হ্যারি কেইন বনাম ট্রফি

0
0

প্রতিটি ফুটবলারের স্বপ্ন থাকে ট্রফি জয় করে নিজের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করা। ঠিক তেমনি একজন ফুটবলারের গল্প আজ শোনাতে যাচ্ছি, যিনি এমন স্বপ্ন বুনে ছোট থেকে নিজেকে তৈরি করেছেন তিলে তিলে। কিন্তু এই ট্রফি যেন তার ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে এতোদিন। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সেই ট্রফি ছুঁয়ে দেখা যেন রূপকথার গল্পের মতোই ছিলো তাঁর কাছে। ছিলো বলছি এজন্য, অবশেষে অধরা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তাঁর।
প্রিয় বন্ধুরা, বলছি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কথা।
হ্যারি কেইন ২৮ জুলাই ১৯৯৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের ওয়ালথামস্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম হ্যারি এডওয়ার্ড কেইন।
তাঁর ফুটবল জীবন শুরু হয় আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দলে খেলার মাধ্যমে। সেখানে তিনি ২০০১-২০০২ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। এরপর তিনি ২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টটেনহ্যাম হটস্পার এর বয়সভিত্তিক দলে খেলেন। ২০০৯-১০ মৌসুমে দু’বার মূল দলের বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। একটি ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর এভারটনের বিপক্ষে লিগ কাপের খেলায় এবং অন্যটি ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বোল্টন ওয়ান্ডার্সের বিপক্ষে এফএ কাপের চতুর্থ রাউন্ডের রিপ্লেতে।
২০১০ সালের জুলাই মাসে টটেনহ্যাম হটস্পারের সাথে হ্যারি কেইন প্রথমবারের মতো পেশাদার ফুটবলার হিসেবে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরপর জানুয়ারি ২০১১ সালে হ্যারি কেইন ২০১০-১১ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত লোনে লেটন ওরিয়েন্টে চলে যান। তিনি এই মৌসুমে ১৮ ম্যাচে ৫ গোল করেন এবং মৌসুম শেষে আবারও টটেনহ্যামে ফিরে আসেন। ২০১১ সালের ২৫ আগস্ট হ্যারি কেইন টটেনহ্যামের হয়ে খেলার সুযোগ পান প্রথমবারের মতো। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে হ্যারি কেইন আবারও ২০১১-১২ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নশিপ ক্লাব মিলওয়ালে লোনে যোগদান করেন। ২০১১-১২ মৌসুমে ২৭ ম্যাচে ৯ গোল করে মিলওয়ালের বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আগস্ট ২০১২ সালে মৌসুমব্যাপী ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল নরউইচ সিটিতে লোনে যোগদান করেন। তবে এই মৌসুমে টটেনহ্যামের পারফরম্যান্স আশংকাজনক হওয়ায় জানুয়ারি ২০১৩ সালের ট্রান্সফার উইন্ডোতে হ্যারি কেইনকে আবারও ফিরিয়ে আনা হয় টটেনহ্যামে।
২০১৪-১৫ মৌসুমে টটেনহ্যামের হয়ে নিয়মিত খেলতে থাকেন তিনি। ২০১৫ সালে গোল করে লিগ কাপের ফাইনালে নিয়ে যান টটেনহ্যামকে। তাঁর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে হ্যারি কেইন ক্লাবের সাথে সাড়ে পাঁচ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২০১৫ সালের লিগ কাপের ফাইনালে চেলসির বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় হ্যারি কেইনের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারের। ২০১৫-১৬ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গোল্ডেন বুট জিতে নেন হ্যারি কেইন। আর টটেনহ্যামকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করান। তবে এই মৌসুমেও ট্রফি জয়ের স্বাদ পাননি হ্যারি কেইন। যেন স্বপ্নের ট্রফি অধরাই থেকে গেলো তাঁর।
এদিকে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অভিষেক হয় এবং অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন।
২০১৬-১৭ মৌসুমে আবারও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গোল্ডেন বুট জয় করেন হ্যারি কেইন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে রানারআপ হয়ে এবারও ট্রফি হাতছাড়া হয় টটেনহ্যামের। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে টটেনহ্যামের সাথে তিনি আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যার মাধ্যমে ২০২২ সাল পর্যন্ত ক্লাবে থাকতে সম্মত হন। ২০১৭-১৮ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে তাঁর শততম গোল করেন এবং প্রিমিয়ার লিগ যুগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। ২০১৮ সালের জুনে টটেনহ্যাম হটস্পারের সাথে তিনি আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যার মাধ্যমে তাঁর টটেনহ্যামে থাকার মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বর্ধিত হয়।

এভাবে চুক্তি বাড়তে থাকলেও তখন পর্যন্ত হ্যারি কেইন নিজেও ট্রফি জয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি, টটেনহ্যামকেও ট্রফি এনে দিতে পারেননি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ট্রফি জয়ের খুব কাছে গেলেও তা হাতছাড়া হয়ে যায় শেষাবধি। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে লিভারপুলের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় টটেনহ্যাম হটস্পার।
এদিকে ক্লাব ক্যারিয়ার ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন তিনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে ৬টি গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলেও দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি। ক্লাব ক্যারিয়ার কিংবা আন্তর্জাতিক, সবদিক থেকেই ট্রফি জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন তিনি।
২০১৯-২০ মৌসুমে ইনজুরির সাথে লড়াই করেন। ২০২০-২১ মৌসুমে তৃতীয়বারের মতো প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। কিন্তু সাধের ট্রফি জেতা আর হচ্ছিল না। ২০২০ সালে হ্যারি কেইন জাতীয় দলকে চ্যাম্পিয়ন বানানোর দুর্দম স্বপ্ন নিয়ে ইউরোর ফাইনালে নিয়ে আসেন। নিজের এবং সবার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন হয়তো এবার সত্যি হতে পারে। কিন্তু হতাশ হলেন আবারও। ট্রাইবেকারে ইতালির কাছে ৩-২ গোলে হেরে রানার আপ হলেন।
২০২১-২২ মৌসুমে টটেনহ্যাম ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি।
২০২২-২৩ মৌসুমে টটেনহ্যামের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে মৌসুম শেষ করেন তিনি। একের পর এক মৌসুম শেষ হলেও তাঁর ট্রফি জয় করার স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে গেলো।
২০২৩-২৪ মৌসুমে টটেনহ্যাম ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন। এই মৌসুমে বুন্দেশলিগায় বায়ার্নের হয়ে ৩৬ গোল করে ইউরোপীয় গোল্ডেন শু অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। প্রবাদে আছে না, ‘অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়!’ প্রবাদটা যেন সত্য হয়ে উঠলো হ্যারি কেইনের জন্য। আর ট্রফি জয় করা হলো না তাঁর। ইতিহাস সৃষ্টি করে বায়ার নেডারকুসেন বুন্দেসলিগা জয় করে। এদিকে ২০২৪ ইউরোতে আবারও ফাইনালে হেরে শিরোপা হাত ছাড়া হয়।

২০২৪-২৫ মৌসুম যেন হ্যারি কেইনের স্বপ্ন পূরণের মৌসুম। মৌসুমের শুরু থেকেই দারুণ ছন্দময় ফুটবল উপহার দিতে থাকে বায়ার্ন মিউনিখ। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই কয়েক ম্যাচ বাকি থাকতেই ২০২৪-২৫ বুন্দেসলিগা নিশ্চিত করে বায়ার্ন। সেই সাথে হাজারো দিনের অধরা স্বপ্ন সত্যি হয়ে এলো হ্যারি কেইনের জীবনে। অবশেষে নিজের ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো মেজর কোনো শিরোপা জিতলেন হ্যারি কেইন।

প্রকাশকাল: জুন ২০২৫