শিশু-কিশোরদের ডিভাইসে আসক্তি

স্বাস্থ্য পাতা

0
4

বন্ধুরা, তোমরা হয়তো লক্ষ করে থাকবে যে, কান্না থামাতে, খাওয়াতে বা ব্যস্ত রাখতে মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশুর হাতে তুলেদেন ডিজিটাল ডিভাইস। যেমন- মুঠোফোন, ট্যাব, টিভি ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে; যেমন মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, ভাষা ও শেখার বিকাশে দেরি হয়, সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা কমে যায় এবং উদ্বেগ ও রাগের প্রবণতা বাড়ে। আসক্তির শুরু কোথায়? শিশুদের চুপ বা শান্ত করতে ও খাওয়াতে কম বয়সে মুঠোফোন দেওয়া। মা-বাবার নিজের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস। খেলাধুলা, গল্প বা পারিবারিক সময়ের অভাব। স্পষ্ট নিয়ম ও সীমারেখার অনুপস্থিতি। তাই এক্ষেত্রে সাবধান ও সতর্ক হতে হবে পিতামাতা ও অভিভাবকদেরকে। তারা হয়তো লক্ষ করে থাকবেন যে, ডিভাইস না পেলে শিশু তীব্র রাগ, কান্না বা আক্রমণাত্মক আচরণ করছে। পড়াশোনা ও খেলাধুলায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে। রাতে দেরি করে ঘুমানো বা ঘুম ভেঙে যাওয়া। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কমে যাওয়া। শিশু একা থাকতে বেশি পছন্দ করা। স্কুলে বা পড়াশোনায় মনোযোগে সমস্যা। এক্ষেত্রে পিতামাতা ও অভিভাবকদের করণীয় হলো, শিশুর ডিজিটাল আসক্তি দূর করা মানে জোর করে সরানো বা শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তাকে বিকল্প বিনোদন শেখানো। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা। ২ থেকে ৫ বছর হলে দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। স্কুল বয়সে পড়াশোনার বাইরে সীমিত সময় ডিভাইস ব্যবহার করতে দেওয়া। শিশুকে ফোন ছাড়তে বলার আগে নিজের স্ক্রিন ব্যবহার কমানো। শিশুর বিকল্প অভ্যাস তৈরি করা। গল্প, আঁকাআঁকি, খেলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ব্যবস্থা রাখা। হঠাৎ নিষেধ নয়, ধাপে ধাপে সীমা টেনে দেওয়া। আচমকা ওঠার পরিবেশের অংশ। শিশুর সামনে আমরা কী দৃষ্টান্ত রাখছি, সেটি তার শেখার একটি বড় মাধ্যম। শিশুদের জন্য খেলার জায়গা, সঙ্গী ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, দলগত কাজ- এসবই শিশুকে নিজের আবেগ বুঝতে, অন্যকে সম্মান করতে এবং সম্পর্ক গড়তে শেখায়। সব ক্ষেত্রে অভিভাবকীয় সচেতনতা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শিশুর ডিজিটাল আসক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, আচরণগত পরিবর্তন বা সমস্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বন্ধুরা, আমরা সবাই জানি, অতিরিক্ত স্ক্রিন দেখা তোমাদের বয়সী শিশুদের বিকাশ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এই যুগে ডিভাইস ছাড়া কি একটা শিশুকে বড় করা যায়? তাই কীভাবে, কতটা স্ক্রিন দেখলে শিশুকে আসক্তি থেকে দূরেরাখা যাবে, সেই বিষয়ে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিফাত ই সাইদ বলেন, শিশুকে স্ক্রিন দিবেন কিন্তু ইন্টারনেট অফ রাখবেন। কেননা ইন্টারনেট অন থাকলে শিশু ক্রমাগত স্ক্রল করে এক ভিডিও থেকে অন্য ভিডিওতে চলে যায়, এবং প্রায়ই এমন কিছু কনটেন্ট দেখে ফেলে যা একেবারেই তার বয়স উপযোগী নয়। ক্রমাগত স্ক্রল করার কারণে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতাও তার কমতে থাকে। তাই শিশু একেবারে ফোন কেড়ে নেওয়া শিশুর মধ্যে আরও প্রতিরোধ তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও একটা ভূমিকা থাকে। ক্লাসে শিশু-কিশোরদের মনোযোগে পরিবর্তন হচ্ছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। স্ক্রিন-বিহীন সৃজনশীল কাজে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হবে। অভিভাবকরা নিজেদের ব্যস্ততার কারণে শিশুকে ব্যস্ত রাখতে বা শান্ত রাখতে হাতে তুলে দিচ্ছেন ডিভাইস। এতে মুহূর্তের স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুর আবেগ, কল্পনাশক্তি ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। চারপাশের প্রত্যেক মানুষ একটি শিশুর বেড়ে ছোট থাকতেই এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুকে তার নিজস্ব ডিভাইস দেবেন না। কোথাও বেড়াতে গেলে সর্বক্ষণ তাকে ডিভাইস দিয়ে রাখবেন না। তাকে প্রকৃতির সাথে মিশতে দিন, অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে দিন। ডিভাইস হাতে থাকলে সে আর কোনোদিকেই মনোযোগ দেবে না। ডা. সিফাত ই সাইদ শিশুর বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদের নিজেদের ডিভাইস আসক্তি কমাতে হবে। একটি শিশু যদি তার বাবা-মাকে দিনের বেশিরভাগ সময় ডিভাইস ব্যবহার করতে দেখে, তাহলে সে নিজেও তাই করবে। আপনি শিশুকে যা শেখাতে চান, আপনি নিজে আগে তা করুন।

প্রকাশকাল- এপ্রিল ২০২৬