নিয়ে। আমার কেনো যেনো মনে হতো অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করে লাভ নেই। আমাদেরকে আধুনিক হতে হবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। আজ অবশ্য সেভাবে বুঝি না। আজ বুঝি একশ’ বছরের পরিকল্পনা করতে হলে অন্ততঃ এক হাজার বছরের ইতিহাস জানতে হবে। পিছনে না তাকিয়ে সামনে এগুনো যায় না। অতীতকে, ইতিহাসকে এবং ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা যায় না, অবজ্ঞা করা যায় না। এই উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করায় জাতি হিসাবে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। জাতি হিসাবে আমরা আমাদের পরিচয় জানি না। আমাদের আত্মপরিচয় কি, আমরা নিজেরা তা ভালোভাবে জানি না। এই না জানার কারণে একই দেশে বসবাস করে, একই জাতির সদস্য হয়ে আমরা এখন নানারকম মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি। আমাদের চিন্তা-চেতনা, বা আমাদের স্বপ্ন কোনটাই এখন আর একরকম নয়। আমরা নানা রকম মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি। ফলে আমাদের জাতির মধ্যে একতা নেই, শৃঙ্খলা নেই। নেই শান্তি ও স্বস্তি।
সুন্দলপুর গ্রামের পাশে রয়েছে কালামুন্সি বাজার। এই কালামুন্সি বাজারের পাশেই ছিলো সমুদ্র। পাকিস্তান আমলে এখানে বেড়িবাঁধ গড়ে তোলা হয়েছিলো। এই বাঁধের উপর এখন রাস্তা। সমুদ্র এখন এখান থেকে প্রায় ৩০/৪০ মাইল দূরে চলে গেছে। এখানে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন চর, নতুন নতুন জনপদ। সমুদ্র শাহ’রা যেখানে আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন, সেই সুন্দলপুর, যেটা কালামুন্সি থেকে মাইলখানেক উত্তরে। গাছ গাছালি পূর্ণ একটা সবুজ সতেজ এলাকা। আস্তানার পাশেই এখন দুইটি বড়ো দিঘি রয়েছে। অতীতে ছিলো তিনটি। একটি দিঘি মজে গেছে। এখন সেখানে উঁচু-নিচু লাল জমি। ধান, পাট ও রবিশস্যে পূর্ণ থাকে ঐ এলাকাটি। সমুদ্র শাহ ও জমির শাহ’রা এখানে বসতি স্থাপন করেন। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের চিহ্ন এখনও এখানে বিদ্যমান। ছোট ছোট পাতলা ইটের ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইমারতের চিহ্ন এখনও রয়েছে। বেশকিছু কবর বা সমাধির চিহ্নও রয়েছে এখানে। ধর্মের প্রচার ও প্রসারে এলেও সম্ভবত এঁরা ‘পীর-মুরিদান’ কায়েম করেননি। এঁদের বসতি স্থাপনের পরেই এ এলাকায় সাধারণ মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয়। ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় জমির শাহ-এর বংশধরেরা তালুকদার খেতাবপ্রাপ্ত হয়। এই তালুকদারী কোনো জমিদার বা রাজা-মহারাজার অধীনে ছিলো না, ছিলো সরাসরি ইংরেজ শাসনের অধীনে। জমিদার শাহের পরিবার ছাড়া আর যারা এখানে বসতি স্থাপন করেন, তাদেরকে দেখানো হয় প্রজা হিসাবে। অর্থাৎ জমির শাহরাই এখানে প্রজা পত্তন করেছেন, এমনই এখানকার ইতিহাস।
আরবিতে ‘মিয়া মিয়া’ মানে শত ভাগ। অর্থাৎ জমির শাহর পরিবারকে শতভাগ ভদ্রলোক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। যাঁদেরকে সাধারণত বলা হয় অভিজাত বা বুনিয়াদী পরিবার। এঁরা নিজেরা চাষ-বাস করেন না। জমি-জিরাতের সাথে এঁদের প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক থাকে না। এঁদের নিজস্ব খাস জমি-জমাও কম থাকে। যাদেরকে তারা জমি-জমা দিয়েছে তারাই চাষবাস করবে, ফসল ফলাবে এবং তাদের কাছ থেকে সামান্য খাজনা নিয়েই তালুকদাররা জীবন নির্বাহ করবে, এই ছিলো পদ্ধতি, এই ছিলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
রাজা-মহারাজা ও নবাবদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে আরবি ‘মিয়া-মিয়া’ থেকেই বাংলাদেশে মিয়া শব্দটির উদ্ভব বলে মনে হয়। জমির শাহর পরিবারকে সেই থেকে ‘মিয়া পরিবার’ বলা হয়। কিংবদন্তি রয়েছে যে, যে দিঘিটি মজে গেছে একসময় সেই দিঘি থেকে যা চাওয়া হতো তাই পাওয়া যেতো। বিশেষ করে হাঁড়ি, পাতিল, থালা, বাটি, কলসি। বাৎসরিক ওরশ, ধর্মসভা, বিয়েশাদি ইত্যাদি প্রয়োজনে উপরোক্ত জিনিসগুলো গ্রামবাসীর প্রায় প্রয়োজন হতো। এখনকার দিনে যেমন এসব সহজে পাওয়া যায়, তখনকার দিনে সহজে পাওয়া যেতো না। এখনতো ডেকোরেটরের দোকান আছে, সেখান থেকে চিনামাটি, মেলামাইন বা কাঁচের ক্রোকারিজ ভাড়ায় পাওয়া যায়। তাছাড়া এখন তো আরও সহজ হয়ে গেছে। কাগজ বা প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম জিনিস পাওয়া যায়। তখনকার দিনে পীরসাহেবদের বাড়িতে, মসজিদে এসব জিনিস পাওয়া যেতো। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনও আমাদের অঞ্চলের পীরসাহেবদের বাড়িতে বা মসজিদে এসব জিনিস ছিলো না। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন তো যুগে যুগে কালে কালে আল্লাহতায়ালা নানানভাবে মিটিয়েছেন। কিংবদন্তির মাধ্যমে যে তথ্য উঠে এসেছে, সেভাবেও হয়তো আল্লাহতায়ালা নিরীহ ও সহজ সরল মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছেন। কিংবদন্তিতে জিনের কথাও আছে। বলা হয়ে থাকে, জমিরশাহ পরিবারের কোনো আধ্যাত্মিক পুরুষ জিনদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। বশে রাখতে পারতেন, এসব তারই কাজ! এসবের সত্য-মিথ্যা আমাদের জানা নেই। সবই শোনা কথা, লোককথা। আব্বাজানের কাছেই এসব আমার শোনা। আব্বাজান নিজেও যে এসব খুব একটা বিশ্বাস করতেন, আমার কাছে তা কখনও মনে হয়নি।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি কিংবদন্তির কথা আব্বাজানের কাছে শুনেছি। জমির শাহর পরিবারে কোনো এক গণ্য-মান্য ব্যক্তি ইংরেজ শাসনামলে অভিযুক্ত হন। বিচারকের এজলাসে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁর নামে সমনজারী করা হয়। নির্দিষ্ট দিনে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারকের এজলাসে হাজির হন। তিনি দেখতে পান, এজলাসের প্রবেশমুখে দু’টো ক্ষুরধার তরবারি টাঙানো রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দেশ দেয়া হয় তরবারির নিচ দিয়ে মাথা নিচু করে এজলাসে প্রবেশ করতে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দেশ মানতে রাজি হন না। তিনি বলেন, আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে তিনি কখনও মাথা নত করবেন না। তখন তাঁকে বলা হয়, ‘তাহলে আপনি সোজাসুজি আসুন’। অভিযুক্ত ব্যক্তি জানতেন, সোজাসুজি প্রবেশ করলে ক্ষুরধার তরবারির স্পর্শে তাঁর গলা কাটা যাবে। শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। মৃত্যু হবে অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তিনি একটুও ভ্রুক্ষেপ করেননি। এজলাসে ঢোকার জন্য মাথা উঁচু করে প্রবেশের উদ্যোগ নেন। মুহূর্তেই তাঁর গলা কেটে যায়। তিনি মৃত্যুরমুখে ঢলে পড়েন। তখন থেকে জমির শাহ পরিবারের নাম হয় ‘কাটা ভাল মানুষের পরিবার।’
আব্বাজান বলেন, আমাদের ছোটকালে লোকেরা আমাদেরকে ‘কাটা ভাল মানুষ’ বলেই সম্বোধন করতো।
নোয়াখালীর গ্রামে আমাদের বাড়ির নাম ‘মুজাহিদ মিয়া বাড়ি’। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে আমার নানার বাড়ি। বাড়ির নাম ‘গফুর মিয়াবাড়ি’। আমার নানাসহ তার পূর্ব পুরুষরাও ছিলেন তালুকদার। মুজাহিদ মিয়া আমার সরাসরি দাদা না হলেও দাদার ছোট ভাই। প্রায় তিন যুগ তিনি ছিলেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট। তিনি দীর্ঘজীবন লাভকরেছিলেন। কিন্তু আমার দাদা ও দাদি স্বল্পায়ু ছিলেন। ১৯১৫ সালে গ্রামের অনেকের সাথে মহামারীতে তারা ইন্তেকাল করেন। (চলবে)
প্রকাশকাল : জুন ২০১০



