টানা পাঁচ দিন বৃষ্টির পর আজ কড়া রোদ উঠেছে। ছোট্ট রিনি গালে হাত দিয়ে ছাদের দোলনায় বসে বসে চিন্তা করছে কেন তার কোনো বন্ধু নেই, কেন তাকে সবসময় একা একা সময় কাটাতে হয়। শুধু পড়াশুনা করতে রিনির একদম ভালো লাগে না। রিনি চায়, ওর কতগুলো গুড়ো গুড়ো বান্ধবী থাকবে, যাদের সাথে ও ক্লাস শেষে ফুচকা খাবে আর গল্প করতে করতে বাসায় আসবে। যে কি না ওর যত কথা আছে পেটে সব শুনবে বসে বসে আর খিলখিল করে হাসবে দুজনে। কিন্তু ওর ছোট বিড়ালটা ছাড়া তো কেউ ওর কথা বুঝতে পারে না। তাই বেশির ভাগ সময় ও একা একা ছাদের দোলনায় বসে বসে আকাশ দেখে। ওর খোলা আকাশে কবুতরের ঝাঁক উড়তে দেখতে এত্ত আনন্দ লাগে! ওর খুব মন চায় খোলা আকাশে উড়তে। ও চায়, কবুতররা যেমন এক ঝাঁক মিলে একসাথে উড়ে বেড়ায়, ও তেমন কিছু সঙ্গী সাথি নিয়ে উড়ে বেড়াবে। ও মাঝে মাঝে কবুতরের সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করে, যাতে ওরা ওকে কোনোভাবে সঙ্গে নিয়ে যায়, ‘আমায় নিবা তোমাদের সাথে, কবুতর? তোমার তো অনেক সঙ্গী আছে। কিন্তু জানো? আমি খুব একা, আমার সাথে কেও কথা বলে না। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পার, কবুতর?’ কিন্তু দুঃখজনক কবুতরও রিনির কথা বুঝতে পারে না, ওরাও ওদের গ্রুপের ওকে জায়গা দিল না। এটা রিনিদের নিজেদের বাড়ি। দশ তালা বিল্ডিং ওর বাপ-চাচারা মিলে বানিয়েছে বছরখানেক আগে। কিন্তু বাসায় এত এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও রিনির সাথে কথা বলার মতো কেউ নেই। এই নিয়ে ওর খুব মন খারাপ হয় মাঝে মাঝে। তার উপর ঘরের ভিতর ঝগড়া-অশান্তি লেগেই থাকে। ও বুঝতে পারে যে এই সব অশান্তির মূল ও নিজেই। ওকে নিয়েই সবার চিন্তা পেরেশানি। সব কিছু মিলিয়ে আজকে রিনির মাথাটা আর কাজ করতেছে না। দুই ফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়তেই রিনি উঠে দাঁড়াল, জোরে নিঃশ্বাস ফেললো, তারপর এক দুই কদম করে সামনে এগোতে থাকে। ঠিক কিনারে আসার পর কেনো যেন ওর বুক ধড়ফর করতে লাগলো, আর চোখের পানি অনবরত পড়তে লাগলো। ও নিচে তাকিয়ে খেয়াল করলো, ওর চোখের পানি গাল দিয়ে গড়িয়ে একদম নিচে চলে যাওয়ার সময় মাঝ পথে যেন উধাও হয়ে যায়। ওর খুব মন চাচ্ছিল ও এরকম উধাও হয়ে যাবে দুনিয়া থেকে, যেন আর কেউ ওর দেখা না পায় কোনো দিন। রিনি শেষ কদমটা ফেলার পর ওর পায়ের নিচে আর মাটি নেই। কিন্তু, ওর কাছে আশ্চর্য লাগছে যে ও নিচের দিকে না গিয়ে উপরের দিকে কেন যাচ্ছে? রিনি চমকে গেল এইটা বুঝতে পেরে যে ও উড়ছে। ও বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে ও আসলেই আকাশে উড়ছে। একটি বড় সাদা রংয়ের খুব সুন্দর কবুতর ওর উপর দিয়ে উড়ছে। পুরো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। আকাশ একদম পরিষ্কার, নীল হয়ে আছে। মেঘগুলো একদম যেনো রিনি আসার সুবাদে টুকরো টুকরো তুলার মতো ছড়িয়ে আছে। আর রোদের আলো মেঘের মাঝখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে যেন রিনির সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে। ‘তোমাকে অনেক অনেক Thank you, কবুতর। তুমি আমার আকাশে উড়ার ইচ্ছা পূরণ করে দিয়েছো। কবুতর বলে উঠলো, ‘আজকে তোমার সব ইচ্ছা পূরণ হবে, রিনি।’ ওয়াও, তুমি আমার কথা বুঝতে পারো?’ আনন্দে রিনির চোখে পানি এসে গেল। ‘কিন্তু একটা প্রমিজ করতে হবে। তুমি কোনোদিনও আজকের মতো ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করবা না। তাহলে তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করবো।’ ‘ঠিক আছে, প্রমিজ এমনটা করবো না আর কখনো।’ তারপর কবুতরটি রিনিকে একদম উপরে নিয়ে গেল ওদের ঝাঁকের মাঝে। সবাই রিনিকে দেখে খুশি হলো, রিনি ওদের সাথে খুব মজা করে আকাশে উড়লো। সন্ধ্যা হয়ে যেতে লাগলে, রিনি বললো, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেলে আমি কোথায় যাব? আমাকে please তোমাদের সাথে মজা করতে দাও আরো কিছুক্ষণ?’ কবুতর বললো, ‘ঠিকাছে তুমি এখন বলো কোথায় যেতে চাও?’ ‘সমুদ্রের পাড়ে বসে sunset দেখতে চাই।’ কবুতরের ঝাঁক রিনিকে নিয়ে চলে এলো সমুদ্রের পাড়ে। রিনি বালুতে নেমে বসলো। পানির সা-সা আওয়াজ শুনে রিনির মনে হলো যেন সমুদ্র ওর সাথে খুব মজার গল্প করছে। রিনিও ওর পেটের সব গল্প বলে ফেললো সমুদ্রকে। পানির ফেনাগুলো যেন এই আসে রিনিকে ধরতে, আবার দৌড়ে চলে যায়, খুব মজা করে খেলছে রিনির সাথে। আর সূর্য ডুবে যাওয়ার আগ দিয়ে এমন সুন্দর দৃশ্য ˆতরি হয়, আকাশে, পুরো কমলা, হলুদ আর pinkish type হয়ে যায়। এই ৩টি কালারই রিনির প্রিয় কালার। সূর্য যেন রিনিকে welcome করছে ওর প্রিয় কালার দিয়ে এত সুন্দর দৃশ্য বানিয়ে। আর ঠান্ডা বাতাস যেন রিনিকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘তোমার সাথে আমরা সবাই আছি, তুমি একা না।’ তারপর সূর্য ডুবে গিয়ে আকাশ অন্ধকার হতে লাগলে, রিনির আবার মন খারাপ হয়ে যায়। রিনি বলে, ‘এখন রাত হয়ে গেলে তো সব মজা শেষ। এখন কী হবে। আমি তো আরো আনন্দ করতে চাচ্ছি।’ তখন কবুতর বললো, ‘সূর্য ডুবে গেছে তো কী হয়েছে? তোমাকে welcome করতে আরো সুন্দর জিনিস আসবে। তুমি একদম মন খারাপ করো না।’ কিছুক্ষণ পর রিনি দেখলো, সূর্য পুরোপুরি ডুবে গিয়েছে। এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। রিনির ভয় লাগতে শুরু করলো। কিন্তু ঠিক এমন সময় রিনি দেখতে পেল এত্ত সুন্দর একটা Crescent shaped Moon। চাঁদটা যেন মনে হয় রিনিকে খুশি করার জন্য Haircut করে এসেছে। রিনি খুশিতে নাচতে লাগলো। তারপর দেখতে পেল আকাশটা ছোট ছোট তারা দিয়ে পুরো বিয়ে বাড়ির মতো সেজে আছে। এমন সময় নামলো বৃষ্টি। রিনি তো খুব মজা করে বৃষ্টিতে ভিজলো। আর চাঁদের দিকে মুখ করে অনেক জোরে হাসি দিলো, চাঁদও যেন ওর দিকে হাসি দিল আর ওর চেহারা চাঁদের আলো মেখে পুরো Moon Fairy লাগছিল। রিনির মনের একাকীত্ব দূর হলো কিছুটা। কবুতর বললো, ‘রিনি, এখন তো তুমি একা নও। আমরা সবাই আছি তোমার সাথে। এখনও কি তুমি দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে যেতে চাও?’ ‘না, এখন আর চাই না। কিন্তু তোমরা সবসময় আমার সাথি হয়ে থাকবে তো?’ কবুতর, চাঁদ, সমুদ্র, তারা, বৃষ্টি সবাই মিলে রিনি’কে বললো, ‘যতদিন তুমি দুনিয়াতে আছো আমাদের সবাইকে পাবে। সময় করে মাঝে মাঝে আমাদের সাথে খেলতে আসবে, দেখবে কত্ত মজা লাগে!’
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫



