একটি নক্ষত্রের উত্থান

সময়টা ২০১১ সালের ২৭শে মার্চ। বিহারের তাজপুরের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বৈভব নামের এক শিশু। যখন তার ৪ বছর বয়স, তখন সে তার বাবার সাথে বাড়ির পেছনে ক্রিকেট খেলতো। কৃষক বাবা নিজের সমস্ত ব্যস্ততা শেষ করে ছেলেকে নিয়ে ক্রিকেট খেলতেন। ঐ বয়সেই ছেলে যে ক্রিকেট বলকে খুব জোরে পিটায়, সেটা উপলব্ধি করেন বৈভবের বাবা। বয়সের তুলনায় প্লাস্টিক বল জোরে পেটানো দেখেই বাবার মাথায় ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর চিন্তাটা আসে। নিজের জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে একাডেমিতে ভর্তির জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করেন।
মাত্র ৯ বছর বয়সেই পাটনার একটি ক্রিকেট একাডেমিতে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা সঞ্জীব। পাটনার সেই একাডেমির দূরত্ব ছিলো ১০০ কিলোমিটার! ভোর ৪টায় মা খাবার বানিয়ে দিতেন। খেয়ে রওনা হতো পাটনার উদ্দেশ্যে। তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে একাডেমিতে পৌঁছাতে হতো। সেজন্য প্রতিদিন অনুশীলনে যাওয়ার সুযোগ হতো না বৈভবের। একদিন পর পর গিয়ে অনুশীলন করতে হতো। বাবা জমিজমা বিক্রি করে তাকে এখানে পাঠিয়েছেন, সে বাবার জন্য হলেও বৈভব অন্তত ৫০০ বল না খেলে প্র্যাকটিস শেষ করতো না। অথচ অন্যরা সর্বোচ্চ ২০০ বল খেলেই প্র্যাকটিস শেষ করে ফেলতো।
পাটনার একাডেমির কোচ সৌরব কুমার বৈভবের ব্যাটিং প্রথমবার দেখেই অভিভূত হয়ে যান। বৈভবের সমবয়সী বোলাররা তার কাছে পাত্তাই পেতো না। এজন্য তাকে তারচেয়ে বয়সে বড়দের সাথে খেলানো হতো।

আড়াই বছর অনুশীলনের পর অনূর্ধ্ব-১৬ এর জন্য ট্রায়াল দেয় বৈভব। পারফর্ম ভালো করলেও বয়স কম হওয়ায় স্ট্যান্ডবাই থেকেই সেবারের মতো সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। তবে সেখানে তার মধ্যে বিশেষ কিছু দেখেছিলেন কোচ মনিষ ওঝা। পরবর্তীতে তার অধীনেই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করতে থাকে বৈভব। মাত্র ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে ভারতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের টুর্নামেন্ট রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক ঘটে বৈভবের।

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারাকে আদর্শ মেনে বৈভবের ক্রিকেটে পথচলা। একের পর এক রেকর্ড করে যাচ্ছিলো এই বয়সেই। ইন্ডিয়ান কিছু গণমাধ্যম দাবি করে, ‘এক বছরে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট মিলিয়ে মোট ৪৯টি সেঞ্চুরি করেছে বৈভব।’ বিহারের রন্ধির ভার্মা ট্রফিতে একটি ট্রিপল সেঞ্চুরিও হাঁকিয়েছে সে।
চেন্নাইয়ের স্টেডিয়ামে চলছে ভারত-অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের টেস্ট ম্যাচ। সেখানে ১৩ বছর বয়সী একজন ছেলে খেলছে। বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে সে ম্যাচে ৫৮ বলে সেঞ্চুরি করে সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেয় ‘বৈভব সূর্যবংশী’।
এরপরে বৈভবকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে ভারতের ডমেস্টিক লিগ ‘আইপিএল’-এর নিলাম। আইপিএল-এর নিলামে ভারতের এতো এতো প্লেয়ারের মধ্যে ১৩ বছরের একটি ছেলে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে দল পেয়ে যে রেকর্ড করে ফেলবে, তা শুধু ভারত নয়, বরং পুরো পৃথিবীর কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিলো। নিলামে ৩০ লাখ রুপি ভিত্তিমূল্যের বৈভবকে নিয়ে ভালোই কাড়াকাড়ি লেগে যায় দিল্লি ক্যাপিটালস এবং রাজস্থান রয়্যালসের মধ্যে। শেষমেষ বৈভবকে ১ কোটি ১০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ায় রাজস্থান রয়্যালস।

একটি নক্ষত্রের আলো ছড়ানোর তো কেবল শুরু। নক্ষত্রটি তার আলোকরশ্মি কতদূর ছড়াতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।

নাম : বৈভব সূর্যবংশী
জন্ম : মার্চ ২৭, ২০১১
জন্মস্থান : তাজপুর, সমস্তিপুর, বিহার।
ব্যাটিংয়ের ধরন : বাঁহাতি ওপেনিং ব্যাটার।
বোলিংয়ের ধরন : বাঁহাতি অর্থোডক্স।
প্রথম শ্রেণি অভিষেক : ৫ই জানুয়ারি, ২০২৪।

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫