দুই বন্ধু তারা। বেড়াল ও মোরগ। একসঙ্গে থাকে। খুব মিল দু’জনের। বেড়াল বেশ ভালো বেহালা বাজায়। শিল্পী হিসেবে দারুণ। মোরগ গান করে। দু’জনে জমজমাট আসর বসায়। কখনো বেড়াল একা, আবার কখনো দু’জনে একসঙ্গে শিকারে বেরোয়। বাড়িতে মোরগ একা যখন থাকে, সব দেখাশোনা করে। বেরুনোর সময় বেড়াল মোরগকে সবসময় সাবধান করে। বলে,
‘বন্ধু, কখখনো বাইরে যেয়ো না। বাইরের কাউকে ঘরে ঢুকতে দিয়ো না। সে যে-ই হোক। আমি না ফেরা পর্যন্ত এটা করবে। সাবধান। বলছি, খুব সাবধান। দিনকাল খারাপ। মহা বিপদে পড়ে যাবে, যদি আমার কথা তুমি না শোনো।’
মোরগ সুবোধ প্রাণীটি হয়ে মাথা দোলায়। বলে, ‘ঠিক আছে বন্ধু। যথার্থ বলেছ। তোমার কথাই সই। মেনে চলবো ঠিকঠাক। সাবধান থাকবো সবসময়।’
দিন যায়। সময় গড়ায়। সব ঠিকঠাকই চলছিল। হঠাৎই কীভাবে যেন গোলমাল হয়ে গেল। সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড!
হয়েছে কী, একটা ধূর্ত শেয়াল বহুদিন ধরে বেড়াল ও মোরগকে দেখে আসছে। তক্কে তক্কে আছে সে। মওকা পেলেই মোরগকে ফুঁসলাবে। বড়োসড়ো লোভ দেখাবে। তারপর কব্জা করবে। তারপর? তাড়িয়ে তাড়িয়ে মাংস খাবে তার।
ধূর্ত শেয়ালের তর সইছিল না। একদিন করে কী, পা টিপে টিপে এসে হাজির হয় ওদের আস্তানায়। বেড়াল গেছে শিকারে। দিনভর শিকার করবে। দু’জনের খানাদানা জোগাড়যন্তর করে আনবে। মোরগ বাড়িতে একলা। চুপটি করে শেয়াল এসে তাদের ঘরের জানালায় টোকা দেয়। ফিসফিস করে বলে, ‘মোরগ ভায়া, আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছো? কী সুন্দর যে লাগছে তোমাকে। সারা দুনিয়ায় আর কেউ তোমার মতো সুন্দর নয়। এসো, বাইরে চলে এসো। তোমার জন্যে বেশ কিছু গমের দানা নিয়ে এসেছি। কুয়ো থেকে সুস্বাদু পানিও এনেছি পাত্র ভরে। বাইরে বেরিয়ে এসো, ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে ওগুলো খাও। তুমি খেলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে। মনটা ভরে যাবে আনন্দে। এসো, বন্ধু। তোমার জন্যে আমি অপেক্ষা করছি।’
মোরগ মিষ্টি কথায় টলে না। শেয়ালকে বলে, ‘উঁহু। সেটি হচ্ছে না। বেড়ালকে আমি কথা দিয়েছি। বাড়ির বাইরে আমি যাব না। যেতে পারব না।’
শেয়াল বেজার হয়ে যায়। তার কথায় মোরগকে পটানো গেল না সেজন্যে। অন্য কৌশল নিতে হবে। কী করা যায়? অনেক ভেবেচিন্তে সে কৌশলটা বের করলো।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। শেয়াল এক রাতে বেশ কিছু গম জানালার পাশে ছিটিয়ে রাখল। ভোরবেলা বাড়ির আঙিনায় ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকলো।
সক্কালবেলা বেড়াল শিকারে বেরিয়ে গেল। অন্যদিনের মতোই। কিছুক্ষণ পরে মোরগ জানালা খুলে বাইরে তাকায়। অবাক কাণ্ড তো! কোত্থেকে যেন এতো গম এখানে এসে পড়েছে। পুষ্টু পুষ্টু দানা। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে সেসব। আহ। মোরগের জিভ চুলবুল করে ওঠে। কী সুস্বাদুই না হবে ওগুলো খেতে। মোরগ ভাবে,
যাই না একটু বাইরে। কে আর দেখতে আসছে! আশেপাশে কেউ তো নেই। এই যাব আর আসব। ওইসব খেয়ে আবার ঘরে ঢুকে গেলেই ব্যস। কোনো ঝুটঝামেলা নেই। কয়েক মিনিটের মামলা। কেউ যদি এখানটায় থাকতো তাহলে অন্য কথা ছিল। এখন কেউ আমাকে দেখবে না। বেড়াল বন্ধুর কাছে এ নিয়ে নালিশও করবে না।
যেই ভাবা সেই কাজ। ঘরের দরজা খুলে বেরুনো মাত্রই তার টুঁটি টিপে ধরলো শেয়াল। আচ্ছামতো পাকড়াও করে ফেললো। ব্যাপারটা ঘটে গেল ভোজবাজির মতো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘটলো বিচ্ছিরি এই কাণ্ড। এখন উপায়? শেয়ালের পেটে না গিয়ে কোনো উপায় তো নেই। ইশ! কী ভুলটাই না করলো সে। বেড়ালের কথা না মেনে চলার ফল এটি। এখন চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে।
মোরগের ঘাড় ধরে শেয়াল তাকে নিয়ে যাচ্ছে নিজের আস্তানায়। মোরগ তো গাইয়ে প্রাণী। সে গান গেয়ে গেয়ে বন্ধু বেড়ালকে ডাকছে। গান শুনে যদি বেড়াল তাকে উদ্ধার করতে আসে। সেই ভরসায় এই গান গাওয়া তার। গানটি হলো-
হায় হায় হায় রে।
জানটা বুঝি যায় রে।
কাণ্ড এমন সর্বনেশে
বেড়াল ভায়া জলদি এসে
বাঁচাও বাঁচাও ভাই রে,
হয়তো আশা নাই রে।
গমের লোভে জানটা যায়
এখন বাঁচার কী উপায়?
বেড়াল ছিল এখান থেকে দূরে। সেখান থেকে শুনতে পাওয়ার কোনো কথাই না। মোরগ প্রাণের ভয়ে কাঁদছে। সে কী কান্না। অঝোর ধারায় কান্না। কিন্তু কোনো লাভ নেই। উমদা শিকার বাগে পেয়ে শেয়াল খুশিতে আত্মহারা। মোরগ নিয়ে সে পৌঁছে গেল নিজের গুহায়। উহ, কী আনন্দ! নাচতে ইচ্ছে করছে তার।
০২.
বেড়াল বাড়ি ফিরে হতবাক। যে আশঙ্কা সে করেছিল, তাই ঘটেছে। মোরগকে না পেয়ে তার চোখও ছলছল করে। এটা নিশ্চয়ই লোভী ও ধূর্ত শেয়ালের কাণ্ড! ওর কবল থেকে মোরগকে উদ্ধার করাই প্রথম ও একমাত্র কাজ। সে দৌড়ালো। শেয়ালকে ধরার জন্য। ধরতে পারলো না। মনটা আরো খারাপ হলো তাতে।
পরদিন সকালবেলা। বেহালাটা সঙ্গে নিয়ে বেড়াল ছোটে শেয়ালের বাড়ির দিকে। যেভাবেই হোক, মোরগকে বাঁচাতে হবে। শেয়ালটা পাক্কা শয়তান। ওর কবলে কেউ পড়লে তার নিস্তার নেই।
ধাড়ি শেয়াল বেরিয়েছে ঘরের বাইরে। মোরগ রান্না করার জন্য কাঠকুটো মশলাপাতি জোগাড় করতে হবে। ঘরে এসব নেই এখন। বাইরে বেরুবার আগে সন্তানদের পই পই করে সাবধান করে গেছে। তার ছানা মোট পাঁচটি। একটি ছেলে। চারটি মেয়ে। সব্বাইকে মা-শেয়াল ডেকে বলেছে, ‘খবরদার। যা বলছি, মন দিয়ে শোনো তোমরা। মোরগটাকে শক্ত করে বেঁধেছেঁদে রেখে যাচ্ছি। এটাকে চোখে চোখে রাখবে। কোনোভাবেই যেন পালাতে না পারে। আর একটা কাজ করে রেখো। একটা পাত্রে পানি গরম করে রেখো। আমি আসামাত্রই এটাকে রান্না করে ফেলবো। ও আরেকটা কথা। খুব জরুরি কথা সেটা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। বাইরের কেউ এলে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। আমি না ফেরা পর্যন্ত সবাই খুব সাবধানে থাকবে। যা যা বললাম, অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে। কি, বুঝতে পেরেছো আমার কথা?’
শেয়াল-ছানারা মাথা দুলিয়ে সায় দেয় মায়ের কথায়। তার মানে হলো, তারা সব বুঝতে পেরেছে। মা যা বললো, তাই হবে। তারা সবাই মনে রাখবে এই কথাগুলো।
সে চলে গেল, আর বিড়ালটি ঘরে এসে জানালার নিচে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাতে শুরু করল এবং গান গাইতে শুরু করলো-
শিয়ালের ঘরটি বড় এবং লম্বা বেশ,
তার চারটি ছোট মেয়েই সুন্দরী অশেষ
আর পিলিপকো, একমাত্র ছেলে তার,
দেখতে সুন্দর, ভালো তার আচার ব্যবহার ।
বাইরে এসো, ছোট শিয়াল, এসো শিয়াল ছানা,
তোমাদের জন্য করবো আরো কিছু গান বাজনা!
এর পর শিয়ালটির বড় মেয়েটি ভাবলো যে তাকে যেতে হবে এবং দেখতে হবে কে বাজাচ্ছে। সে অন্যদের বলল, ‘এখানে ঘরে থাকো, আমি গিয়ে দেখব কে এত ভালো বাজায়।’
সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আর বিড়ালটি খুব চালাকি করে তার নাকে চাপড় মেরে ব্যাগে ভরে দিলো। আবার পিয়ানো বাজাতে শুরু করল। গাইতে শুরু করলো-
শিয়ালের ঘরটি বড় এবং লম্বা বেশ,
তার চারটি ছোট মেয়েই সুন্দরী অশেষ
আর পিলিপকো, একমাত্র ছেলে তার,
দেখতে সুন্দর, ভালো তার আচার ব্যবহার ।
বাইরে এসো, ছোট শিয়াল, এসো শিয়াল ছানা,
তোমাদের জন্য করবো আরো কিছু গান বাজনা!
শিয়ালের দ্বিতীয় মেয়েটি কে বাজাচ্ছে তা দেখার জন্য বাইরে গেল। আর বিড়ালটি তার নাকে চাপড় মেরে তার বস্তায় ভরে দিলো।
এর পর শিয়ালের দুই ছোট মেয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। তাদের ভাই পিলিপকো ঘরে বসে তার বোনদের জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু তারা ফিরে আসেনি।
সে মনে মনে ভাবল, আমি বাইরে গিয়ে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনব। তা না হলে আমাদের মা ফিরে এলে আমাকে আচ্ছামতো পিটুনি দেবে।
সে বাইরে বেরিয়ে গেল, আর বিড়ালটিও তার নাকে চাপড় মেরে তাকে বস্তায় ভরে দিলো!
তারপর সে বস্তাটি একটি শুকনো উইলো গাছে ঝুলিয়ে শিয়ালের ঘরে দৌড়ে গেল। সে মোরগটিকে খুঁজে পেয়ে তাকে খুলে ফেলল। আর তারা দুজনে শিয়ালের সমস্ত খাবার খেয়ে ফেলল। ফুটন্ত পানির পাত্রটি উল্টে দিল, সমস্ত থালা বাসন ভেঙে বাড়ি ছুটে গেল। আর মোরগটি বিড়াল যা বলেছিল তাই করল। আর কখনও তার অবাধ্য হয়নি।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫



