নীলকান্ত মণি ও সুরেলা গান

0
5

মেমি হেইলি হেইলি একজন গরিব মানুষ। অনেক বুড়ো হয়েছেন তিনি। বুড়ো হলেও বাঁচোয়া নেই। শুয়ে বসে যে দিন কাটাবেন, তা কেমন করে হবে? তিন কূলে আপন বলতে কেউ নেই যে তার। সুতরাং কাজকম্ম না করে কোনো উপায় নেই। বছরভর খেত-খামারে কাজ করতে হয় প্রতিদিন। না হলে উপোস থাকতে হয়। ধনী লোক নন তিনি। সামান্য যা আয় রোজগার করেন, তা দিয়ে টেনেটুনে কোনোমতে সংসার চলে যায়। সব্বাই জানে, মেমি একজন ভালো মনের মানুষ। কারো ক্ষতি করেন না কখনো। ভুলেও মন্দ কাজ করেন না। কোনো কারণে অন্যের ক্ষতি হোক, সেটা কিছুতেই চান না। সবার সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন। মিষ্টি, কোমল ব্যবহারের কারণে তার এলাকায় তিনি ছোট বড় সবার প্রিয়।
একদিন মন দিয়ে চাষবাসের কাজ করছিলেন নিজের জমিতে। ফসল বোনার সময় হয়েছে। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিলেন মেমি হেইলি হেইলি। হঠাৎ ঠক করে একটা শব্দ হলো। সাধারণ শব্দ না। বেশ জোর আছে সেই শব্দের। কী ব্যাপার? আচমকা এমন শব্দ হলো কেন? ভালো করে লক্ষ করে দেখেন, মাটির নিচে কী যেন একটা চকচক করছে। মূল্যবান কোনো পাথর হবে হয়তো। আসলেই তাই। বড়োসড়ো একটা নীলকান্ত মণির সঙ্গে তার কোদালটা কেমন করে যেন লেগে গেছে। ধুলোমাটি খুঁড়ে নিচ থেকে দামি এই পাথরটি উদ্ধার করলেন মেমি হেইলি হেইলি। কাজটা করতে বেশ মেহনত করতে হলো। সময়ও লাগলো অনেক। তা হোক। কিছু একটা পাওয়া তো গেছে। এতক্ষণের পরিশ্রম তাহলে একেবারেই বৃথা যায়নি।
মনটা খুবই ফুরফুরে লাগছে। মনে হচ্ছে, আজ ভাগ্যটা বেশ ভালো। তার পুরো জীবনেই এমন শুভক্ষণ কোনোদিনই আসেনি আর। কাজকর্ম থামিয়ে মেমি ভাবলেন, আজ কোনো মাটি কোপাকুপি নয় আর। এবার বাড়ি ফিরে যাওয়া যাক। জমিতে পাওয়া দামি পাথর তার ভাগ্যকে রাতারাতি বদলে দেবে। নিশ্চয়ই শুভ কিছু ঘটবে আরো। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। গরিবি হাল আর থাকবে না। হয়তো খুব তাড়াতাড়িই ধনী হয়ে যাবেন তিনি। হাব ভাব তো সেরকমই মনে হচ্ছে। ঝরঝরে মনে এমন সব ভাবনা ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরলেন মেমি হেইলি হেইলি। আহ, এমনটা ভাবতে কী ভালো যে লাগছে। উত্তেজনায় শিহরণে রীতিমতো কাঁপছেন তিনি।
জোরে জোরে পা ফেলে এগোচ্ছেন। বাড়ি বেশ দূরেই। যেতে যেতে পথে দেখা হলো এক ঘোড়াওয়ালার সঙ্গে। লোকটির হাতে একটা দড়ি দেখা যাচ্ছে। সেই দড়ি বাঁধা আছে ঘোড়ার গলায়। লোকটি তার অনেকদিনের চেনাজানা। ঘোড়ার মালিক থামে। তারপর তাকে জিগ্যেস করে,
ওহে মেমি, তা কী খবর? নাচতে নাচতে কোথায় চলেছো শুনি। তারপর বলো, কেমন আছো তুমি? কেমন চলছে দিনকাল? সব খবর ভালো তো?
এক গাল হেসে জবাব দেন মেমি, ভালো আছি রে ভাই। অনেক ভালো। আমি আজ মাটি খুঁড়ে মহামূল্যবান একটা রত্ন পেয়েছি। এই ঘটনাকে একপ্রকার তাজ্জব ব্যাপারই বলতে হবে। কারণ কখনো এমনটা আর ঘটেনি আমার জীবনে। মনে হচ্ছে কি জানো, এই পাথর নিশ্চয়ই আমার জন্যে সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে। দেখো তুমি, আমার গরিবি দশা এই ঘুচলো বলে।
ঘোড়াওয়ালা কিছু বলবার আগেই মেমির কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে,
একটা কথা বলি বাছা তোমায়। আমার এই রত্নের বদলে তোমার ঘোড়াটা আমাকে দেবে নাকি? রত্ন দিয়ে আমি করবোটা কী? ঘোড়াটা পেলে আমার বেশ কাজ হয়। রত্ন নিয়ে তুমি বেচে দাওগে। অনেক টাকা মিলবে দেখো।
ঘোড়াওয়ালা এই প্রস্তাব পেয়ে বেশ অবাক। সে ভাবতেই পারেনি মেমি এমন ধারা কোনো কথা বলবেন। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে, তুমি কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছো নাকি? কোথায় রত্ন আর কোথায় ঘোড়া? একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো তুলনা হয় না রে ভাই।
মেমি হা করে তাকিয়ে থাকেন।
ঘোড়ার মালিক তার কথা শেষ করেনি। সে আরো যোগ করে, এই যে রত্ন তুমি আজ জমি খুঁড়ে পেয়েছো, জানো নাকি এটা মহা মহা মূল্যবান। এর দাম কত, সেটা তুমি জানো? নিশ্চয়ই জানো না। জানলে এমন অদ্ভুতুড়ে কথা তুমি বলতে পারতে না। এই রত্ন আসলে অমূল্য। এর তুলনায় আমার ঘোড়া কিছুই না।
ঘোড়াওয়ালার লম্বা বক্তৃতা শুনে মেমি একটুও দমে যান না। তিনি যেটা মনে করে রেখেছেন, তাই করবেন। এ ব্যাপারে তার মনে কোনো দ্বিধা নেই। মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে ঘোড়াওয়ালাকে তিনি বললেন,
অমূল্য না কম মূল্য, সে কথা তো হচ্ছে না। তোমার সঙ্গে একটা ব্যবসা করতে চাইছি আমি। চট করে বলো তো বাছা শুনি, তুমি এতে রাজি আছো কি না? যদি রাজি থাকো, তাহলে তোমার ঘোড়ার দড়িটা আমার হাতে দাও। বিনিময়ে এই রত্নটা নিয়ে নাও তুমি। আমরা যে যার পথে যাই তারপর।
ঘোড়াওয়ালা বোকা লোক নয় মোটেও। সে যখন বুঝতে পারলো যে, চাষি মোটেও মিথ্যে কথা বলছে না, তখন সে রাজি হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। রত্ন চলে গেল ঘোড়ার মালিকের হাতে। আর হাসিখুশি চাষি মেমি হেইলি হেইলির হাতে এসে গেল ঘোড়ার দড়ি। এখন মনটা তার বেশ ঝরঝরে। আগের চাইতেও নির্ভার। চোখে মুখে আনন্দের ছটা। মনে হচ্ছে বেশ জিতেই গেছেন।

তবে কি না মেমি’র অদ্ভুত ব্যবসার শেষ এখানেই নয়। আরো আরো বাকি আছে। আমরা সব ঘটনাই ধীরে ধীরে জানবো।
এক লোক হাটে যাচ্ছিল একটা ষাঁড় নিয়ে। বেচবে সেই জোয়ান তাগড়া ষাঁড়। চাষি হেইলি হেইলিকে দেখে সে হাঁক দেয়,
ওহে মেমি, কী খবর? তারপর বলো, কেমন আছো তুমি? কেমন চলছে তোমার দিনকাল? সব খবরাখবর ভালো নিশ্চয়ই। বেশ অনেকদিন দেখা হয়নি তোমার সঙ্গে। কোথায় কোথায় যে থাকো!
এক গাল হেসে জবাব দেন মেমি, দ্যাখো হে বাপু, আমি আর আগের মাতে গরিব নই। এক সময় ছিলাম বটে। তবে কি না ব্যাপার হলো, সে দুর্দশা, হতশ্রী দশা আর নেই আমার। জমি খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করতে গিয়ে মহামূল্যবান একটা রত্ন পাথর পেয়েছিলাম। সেটা দিয়ে চমৎকার ব্যবসা করেছি। ওটার বিনিময়ে এই ঘোড়াটা পেলাম। আমি বলি কী, তোমার ষাঁড়টা আমাকে দাও। তার বদলে এই ঘোড়া তুমি নিয়ে নাও। এটাও একটা ব্যবসা। এই ব্যবসা আরো করতে চাই আমি। ভালো মতো ভেবে দ্যাখো, আমার দেয়া প্রস্তাব তোমার মনে ধরে কি না। একটু ভেবেচিন্তে তারপর বলো, এ প্রস্তাবে তুমি রাজি না কি অরাজি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই রাজি। তুমি যখন এত করে বলছো,তখন তোমার কথা ফেলি কী করে? তোমার মনে আমি কষ্ট দিতে চাই না।
ষাঁড়ওয়ালা কয়েক মিনিট ভাবনাচিন্তার ভান করে তারপর বলে ওঠে। সে প্রস্তাব শোনা মাত্রই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে অদলবদল করবে। না করাটা বোকামি হবে। এই যে কয়েক মিনিট ভাবনাচিন্তার নামে সময় কাটালো, সেটা আসলে ব্যবসার একটা গুপ্ত কৌশল।
ষাঁড়ওয়ালা মনে মনে মহাখুশি। চালাক মানুষ তো, বাইরে তার প্রকাশ ঘটায় না। চোখমুখ সাধ্যমতো গম্ভীর করে রাখে।
ওইদিকে আমাদের মেমি হেইলি হেইলি আরো খুশি। ঘোড়ার বদলে মোটা তাজা একটা ষাঁড় পাওয়া গেছে। ব্যবসা তাহলে বেশ ভালোই হচ্ছে। জমে উঠেছে কায়কারবার। ব্যাপারটার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা আছে। আগে কোনোদিন এমন মজার অভিজ্ঞতা হয়নি। এখন হতে শুরু করেছে। আগামীতে হয়তো আরো হবে। নিজের ওপর শ্রদ্ধা বেড়ে যায় তার।
এইভাবে ব্যবসা চলতে থাকলো তার। ষাঁড়ের বদলে ভেড়া, সেই ভেড়ার বদলে একটা রামছাগল। তারপর একটা ঝুঁটিওয়ালা মোরগ। একেকবার বদল হয়, আর মেমির খুশির পরিমাণ বাড়ে। ফুরফুরে মনে হাঁটতে থাকেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত কী ঘটলো? পথ চলতে চলতে শুনতে পেলেন, কে যেন ভীষণ সুরেলা কণ্ঠে গান গাইছে। মেমি হেইলি হেইলির কানে ভেসে এলো সেই গানের মূর্ছনা। ভীষণ মুগ্ধ আর অভিভূত হলেন তিনি। এমন অপূর্ব সুরেলা মিষ্টি গান তিনি জীবনে আর কোনোদিন শোনেননি। বাদ্যযন্ত্রের টুং টাংয়ের সঙ্গে নিপুণ মিষ্টি গলার গান। মেমি ভয়ানক উচ্ছ্বসিত। আনন্দিত। সুরের পরশে মন তার মাতোয়ারা। খুব ইচ্ছা করছে এই গান শিখতে। ভাবলেন, আহা এই গান যদি আমি কোনো না কোনোভাবে শিখতে পারতাম। জীবনে কোনো দুঃখ আফসোস থাকতো না তাহলে। জীবন আমার ধন্য, পরিপূর্ণ হয়ে যেত তাহলে। নিজে যেমন আনন্দ পেতাম, তেমনি গান শুনিয়ে অন্যদেরও নির্মল আনন্দ দিতে পারতাম। এই কাজে কত পুণ্য যে আমার হতো!
সুরেলা গান যিনি গাইছিলেন, সেই গায়কের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার। মেমিই খুঁজে পেতে বার করলেন তার হদিস। গাইয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, তা হেইলি হেইলি মেমি, তুমি কী করছো এখানটায়? শরীর স্বাস্থ্য ভালো তো? কেমন চলছে তোমার দিনকাল?
মিষ্টি হেসে এই প্রশ্নের জবাব দেন মেমি হেইলি হেইলি, বুঝলে হে, খবর হলো আমি আর আগেকার সেই গরিব ও অভাবী মানুষটি নই। এখন আমি রীতিমতো ধনী মানুষ। জমি চাষ করতে গিয়ে মহাদামি একটা রত্ন খুঁজে পেলাম। তারপর সেটা দিয়ে ব্যবসা শুরু করলাম। প্রথমে আমি পেলাম একটা ঘোড়া। সেই ঘোড়ার বদলে পাওয়া গেল ষাঁড়, তারপর ষাঁড়ের পরিবর্তে ভেড়া। রামছাগল জুটলো সেই ভেড়ার বদলে। ওই ছাগলের বিনিময়ে পেলাম একটা ঝুঁটিওয়ালা মোরগ। এখন ভাই শোনো, ভীষণ দরকারি একটা কথা বলি। তোমার কণ্ঠে এইমাত্র যে সুরেলা গানটা শুনলাম, তার কোনো তুলনা নেই। আমার জীবনে কখনোই এত চমৎকার গান শুনিনি। অমন সুন্দর গানটা আমি শিখতে চাই। এখনই চাই। আমার যে ভীষণ ভালো লেগে গেছে এই গান। তুমি আমাকে নিরাশ করো না। আমাকে গানটা শিখিয়ে দাও।
গায়ক ভদ্রলোক মেমিকে গান শেখাতে রাজি হলেন। পরম যত্ন করে শেখালেনও। মেমি তাকে বিনিময়ে মোরগটা দিয়ে দিলেন।
মেমি ওই গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে গেলেন।
বর্তমানে তার মতো সুখী, তার মতো ধনী, তার মতো সফল ব্যবসায়ী দুনিয়াতে দ্বিতীয় আর কেউ নেই।

প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫