উমবি গুলারি। উগান্ডার এক রাখাল বালকের নাম। তেরো কী চৌদ্দ বছরের বালক। বাড়িতে সে ছাগল পোষে। ছাগলগুলোকে সে প্রতিদিন সকালে মাঠে চরাতে নিয়ে যায়। সন্ধ্যোবেলায় বাড়ি নিয়ে আসে। খুবই দুরন্ত ও চঞ্চল স্বভাবের ছাগলগুলো। সারাক্ষণ শুধু ছোটাছুটি করে। এখানে যায়, ওখানে যায়। একটা আরেকটারে গুঁতো মারে। তটস্থ করে রাখে উমবি গুলারিকে সারাক্ষণ।
তবুও ছেলেটি ছাগলগুলোর খুবই যত্ন-আত্তি নেয়। ঘাস খাওয়ায়, পানি খাওয়ায়, গোসল করায়। আবার রাতের বেলা খোঁয়াড়ে বেঁধে রাখে।
কিন্তু ছাগলদের একটি স্বভাব উমবিকে অবাক করে দেয়। সেই স্বভাবটি হলো, ওদের ‘গোঁয়ার্তুমি’। গোঁয়ার্তুমিটা করে ছাগলের গলায় যখন দড়ি বাঁধা থাকে, আর সেই দড়ি ধরে সামনের দিকে টানলে। আর কখনো নয়, শুধু দড়ি ধরে সামনের দিকে টানলে সে অনড় হয়ে থাকে। এক পা-ও আর আগে বাড়াবে না। শক্ত হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। যতই টানাটানি করো, ছাগল ততোই অনড় হবে। সামনের দুই পায়ে ঠেক দিয়ে থাকবে, যেন একটুও নড়াতে না পারে তাকে কেউ।
অথচ ছাগলকে পেছন থেকে তাড়া করলে সে দিব্বি আগে বাড়ে। তখন ওরা ছুটে চলে। পারতপক্ষে যেন দৌড়ে দৌড়ে যায়। অবাক করা কাণ্ডই বটে। তখন আর ছাগলকে মাঠে নিয়ে যেতে উমবির কষ্ট হয় না। উমবি ভাবে, ছাগলের এই স্বভাবের নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। একদিন উমবি তার দাদুকে জিজ্ঞেস করে- দাদু, ছাগলদের এমন স্বভাব কেন?
কেমন স্বভাব দাদু? ওর দাদু পাল্টা প্রশ্ন করে। যদিও তিনি জানেন উমবির প্রশ্নটা আসলে কী হতে পারে।
উমবি বলে- ছাগলের গলায় বাঁধা দড়ি ধরে টানলে ওরা এমন গোঁয়ার হয়ে যায়, এক পা-ও আগে বাড়ে না। থোম মেরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। এর কারণ কী দাদু? এমন করে কেন ওরা?
উমবির দাদু মিস্টার নাকাসাঙ্গা। সেই ব্রিটিশ আমলের এক বিপ্লবী নেতা তিনি। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধে অনেক অবদান ছিল তার। অত্যন্ত বিজ্ঞ লোক। নাকাসাঙ্গা উমবিকে বলেন- এর একটি ইতিহাস আছে দাদু। অতি প্রাচীনকালের ইতিহাস। তখন আফ্রিকার জঙ্গলে পশুরা রাজত্ব করত। ঘটনাচক্রে একবার ‘ইগোধবি’ নামের এক ছাগলকে বনের রাজা বানানো হয়। বনের যত পশুপাখি সবাই মিলে ইগোধবিকে ভোট দিয়ে তাদের রাজা বানিয়ে নেয়।
উমবি বলে, আচ্ছা, তারপর?
দাদু বলেন, কিন্তু রাজত্ব পেয়েই ইগোধবির দেমাগ যায় বেড়ে। জীবনযাত্রা পাল্টে যায় তার। রাজা হয়ে প্রথমেই রাজকোষ থেকে ইগোধবি প্রচুর অর্থকড়ি নিয়ে নেয়। তারপর নিজের জন্য প্রকাণ্ড এক প্রাসাদ তৈরি করে। সেই প্রাসাদে ছাগলরাজা ইগোধবি মহাসুখে বাস করতে থাকে। চাকর-বাকরের অভাব নেই তার। তাদের বেতন ভাতাও দেয়া হয় রাজকোষ থেকে। রাজা হয়েই ছাগল ভালো ভালো খাবার খায়। ভালো ভালো পোশাক পরে। দেমাগ এখন মহাতুঙ্গে তার। বনের রাজা সে। যেনতেন কথা! বনের অন্যান্য গরিব পশুপাখি রাজার কাছে এখন আর পাত্তাই পায় না। রাজা হয়ে ইগোধবি বেমালুম ভুলে যায় যে বনের এই পশুপাখিরাই তাকে রাজা বানিয়েছে। দেমাগে এখন ছাগলের পা পড়ে না মাটিতে।
এভাবে দিন যায়, রাত আসে। রাত যায়, দিন আসে। বনের অন্য পশুপাখিরা তাকে ‘কর’ দেয়। ‘খাজনা’ দেয়। তোয়াজ করে চলে। বেশ ভালোভাবেই দিন কাটতে লাগলো ছাগলরাজা ইগোধবির।
একদিন ইগোধবি বনের পশুপাখিদের ডাকল। রাজার তলব বলে কথা! বনের সকল পশুপাখি এসে জড়ো হয় রাজ দরবারে। এরপর ছাগলরাজা বক্তৃতা শুরু করেন- ভাইসব, আজ আমি তোমাদের ডেকেছি একটি মহাবিপদের সংবাদ জানাতে। গতরাতে আমি ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখেছি। সেই স্বপ্নের কথাটাই আজ জানাব তোমাদের।
উপস্থিত পশুপাখিরা সবাই চুপ। ভয়ে মুখ বিবর্ণ হয়ে যায় সবার! কী বিপদই না অপেক্ষা করছে তাদের! কী কথাই না বলবে আজ রাজা। উপস্থিত সবাই এ ওর দিকে তাকায়। ও এর দিকে তাকায়। দৃষ্টিতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কিন্তু কথা বলছে না কেউ। সবার মনে একটাই চিন্তা। কী বলবেন রাজা। কী এমন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলেন তিনি!
রাজা ফের বলতে শুরু করেন- স্বপ্নে আমি দেখলাম দেশে চরম দুর্ভিক্ষ পড়েছে। খাদ্যের বড় আকাল! কোথাও খাবার নেই, পানি নেই। মাঠে শস্য নেই, ঘাস নেই। নদী শুকিয়ে গেছে। চার দিকে শুধু হাহাকার! ক্ষুধায় কাতর সবাই। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে সবার। খেতে না পেয়ে মারা যাচ্ছে কেউ কেউ।
রাজা একটু থামেন। কিছুক্ষণ পর ফের বলতে শুরু করেন তিনি। স্বপ্নে আমি দেখলাম, আমারই চোখের সামনে অনাহারে মারা গেল আমার আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বেরাদার। এ কথা বলে ছাগল রাজা কান্নার ভান করেন। ভ্যাঁ ভ্যাঁ করেন কিছুক্ষণ। বুঝাতে চাইলেন, প্রজাদের জন্য তার কতই না দরদ, কতই না মায়া, কতই না মহব্বত!
রাজার কথা শুনে অন্য পশুপাখির মুখ আরো শুকিয়ে যায়। ভয় ও আতঙ্কের ছায়া পড়ে চোখে-মুখে। এখন উপায়! রাজার স্বপ্ন বলে কথা! এ স্বপ্ন তো মিথ্যে হবার নয়! দেশে দুর্ভিক্ষ পড়বে। না খেয়ে মরতে হবে। অনেকে এ বন ছেড়ে অন্য বনে চলে যাবে। নিজের মা-বাপ, আত্মীয়স্বজনকেও ভুলে যাবে অনেকে। ক্ষুধার জ্বালা! আহারে, ভুক্তভোগিরাই জানে। সবার চোখেই এখন পানি। কথা নেই কারো। গলা শুকিয়ে গেছে।
অবশেষে একটি বিড়াল মিঁউমিঁউ করে বলে- হে মহামান্য রাজন, দুর্ভিক্ষ যদি এসেই যায়, তাহলে কী উপায় হবে আমাদের? কীভাবে বাঁচবো আমরা? আপনি একটা উপায় বের করুন। আমাদের আদেশ করুন। এখন থেকেই কিছু একটা করতে হবে, হে মহামান্য রাজন।
বিড়ালের কথা শেষ হতেই পাতিহাঁস ও মুরগি প্যাক প্যাক আর কক্ কক্ করে ওঠে। তারপর বলে- হে মহারাজ, আমরা হাঁস-মুরগি শলা-পরামর্শ করে একটি উপায় বের করেছি। আপনি অনুমতি দিলে বলি।
ছাগলরাজা অনুমতি দিলেন। হাঁস এবার প্যাক প্যাক করে বলে- হে রাজন, আমরা গরিব ক্ষুদ্রপ্রাণী। রাজ্যে দুর্ভিক্ষ হানা দিলে আমরাই আগে মরব। সেই ভয়ে ঠোঁট আমাদের শুকিয়ে গেছে। বলি কী, আপনার এই বনরাজ্যে আপনি একটি ঘোষণা জারি করে দিন। সবাইকে বলে দিন, আগামীকাল থেকে বনের সবাইকে রাজভাণ্ডারে এক মুঠো করে খাদ্যশস্য এনে মজুদ করতে।
একটা ইঁদুর তখন বলে- হ্যাঁ রাজন, আমারও একই মত। আমরা সবাই যদি এক মুঠো খাদ্যশস্য অথবা এক আঁজলা পানীয় প্রতিদিন রাজকোষে জমা রাখি, তাহলে আগামী এক বছরে অনেক খাবার জমা হয়ে যাবে। এতে দুর্ভিক্ষের দিনগুলো মোকাবেলা করতে তেমন বেগ পেতে হবে না।
সভায় উপস্থিত পশুপাখি হাঁস-মুরগি, ইঁদুর এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে। সবাই সমস্বরে বলে ওঠে- হে মহামান্য রাজন, এই প্রস্তাবটি বেশ ভালো, গ্রহণযোগ্যও বটে। বিষয়টি আপনি সুবিবেচনায় নিন। রাজভাণ্ডারে শস্য ও পানীয় জমা হতে থাকলে দুর্ভিক্ষের সময়টা খুব সহজেই পার করা যাবে। দুর্ভিক্ষের ছোবল আমাদের কিছুই করতে পারবে না।
ছাগলরাজা মনে মনে এমনটিই চাচ্ছিলেন। কারণ, রাজকোষ শূন্য ছিল তখন। তাই, সে বানিয়ে বানিয়ে প্রজাদের কাছে এমন স্বপ্নের কথা বলে। প্রজাদের কথা শুনে ছাগল রাজা বনরাজ্যে ঘোষণা করে দেন, ‘আজ থেকে প্রত্যেক পশু-পাখি সন্ধ্যোবেলায় রাজভাণ্ডারে এক মুঠো করে খাদ্যশস্য অথবা এক আঁজলা করে পানীয় জমা দিয়ে যাবে। কেউ এর অন্যথা করলে তাকে শূলে চড়ানো হবে।’
রাজার আদেশ নতশিরে মেনে নেয় প্রজারা। মনে তাদের সাহস বেড়ে যায়। আগামী বছর যদি দুর্ভিক্ষ এসেই পড়ে, তা হলে এই জমানো খাবার খেয়েই বেঁচে থাকা যাবে।
পরদিন থেকে বনের পশুপাখিরা রাজভাণ্ডারে খাদ্যশস্য এনে জমা দিতে শুরু করে। এভাবে একদিন দুইদিন করে ছয় মাস কেটে যায়। দুর্ভিক্ষ এখনো আসেনি বনরাজ্যে। ইতোমধ্যে ছাগলরাজার রাজত্বের মেয়াদকাল প্রায় শেষ। নির্বাচন করে পুনরায় প্রজাদের নতুন রাজা বানানোর সময় চলে আসে।
চার দিকে নির্বাচনী হাওয়া। প্রজাদের মনও বেশ উৎফুল্ল। অবশেষে একদিন ঠিকই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে, এবার বনের পশুপাখিরা মিলে ‘মেলোডি’ নামের এক হুলোবিড়ালকে ভোট দেয়। রাজা হয়ে যায় হুলোবিড়াল মেলোডি। নির্বাচনে হেরে যায় ছাগল ‘ইগোধবি’।
আর এতেই বাধে গোল। সমস্যা তৈরি হয়ে যায় বনরাজ্যে। কারণ, ছাগল রাজা ইগোধবি ভোটের এই ফল মানেন না। ক্ষমতা ছাড়তে তিনি রাজি নন। ইগোধবি বলেন- সামান্য ওই পুঁচকে বিড়ালের কাছে কি না ক্ষমতা ছেড়ে দেবো আমি! কিছুতেই না! ঘাড় কাত করে গদিতে বসে থাকে ইগোধবি। ছাগল রাজা বলেন- একবার যে রাজা হন, তিনি আজীবনই রাজা থাকেন। তাকে ক্ষমতা থেকে নামানো যায় না। এটাই নিয়ম।
ইগোধবি ঘোষণা করে দেন- এ নির্বাচন মানি না। বনের রাজা আমিই। অন্য কেউ বনরাজ্যের রাজা হতে পারবে না। আমাকেই রাজা মানতে হবে সবার। না মানলে তাকে ধরে ধরে খোঁয়াড়ে ভরবো। কোথাকার কোন পুঁচকে হুলো! সে কি না হবে বনের রাজা! বলি, রাজকার্য চালানো কি এতই সহজ?
কিন্তু প্রজারা বিড়ালকেই তাদের রাজা মেনে নেয়। সবাই নতুন রাজার শস্যভাণ্ডারে খাদ্যশস্য ও পানীয় এনে জমা দিতে থাকে। বাধ সাধে শুধু ওই ছাগলরাজা ইগোধবি। তিনি গোমড়ামুখে তার প্রাসাদেই বসে থাকেন। বিড়ালকে তিনি রাজা মানেন না। বিড়ালের শস্যভাণ্ডারে খাদ্যশস্য ও পানীয়ও জমা দেবেন না তিনি। ইগোধবি বলেন, আমি হলাম রাজা। আমি কেন বিড়ালের ভাণ্ডারে খাদ্যশস্য জমা দেবো?
ছাগলের এমন গোঁয়ার্তুমি দেখে বনের পশুপাখি সবাই ক্ষেপে যায়। তাই, বিড়ালের রাজসভায় এসে একদিন হাজির হয় সবাই। প্রজারা বলে, এর একটা বিহিত করতে হবে। ছাগলের গোঁয়ার্তুমি মেনে নেয়া যায় না। বিড়ালের রাজসভায় উপস্থিত একটি গাভী হাম্বা হাম্বা করে চিৎকার দিয়ে বলে- ইগোধবির বিচার চাই। নতুন রাজার আদেশ অমান্য করায় তার শাস্তি চাই। শূলে চড়িয়ে তার ফাঁসি চাই। গাভী বলে- ইগোধবি যখন রাজা ছিলেন, আমরা তার কথা মেনে চলেছি। তার আদেশ নিষেধ শুনেছি। তা হলে এখন কেন তিনি নতুন রাজার আদেশ মানবেন না? আজীবন তিনি রাজা থাকতে চান? এটা কি সম্ভব? প্রজারা ভোট দিয়ে যাকে রাজা বানাবে, তিনি-ই হবেন রাজা। ইগোধবির এই গোঁয়ার্তুমি মেনে নেয়া যায় না। এর বিচার চাই। ইগোধবিকে এই বিড়ালের রাজভাণ্ডারে এসেই কর দিয়ে যেতে হবে।
গাভীর কথায় বনের পশুপাখিদের সাহস বাড়ে। তারা সমস্বরে স্লোগান দেয় :
-‘এই ছাগলের বিচার চাই-
করতে হবে, করতে হবে’
-‘ছাগল রাজার বুদ্ধি নাশ-
বাঁশ ফাটিল ঠাস ঠাস’
-‘কী ভেবেছে ছাগল রাজা?-
এবার দিব কঠিন সাজা’
-‘আইন মানে না গোঁয়ারে
ঢুকাও তারে খোঁয়াড়ে’।
এ ধরনের স্লোগানে উত্তাল হয় বন।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫



