রবির মাথায় লাল সবুজ

0
2

প্রতিদিনের মতো আজও বেশ বেলা করে ঘুমাচ্ছিলো রবি। অনেক রাত পর্যন্ত কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা জিনিসপত্র কুড়াতে হয়। তাই বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমাতে হয়। ভাঙারি মামার দোকান খুলতে খুলতে অনেক দেরি। দোকান খুললে ঝোলা ভরা জিনিসপত্র বিক্রি করে কয়টা টাকা পাবে। তা দিয়ে যদি কিছু কিনে খাওয়া যায়। তাই ঝোলাটাকে মাথার নিচে রেখে, ফুটপাথে শুয়ে দেয় এক ঘুম। এটা রবির নিত্যদিনের রুটিন।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে রাস্তায় যানবাহনের আওয়াজ বেড়ে যায়। প্যা.. পো.. নানা রকম আওয়াজ। যানবাহনের এত এত আওয়াজেও রবির কিছু যায় আসে না। অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আজকে ঘুমের অর্ধেক পূরণ হতে না হতেই অন্যরকম বিকট আওয়াজে রবির ঘুম ভেঙে যায়। পু..প পু..প পুলিশের বাঁশির শব্দ। আর ধাম ধাম আওয়াজ। রবি ঘুম থেকে লাফ দিয়ে ওঠে। চোখ মেলেই দেখে চারিদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। ঝাঁঝালো গন্ধ। চোখ মুখ জ্বলে যাচ্ছে। বেশ কিছু মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন ফেলে যে যেভাবে পারছে দৌড়াচ্ছে। পড়ে থাকা ব্যানার, ফেস্টুনে লেখা ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগান। রবি মোটামুটি পড়তে পারে। তাই ব্যানার, ফেস্টুনের লেখাগুলো পড়তে পেরেছে। মিরপুরের ওখানে থাকার সময় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওকে পড়া শিখিয়েছে। রবির মতো পথশিশুদের লেখাপড়া শেখায় সংস্থাটি।

মিছিলে অংশ নেয়া সবাই কমবয়স্ক। কিছু আছে স্কুল কলেজের পোশাক পরা। ছাত্রদের কোনো মিছিল ছিলো মনে হয়। এত সকাল সকাল আবার কীসের মিছিল? পুলিশই বা এমন করছে কেন? রবির মাথায় এসবের কিছুই ঢুকছে না। ফেলনা জিনিসপত্র, কাঁধের ঝুলি, ভাঙারি মামার সাথে নিরর্থক দরকষাকষি আর অনেক বেলা পর্যন্ত বিভোর ঘুম- এর বাইরে কিছুই বোঝে না রবি। রবির জীবনে এছাড়া আরেকটা জিনিস আছে। বিলু। বলতে গেলে বর্তমানে বিলুই ওর একমাত্র বন্ধু। সারাদিন রবির জন্য অপেক্ষা। রবি ক্লান্ত হয়ে যখন ফেরে বিলু দৌড়ে কাছে আসে। কু..উ কু..উ আওয়াজ করে আর লেজ নাড়তে থাকে। ফুটপাথে অনেক কুকুর থাকলেও বিলু একটু আলাদা। সহজেই মানুষের সাথে মিশে যায়। একদিন পাউরুটি খাওয়ার সময় রবি বিলুকে এক টুকরা দিয়েছিলো। সেই থেকে রবির সাথে সখ্যতা। চোখটা বিড়ালের মতো হওয়ায় রবি আদর করে ওর নাম দিয়েছে বিলু। বিলু বলে ডাকলেই দৌড়ে কাছে আসে আর লেজ নাড়ে।
রবি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় বললো, দুনিয়ায় তুইও একলা, মুইও একলা। তোরও ঘর বাড়ি নাই, মোরও নাই। আয় আজগো থাইক্যা মোরা দুগ্গা বন্ধু হয়া গেলাম। বলেই আরও এক টুকরা রুটি খেতে দেয় বিলুকে।
বিলু দূরে কোথাও যায় না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশেপাশেই থাকে। রবির জন্য অপেক্ষা করে। রবি এখানেই ফুটপাতের পাশে থাকে। এখানেই ঘুমায়। প্রতিদিনের মতো আজও ঘুমাচ্ছিলো। গণ্ডগোলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে এমন অবস্থায় পড়েছে। মনে হয় সবার মতো ওরও দৌড়াতে হবে। পুলিশের ছোঁড়া টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় মরিচের মতো চোখ জ্বলছে। কোনোমতেই সহ্য করা যাচ্ছে না। শত শত পুলিশ তাড়া করছে। ছাত্ররা সবাই দৌড়াচ্ছে। ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে রবিও দ্রুত দৌড় দিলো। রবিকে দৌড়াতে দেখে ওর সাথে সাথে বিলুও দৌড়াতে লাগলো। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসে ছাত্ররা যেদিকে ছুটে গেছে রবিরাও সেদিকেই দৌড়ে যেতে লাগলো। দৌড়াতে দৌড়াতে টিএসসি মোড় পার হয়ে শহীদ মিনারের দিকে গেল। শহীদ মিনারের ওখানে গিয়ে রবি ফুটপাতের একপাশে দাঁড়ালো। বেশ হাঁপাচ্ছে। বিলুও জিহ্বা বের করে হাঁপাতে লাগলো। খুব পিপাসা লেগেছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। কাছেই একটা বড় নিমগাছ দেখা যাচ্ছে। গাছের নিচে ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যাবে। রবি এক পা দু’পা করে হেঁটে গাছের নিচে গেল। সাথে বিলুও। কাঁধের ঝোলাটাকে নিচে রেখে বসে পড়লো। হ্যাঁ তাইতো, গাছের নিচে তো বেশ ঠান্ডা লাগছে।
রাস্তাঘাট ফাঁকা। তেমন যানবাহন নেই। মাঝে মাঝে দু একটা এ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলছে জরুরি রোগী নিয়ে। অনেকক্ষণ পর পর একটা দু’টা সিএনজি অটোরিকশা দেখা যায়।
রবির মনে প্রশ্ন জাগে। রাস্তাঘাট এমন ফাঁকা কেনো?
ও হ্যাঁ মনে পড়ে গেছে! সেদিন চা বিক্রেতা কলিম চাচা বলেছিলেন, ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। কোটা না কী যেন একটা বাতিল করার দাবি ছাত্রদের। তাদের আন্দোলন দমন করতে কারফিউ দেয়া হয়েছে।
কারফিউ কী? জিজ্ঞেস করলে কলিম চাচা বলেছিলেন, কারফিউ মানে বাইরে বের হওয়া নিষেধ। কোনো মিছিল মিটিং করা যাবে না। অতি প্রয়োজন ছাড়া যানবাহন চলাচল করতে পারবে না।
গাছের ছায়ায় শীতল বাতাসে রবির ঝিমুনি চলে আসলো। বিলুও সামনের দু’পায়ে মুখ গুঁজে ঝিমুচ্ছে।
হঠাৎ চোখ মেলে দেখে শহীদ মিনারের মোড়ে ছাত্রদের একটা মিছিল। বেশ বড় মিছিল। টিএসসির দিকেই যাচ্ছে। আবারও গণ্ডগোল লেগে যাবে না তো? আচ্ছা কেউ কিছুর দাবিতে মিছিল মিটিং করলে পুলিশের এত সমস্যা কেন? পুলিশ এমন করছে, মনে হয় যেন যুদ্ধে নেমেছে। ইসরাইলী সৈন্যদের ফিলিস্তিন আক্রমণের মতো।
রবি সেদিন চানখাঁরপুলে একটা টিভি ঠিক করার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিভি দেখছিলো। খবরে দেখাচ্ছিলো, কীভাবে খুব ভয়ংকরভাবে ইসরাইলের সৈন্যরা ফিলিস্তিনের মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। খবর দেখতে দেখতে রবি মনে মনে ভেবেছিলো, একবার যদি ফিলিস্তিনে যেতে পারতাম! মোস্তফা গেমের জম্বির মতো শয়তান ইসরাইলী সৈন্যদের সব কয়টাকে উড়িয়ে দিতাম।
রবি পয়সা জমিয়ে প্রায়ই চলে যেতো আজিমপুরের ভিডিও গেমের দোকানে মোস্তফা খেলতে। ওর মতো পথশিশুরাই এখন বেশি যায় ওখানে। ও খুব ভালো গেম খেলে। বিভিন্ন এনিমিকে নিমেষেই নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে।
সেদিন ওর খেলা দেখে রন্টু বলেছিলো, তুই তো গেমের মাস্টার হয়া গেছোস রে রবি!
ফিলিস্তিনের কথা, মোস্তফা গেমের এনিমির সাথে ফাইট করার কথা ভাবতে ভাবতে রবি দেখলো, ছাত্রদের মিছিলটি কিছু দূর যেতেই পুলিশ বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে। ছোট্ট রবির কাছে পুলিশের এ আচরণ ভালো লাগেনি। রবি মনে মনে পুলিশদের গেমের এনিমি ও ইসরায়েলী সৈন্য কল্পনা করতে লাগলো। ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে ছাত্রদের মিছিলের দিকে রওনা দিলো। রবি মিছিলের সাথে মিশে যায়। মিছিলে একের পর এক স্লোগান চলছে। ছাত্ররা স্লোগান দেয়, ‘আপোস না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার।’ রবিও সবার সাথে স্লোগান দিতে লাগলো। মিছিলের পাশে পাশে হেঁটে বিলু ঘেউ ঘেউ আওয়াজ করতে লাগলো। যেন সেও তালে তালে স্লোগান দিচ্ছে। পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ শুরু করে। কিছুতেই মিছিল থামাতে পারছে না।
সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বেশ মারমুখী হয়ে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ইত্যাদি ছুঁড়তে লাগলো। সবাই দিগি¦দিক দৌড়াতে লাগলো। রবিও দৌড়াতে শুরু করলো। একটু সামনে যেতেই পিছনে তাকিয়ে দেখে একজন ছাত্র পড়ে গেছে। মাথায় বেশ ব্যথা পেয়েছে। রবি দাঁড়িয়ে গেল।
মামা ওডেন। দৌড় দেন। পুলিশ আসতেছে।
ব্যথা পাওয়া ছাত্রটিকে একথা বলতে বলতে হঠাৎ রবির মাথায় কী যেন একটা এসে পড়লো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথাটা টন টন করে উঠলো। রবির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। বিলু দৌড়ে এসে রবির চারপাশে ঘেউ ঘেউ করতে করতে অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করে। রবির মাথায় বাঁধা সবুজ গামছাটার এক পাশ ভিজে টকটকে লাল হয়ে গেল। যেন লাল সবুজের পতাকা। কালো পিচঢালা রাস্তার ওপর ছোট্ট দেহটা নিথর পড়ে আছে। বিলু বারবার রবির মাথার কাছে এসে জোরে জোরে শুকছে আর চিৎকার করে ডাকছে। কিন্তু রবির কোনো সাড়া শব্দ নেই।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬