এক.
অনেকক্ষণ হলো গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তাহলে কী যুদ্ধ থেমে গেছে? এ যুদ্ধে কারা জয়ী হলো? নাঈম কৌতূহলী চোখে ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকায়। কোথাও জনমানবের সাড়া নেই। সড়কের দু’পাশে শুধু পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। সদ্য ফোটা গোলাপের মতো রক্তে ভিজে আছে তাদের শরীর।
নাঈমের মন চাইছে দৌড়ে রাস্তায় নামতে। কিন্তু মা-বাবার বারণ। পুলিশ নামের পশুগুলো নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারছে। তাই সে আর রাস্তায় নামে না। শুধু ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে থাকে। দেখতে থাকে খুনরাঙা প্রান্তর।
নাঈমের অশ্রুভেজা চোখের পাতায় রাশেদের চেহারাটাও ভেসে ওঠে। রাশেদ ওরই আপন ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। পরিবারের কত স্বপ্ন ছিল ওকে নিয়ে! কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো এখন আর তারার মতো জ্বলজ্বল করছে না। জুলাইয়ের লাল মেঘে ঢেকে গেছে।
চারদিন হলো তার কোনো খোঁজ নেই। কেউ একজন বলেছে— পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
কেনো নিয়েছে?
রাশেদ কোটা প্রথার কবর দিতে চেয়েছে। মেধার মূল্যায়ন চেয়েছে। এই-ই কি তার অপরাধ?
কী আজব দেশ! এখানে মেধার মূল্যায়ন হয় না। তার জন্য রাস্তায় নামতে হয়। পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়।
রাশেদের আম্মু কতবার যে যাত্রাবাড়ি থানায় ছুটে গেছেন। ছেলেকে এক নজর দেখার আকুতি জানিয়ে কতবার যে পুলিশের হাতে-পায়ে ধরেছেন। কিন্তু তাদের হৃদয় গলেনি। বরং জংলি-জানোয়ারের মতো চেঁচিয়ে বলেছে, এখনই থানা থেকে বের হয়ে যাও। না হয় ছেলের মতো তোমাকেও শেষ করে দেবো।
রাশেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিকস নিয়ে পড়াশোনা করে। আর মাত্র দুটো সেমিস্টার বাকি ছিলো। তারপরই চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে লাগামহীন ঘোড়ার মতো ছুটতো। ধরতে পারতো কি?
রাশেদ খুব ভালো করেই জানে—এই দেশে মেধার মূল্যায়ন হয় না। কোটা বা ঘুষের জোরই আসল কথা। সিস্টেমই তো এমন! এ কারণেই সে এই সিস্টেমকে ভাঙতে চেয়েছিলো। তার মতো আরও অসংখ্য শিক্ষার্থী এই একই লক্ষ্যে রাজপথে নেমেছে। স্লোগান তুলেছে—
‘সারা বাংলায় খবর দে/ কোটা প্রথার কবর দে।
জেগেছে রে জেগেছে/ ছাত্র সমাজ জেগেছে।’
স্লোগানে মুখর ঢাকার রাজপথ। উৎসুক জনতার চোখ তখন সাদা পোশাকের শুভ্র মিছিলে। তাদের মৌন সমর্থনে মিছিল হয়ে ওঠে উত্তাল সমুদ্র।
ঠিক তখনই ডাইনিটা পুলিশকে নির্দেশ করে—গুলি করো। আমার বিরুদ্ধে লাগার পরিণাম যে কত ভয়ঙ্কর, ওদের হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দাও। পুলিশ তাই-ই করে। বৃষ্টির মতো গুলি করে। নির্বিচারে মানুষ মারে। যাদের অধিকাংশই ছাত্র। অরুণ প্রাতের তরুণ দল। রক্তে ভেসে যায় পিচঢালা পথ। কিন্তু তাতে রাশেদরা বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না। বরং বিদ্রোহের বারুদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সাদা এপ্রোন পরা ছেলে-মেয়েদের সারিতে যোগ হয় আমজনতার ঢল। বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশে।
দুই.
ভ্যান ভর্তি লাশ দেখে নাঈমের মাথা বিগড়ে যায়। মনে মনে ভাবে, একটা কিছু করা দরকার। কিন্তু সে কী করবে? সে তো এখনো ছোট! ক্লাস এইটে পড়ে মাত্র। ওর আম্মু কি মিছিলে যেতে দেবে?
নাঈম বন্ধুদের ফোন করে বাসায় ডাকে। পাশের বাসার রাকিব ভাইয়াকেও আসতে বলেছে। তিনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় সবাই এলো। নাঈম তাদের বললো, দেশের পরিস্থিতি ভালো না। পুলিশ পাখির মতো মানুষ মারছে। আমাদের কিছু করা দরকার।
তার কথা শুনে হাসিব বললো, আমরা আর কী করবো? আমরা তো বয়সে ছোট। পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবো না।
নাঈম তাকে বলে, আমরা বয়সে ছোট ঠিকই। কিন্তু অতটাও ছোট না। আমাদের চেয়েও অনেক কম বয়সের যোদ্ধারাও বিপ্লব ঘটিয়েছেন। ইতিহাসে আজও তাদের নাম সোনার হরফে লেখা আছে। তোমরা কি ‘মাআজ ও মুআজ’র কাহিনি শুনেছো?
বন্ধুরা বললো— না, কারা তারা? আমরা তাদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
নাঈম তাদের পরিচয় তুলে ধরে— তারা ছিলো দুই ভাই। মাআজ ও মুআজ। বয়স, দশ বা বারো বছর হবে। ওই বয়সেই বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং আবু জাহেলের মতো শত্রুকে জাহান্নামে পাঠিয়েছেন।
নাঈম বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলে— মনে রাখবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বয়স বা সংখ্যা বিবেচ্য নয়। নিয়ত শুদ্ধ হলে বিজয় সুনিশ্চিত।
নাঈমের ঈমান জাগানিয়া কথাগুলো শুনে রাকিব অভিভূত হয়। সে নাঈমের কাঁধ চাপড়ে বললো, মাশাআল্লাহ। তুমি খুব দামি কথা বলেছো। তোমার এই উদ্দীপনা দেখে আমি সত্যি অভিভূত।
তিনি আরও বললেন, ‘আগামীকাল আমাদের ক্যাম্পাস থেকে একটি মিছিল বের হবে। তোমরা চাইলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারো। তবে হ্যাঁ, সবার আগে নিজের সেফটির গুরুত্ব দিতে হবে। এ কারণে সাথে ছোট একটা ব্যাগ রাখবে। পানির বোতল, শুকনো খাবার আর একটা লাইটারও রাখবে। মিছিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়বে। তখন লাইটার জ্বালিয়ে চেহারার সামনে ধরবে। তাতে কষ্ট কম হবে। জুতা হিসেবে অবশ্যই বুট বা কেডস পরবে। তাহলে দৌড়াতে সুবিধা হবে।
তিন.
২৩ জুলাই। যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারের সামনে।
নাঈম ও তার বন্ধুরা মিছিল নিয়ে আসে। বয়সে ছোট হওয়ায় পুলিশ তাদের গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছে, দু-একটা রাবার বুলেট ছুঁড়লেই পালিয়ে যাবে।
মজার ব্যাপার হলো, তাদের পেছনেই ছিলো বিক্ষুব্ধ জনতার উত্তাল সমুদ্র।
পুলিশ যেই রাবার বুলেট ছুড়লো, অমনিই ছাত্রজনতা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমানে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে।
এ যেন আরেক আবাবিল বাহিনী। ছোট ছোট পাথরকণার আঘাতেই পুলিশ বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। এই সুযোগে নাঈম টোল প্লাজার কাছে চলে যায়। ব্যাগ থেকে রাকিবের দেওয়া পেট্রোলের বোতলটা বের করে। তারপর বোতল থেকে গোলাপ জলের মতো পেট্রল ছিটাতে থাকে। সে খুবই অবাক হলো— পেট্রল ছিটাতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে না। বরং বুকের ভেতর যেন এক অদ্ভুত আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। সে পকেট থেকে লাইটারটা বের করলো। রাকিব ভাইয়ের দেওয়া লাইটার। নীল রঙের। গায়ে লেখা ‘বিজয় আসবেই’।
নাঈম একবার আকাশের দিকে তাকালো। ২৩ জুলাইয়ের আকাশ। কোথাও কোনো মেঘ নেই। শুধু কালো ধোঁয়া। যেন পুরো শহরটাই শোকের ছায়ায় ঢেকে গেছে।
নাঈম বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের গল্প পড়ে জেনেছে— ৭১ এ মুক্তিযোদ্ধারা কালভার্ট-ব্রিজ ভেঙে পাকিস্তানি সেনাদের বিপাকে ফেলেছিলেন। নাঈমও টায়ারে আগুন লাগিয়ে পুলিশের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে চায়। সে আর দেরি করে না। হাতে থাকা নীল রঙের লাইটারের বোতামে চাপ দেয়। মুহূর্তেই ছোট্ট একটা শিখা বেরিয়ে আসে। সেই আগুনেই ভেসে ওঠে হাজারো রাশেদের মুখ। জুলাইয়ের সব স্বপ্ন।
টোল প্লাজা মুহূর্তেই দাবানলে পরিণত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে যাবে। তা দেখে পুলিশ ঘাবড়ে যায়। তারা দৌড়ে থানার ভেতর ঢুকে পড়ে।
চার.
রাত ২:৩০।
দরজায় অনবরত ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। নাঈমের মায়ের বুঝতে বাকি নেই— পুলিশ এসেছে। কিন্তু ছেলেকে কীভাবে বাঁচাবেন তিনি? এ বাসায় এমন কোনো গোপন দরজা-জানালা নেই, যা দিয়ে ছেলেকে বাইরে বের করে দেবেন। এক ছেলেকে তো হারিয়েছেন। এখন কি শেষ অবলম্বনকেও হারাতে হবে?
তিনি জানালার কাচ ভাঙার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে ওরা দরজা ভেঙে ফেলে। কালো পোশাক পরা কিছু লোক ঘরের ভেতর হামলে পড়ে। তাদের একজন নাঈমকে থাপ্পড় দিয়ে বলে, পুলিশের গায়ে হাত তুলিস? সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল করিস? দেশের সম্পদ পুড়িয়ে দিস? এখন তোর শরীরে আগুন দেবো।
এই বলে লোকটা নাঈমকে সমানে কিল-ঘুষি মারতে থাকে।
একাধিক আঘাতে নাঈমের মুখ থেঁতলে গেছে। নাক দিয়ে কলকল করে রক্ত ঝরছে। তাও সে মাথা নত করে না। বরং বুক টান করে বলে, বেশ করেছি। ওরা আমার ভাইকে মারলো কেনো?
প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬



