মুক্তিযোদ্ধার বাবা

0
1

সোনাতলা হাই স্কুলের নাকের ওপর ধানখালি নদী। পাশঘেঁষে ধানক্ষেত, ছড়ানো-ছিটানো কিছু বাড়ি, গাছগাছালি, আলকুশি, আকন্দ আর লতাগুল্মের ছোটো ছোটো ঝোঁপ। যেখানে মাছরাঙা, ডাহুক, শালিক, সুইচোর, ফুলটুসি, টিয়ার সঙ্গে বেশুমার আনন্দে মাতে দোয়েল-ফিঙের মতো একদল নাচুনে পাখি।
সকাল থেকেই স্কুলের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের গান বাজছে। চারদিকে সাজ সাজ রব। মাঠজুড়ে টানানো সামিয়ানা। গদিআঁটা চেয়ার দিয়ে সাজানো মঞ্চ। বড় টেবিলের ওপর জোড়া ফুলদানিতে রক্তগোলাপের বিশাল তোড়া। ওদিকে ঢোকার মুখে কলাগাছ, কাগজের পতাকা, শিকলি, ফুল, জরি, ঝালর, দেবদারু পাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে বাহারি তোরণ। দুদিন ধরে মাইকের চিৎকারে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।
বুড়ো আয়নালের হাঁপানিটা বেড়েছে বহুগুণ। সারারাত ঘুমোতে পারে না কাশির দাপটে। আকন্দ পাতায় তেল মেখে গরম গরম মালিশ করে বুকে। কিন্তু তাতে মরণ-কাশির নড়চড় হয় না। সকালে টলতে টলতে উবু হয়ে রোদের সেঁক নিতে বসেছে উঠোনের তেরছা কোণের ঢিবিটায়। এখান থেকে স্কুল, গাছপালা, মাঠ, ধানক্ষেত, নদী, রাস্তা স্পষ্ট নজরে আসে।
যুদ্ধের সময় সামনের পুরোটাই ছিল খোলা সুনসান। দাওয়ায় বসলে নদীর দমকা বাতাস সরাসরি এসে গায়ে আছড়ে পড়তো। লঞ্চের মোটা হর্ন শোনা যেত দুইবেলা। বাগেরহাট থেকে খানকয়েক লঞ্চ পালা করে চলত মোড়েলগঞ্জ, রায়েন্দা, তুষখালি, শরণখোলা রুটে। কেবল ডাক-লঞ্চখানা যেত বরিশাল অবধি। রাতের ট্রিপে দুটো দোতলা লঞ্চ হেলেদুলে ছেড়ে যেত ঢাকার উদ্দেশ্যে।
যুদ্ধের গরম খবর শুরু হতে না হতেই জয়নাল কিছু না বলে কোথায় যেন চলে গেল! একটাই জওয়ান পুত্তুর আয়নালের। তার শোকে বুড়ো-বুড়ির পাগল হবার দশা। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে!
নির্বাক বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই কোনো।
ওই রাস্তা ধরে হঠাৎ যদি ছেলেটা এসে বাজান বলে ডাক দেয়- এই প্রতীক্ষায় মরণ মাথায় নিয়ে প্রহর গোনে দিনের পর দিন।
পথে যাকে দেখে শুধায় গভীর উৎকণ্ঠায়- ‘ও ভাইদা, তোমরা দেকেচ নাকি মোর জয়নুলরে? পুলাডা ওই যে গেইল আর দেকা পালাম না! ডাকরা বাজারে বহু নোক পাখির নাহান মাইরচে রজব ফকির। বাছারগো ভিডামাডিও জ্বলতেচে হুনলাম। হালদারগো মরদবেটি দেশদশ ফালাইয়া হগলে এন্ডিয়া গেইল- এইডা কেমুন কতা! তা বাপু যাবি যাও। কিন্তুক আমার বাপজান জয়নুল কই গেইলরে? কোতায় খপর নাগালে পুলাডার পাত্তা পাবানে? কেমন একখান বেপদের কতা কও দিকি!’
স্কুলের ছেলেমেয়েরা ছোট ছোট কাগজের পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল বের করেছে রাস্তায়।
এ সময় বুড়ো আয়নাল একটু আনমনা হলো।
জয়নাল যুদ্ধে যাবার কদিন পর দুপুরবেলা হঠাৎ একখানা গানবোট এসে থামল ধানখালি নদীতে।
এসেই কী মর্জি হলো, ফটাফট রকেটের কয়েকটা গোলা মেরে চোখ কটমটিয়ে চলে গেল বাদাবনের দিকে।
একটা আগুনের গোলা আয়নালের মাথার ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে এসে ফেটে পড়ল খালের ওপার সোনাকান্দা মৌজায়। কেয়ামতি- গোলার দাপটে বিশাল গর্ত হয়ে গেল ধানক্ষেতের মাঝখানে। গানবোট চলে যাবার পর আয়নাল কোদাল দিয়ে গর্তের পোড়ামাটি সরিয়ে বের করল রকেট লঞ্চারের কামরাঙ্গার মতো দেখতে স্টিলের খাঁজকাটা লম্বাটে গুলির খোসাটা। কেমন পোড়া পোড়া বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে গর্তটার চারদিকে। মাটির রঙ হয়ে গেছে পিত বর্ণ।
দেখতে দেখতে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। যারা খাল-বিল-জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল ভয়ে, তারাও গুটিগুটি পায়ে এসে জড়ো হলো মজা দেখতে। আয়নাল জিনিসটা নেড়েচেড়ে দেখাতে দেখাতে একটা আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করালো মুখচোখে নানা রকম ভীতিকর ভঙ্গিমা ফুটিয়ে।
গোলাটা মাইলটাক দূর থেকে বজ্রের ঝিলিকের মতো উড়ে এসে কেমন আগুনের কেয়ামত বানিয়ে দিল- তার গুরুগম্ভীর ব্যাখ্যার ভয়াবহতায় সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
বস্তুটি দেখার লোভ সামলে পুনরায় কোনো বিপদ আসার আশঙ্কায় তারা দ্রুত কেটে পড়ে জায়গাটা থেকে। এ নিয়ে আয়নালকে ঘিরে কিছুদিন গল্পটা চাউর থাকলেও একসময় তা ডালভাত হয়ে যায়।
আয়নাল বস্তুটি ধুয়েমুছে জয়নালের লাল জামায় পেঁচিয়ে রাখে সযত্নে। ইঁদুরের কাটাকুটির উৎপাত থেকে জামাটা বাঁচাতে ছোট্ট একটা মটকিতে সযত্নে রেখে দেয় জয়নালের জন্য।
যুদ্ধশেষে গাঁয়ের সবাই ঘরে ফেরে। আমজাদ, শাহাবুদ্দী, তোরাব, কেরামত, হাচান, কুদ্দুছ, মৌজালি- কেউ বাদ থাকে না। শুধু ফেরে না জয়নাল! কোথায় হারিয়ে গেল তার জোয়ান মর্দ সোনার নাহান পুত্তুরডা?
বুড়ি আগেই গেছে। বুড়ো আয়নাল থেকেও নাই। দাওয়ায় কোলকুঁজো হয়ে বসে সে দিনমান হেঁচেকেশে ঝুলে আছে মরণ সুতোয়।
আজ কেন যেন এতদিন পর মনে হলো পরানে তার রক্তের বান ডেকেছে। গানের সুরে সুরে দুলে উঠছে নতুন স্পন্দন। আড়মোড়া ভেঙে বাঁকা মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল যেন এক মানবকংকাল। হেলানো মাচার নিচে ছাতামাখা মাটির মটকি থেকে সে হাতিয়ে বের করল জয়নালের জামার পুঁটলিটা। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে টুকটুক করে রাস্তায় নেমে মিশে গেল মিছিলের ভেতর।

মাইকে যুদ্ধদিনের গান বাজছে। বিজয়ের আনন্দ উপচে উঠছে সবার মুখে। তারা তালে তালে পা মিলিয়ে বড় রাস্তার বাঁক ঘুরে জড়ো হলো নদীটার কাছে। বুড়ো আয়নালকে তখন দেখার মতো। গলার শিরা ফুলে উঠেছে । রক্তচক্ষু থেকে ঝরে পড়ছে আগুনের হল্কা। হাতের মাংসপেশি দড়ির মতো পাকিয়ে এক অকুতোভয় বলশালী মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত করেছে ন্যুব্জ আয়নালকে।
সে হাতের লাঠিখানার আগায় জয়নালের লাল জামাটা বেঁধে উড়িয়ে দিল পতাকার মতো।
তারপর দীপ্ত ভঙ্গিতে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মার্চ করে এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল নদীটার কাছে। যেন সেনাপতির আদেশের অপেক্ষায় সিপাহিরা সারিবদ্ধ হয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শৃঙ্খলার সঙ্গে।
আয়নাল শক্ত চোয়ালে কয়েক পা সামনে এগিয়ে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। তারপর শরীরের তাবৎ শক্তি দিয়ে একাত্তরের কল্পিত গানবোট লক্ষ করে ভীষণ ক্রোধে নদীতে ছুঁড়ে মারল রকেট লঞ্চারের সেই ভয়ংকর গুলির খোসাটা।

আয়নালের নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সে আর ঘরে ফিরবে না।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫