বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ স্মরণে

১.
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ চলে গেলেন আমাদের অভিভাবক, সর্বোপরি দেশের একজন অভিভাবক সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ। ময়মনসিংহের দাপুনিয়ায় এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সফল চিকিৎসক।
বিচারপতি রউফ সাহেবের সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় হয় যখন তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে ১৯৯২ সালে আমার সরাসরি পরিচয় হয়। আমরা তখন ‘নবী দিবসের বর্ণাঢ্য শিশুমেলা’ আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁকে আমরা চিন্তা করেছিলাম। এর আগের নবী দিবসের শিশুমেলায় দেশের বিভিন্ন মন্ত্রী, তৎকালীন স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। সেবছর আমরা অনুষ্ঠানে বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ ভাইয়াকে আনার সিদ্ধান্ত নিই। সে মোতাবেক অফিসের পিএস এর সাথে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎকারের আবেদন করি। এসময় শিশুমেলার বিরাট আয়োজন নিয়ে সকাল থেকে সারাদিন আমরা ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু তিনি এমন একদিন সাক্ষাৎকারের জন্য সময় দিলেন, যেদিন অফিসে আমি ছাড়া আর কেউই নেই। বাধ্য হয়ে নির্ধারিত সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অফিসে আমি একাই হাজির হয়ে যাই। আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আমাকে কক্ষে ডেকে নেন। আমি তাঁকে ফুলকুঁড়ি আসরের সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরীর সালাম পৌঁছালাম। আলাপ পরিচয় হলো। এরপর তিনি জানতে চাইলেন কেন তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমরা চিন্তা করছি। আমি বললাম, আমরা এমন এক নবীর ব্যাপারে মেলা আয়োজন করছি, যিনি সকলের জন্য রহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে এসেছেন। এ অনুষ্ঠানের মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্যের সাথে মিলিয়ে এমন একজনকে অতিথি হিসেবে চাচ্ছি, যিনি নবীর আদর্শে জীবন পরিচালনা করেন। তার মধ্যে আপনি অন্যতম। তিনি মুচকি হেসে দিলেন। তারপর জানতে চাইলেন, বলতো বর্তমান বিশ্বে কোন জিনিসের সবচেয়ে বেশি অভাব রয়েছে? আমি একটু চিন্তা করে বললাম, আসলে চরিত্রের অভাব। ভালো চরিত্রের অধিকারী আমরা হতে পারিনি। তিনি হেসে বললেন, যথার্থ বলেছো। চরিত্র গঠন যেই কিতাব করবে, তাকে তো আমরা মর্যাদার সাথে উঁচু স্থানে গিলাফ দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আল্লাহর দেয়া এ কিতাবকে আমরা এতো বেশি মর্যাদা দিয়ে ফেলেছি যে, তার কাছে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে যায় আমাদের জন্য।
এরপর তিনি আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানলেন এবং অনুষ্ঠানে আসার সম্মতি দিলেন। তাঁর সম্মতি নিয়ে খুশিমনে ফিরে এলাম এবং আয়োজনে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে পেয়ে আমরা সবাই অত্যন্ত খুশি হলাম।
এরপরে তাঁকে আমরা আরও একটা অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছিলাম। সেখানেও আমরা তাঁর থেকে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ ও শিশুতোষ বক্তব্য পেয়েছিলাম।
শিশুদের সাথে ভাব বিনিময় করতে সকলে পেরে উঠেন না। এতো বড় মাপের মানুষ তিনি, অথচ বেশ সহজেই মিশে যেতে পেরেছিলেন শিশুদের সাথে; কথাও বলেছিলেন শিশুদের ভাষায়। এতো সুশৃঙ্খল আয়োজন দেখে তিনি বেশ খুশি হলেন, প্রাণখুলে ফুলকুঁড়ি আসরের প্রশংসা করলেন।

এভাবেই আমাদের সাথে তাঁর সম্পর্কের সেতুবন্ধন হলো।
২.

উনি যেদিন বিচারপতি হিসেবে অবসরে গেলেন, সেদিন নিজেই ফোন দিয়ে সন্ধ্যায় আমাদের কয়েকজনকে তাঁর বাসায় যেতে বললেন। আমরা ফুলকুঁড়ির পক্ষ থেকে আট-দশজন সন্ধ্যার মধ্যে তার বাসায় গেলাম।
পরিচয়পর্ব শেষে তিনি আমাদের সাথে গল্প শুরু করলেন। এ গল্পের যেন শেষ নেই; রাত ১১টা অবধি গল্প করলেন আমাদের সাথে। তাঁর জীবনের বেড়ে ওঠা, বিচারপতি হওয়াসহ কর্মজীবনের বিভিন্ন গল্প শেয়ার করলেন। এর মাঝে অনেক গুণীজন, তাঁর সহকর্মী, বিচারপতিবৃন্দ ফোন দিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি কারো ফোনই রিসিভ করেননি। তার ছেলে বেশ কয়েকবার এসে ফোনের কথা বললে তিনি তাকে বললেন, তুমি সকলের নাম লিখে রেখো, আমি পরে কথা বলবো।

সেদিনই আমরা অত্যন্ত আগ্রহভরে তাঁকে ফুলকুঁড়ির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আবেদন জানালাম। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। তবে এখন সম্পৃক্ত হবো না। আমার এখন প্রথম কাজ হলো আমার একটা ঠিকানা গড়ে তোলা।
এরপর বছর গড়ায়, কিন্তু তাঁকে আমরা ফুলকুঁড়ির সাথে সম্পৃক্ত করতে পারিনি। পরবর্তীতে তাঁকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুলকুঁড়ি আসরের সভাপতি নির্বাচিত করি। তিনি সানন্দে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি সভাপতি হওয়ার পর আমাদের একটা দুশ্চিন্তা ছিলো, তাঁকে আমরা ভাইয়া বলতে পারবো কি না? কারণ এর আগে আমরা ছোট-বড় সবাই ফুলকুঁড়ির সভাপতি সানাউল্লাহ নুরী ভাইকে ভাই বলতাম। কিন্তু যে ব্যক্তিকে সকলেই স্যার বলে, তাকে কীভাবে ভাইয়া বলবো, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে পড়েছিলাম আমরা।
তাঁর সাথে আমাদের প্রথম বৈঠকেই বিষয়টি তুলে ধরলাম। তিনি হেসে দিলেন। বললেন, তোমরা যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো, সেভাবেই ডাকো। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। অবশ্য অনেক সময় আমরা বিব্রতও হয়েছি। অনেক গুণী ব্যক্তি তাঁকে স্যার বলছেন, অথচ তাঁদের সামনেই আমরা তাঁকে ভাইয়া বলছি। এটা আমাদের একটা তৃপ্তির জায়গাও ছিলো বটে।

এ মানুষটিকে আমরা আমাদের অভিভাবক হিসেবেই পেয়েছি। তাঁর জ্ঞানের পরিধি নিয়ে বলতে গেলে- তিনি ছিলেন একটি চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া। যে কোনো বিষয়ে, চাই তা সমাজ হোক, খেলাধুলা কিংবা ধর্ম হোক- আপডেট সবকিছু তিনি বলতে পারতেন। অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। অনেকে ধর্ম নিয়ে বেশি জানে, কেউ বা বিজ্ঞান নিয়ে, কেউ বা সমাজ নিয়ে বেশি জানে। কিন্তু তিনি ছিলেন সবকিছুতেই পারদর্শী। তাঁর কাছে প্রশ্ন করে উত্তর পায়নি, এমন বোধহয় কেউ নেই। এ চলমান বিশ্বকোষটিকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

৩.
তিনি প্রচুর পরিশ্রম করতে পারতেন। ফুলকুঁড়ির অনুষ্ঠানগুলোতে সকালে আসতেন, অনুষ্ঠান শেষ করে একেবারে রাতে বাসায় ফিরতেন। এ বয়সে এতো পরিশ্রম করতে পারা একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিলো। রোভারে ফুলকুঁড়ির ক্যাম্পে যেতে তিনি ভোর ৪টায় উঠে রওনা দিতেন, এমনকি রাতও যাপন করেছেন সেখানে। এতো বড়মাপের একজন মানুষ আমাদের সাথে ক্যাম্পে অবস্থান করতেন, রাত যাপন করতেন, তা সত্যিই আমাদের জন্য অনেক বড়ো পাওয়া।
বিগত ২৫বছর তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোনো অনুষ্ঠানেই তিনি সম্ভবত অনুপস্থিত ছিলেন না। অন্যান্য অনুষ্ঠানের শিডিউল থাকলেও সেগুলো বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে ফুলকুঁড়ির অনুষ্ঠানে চলে আসতেন। ফুলকুঁড়ি তিনি এতোটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, কোনো সংগঠকের বিয়ে, কারো জানাজা কিংবা যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠানে আমরা তাঁকে দাওয়াত দিয়েছি, অথচ তিনি উপস্থিত হননি, এরকমটা খুব কমই হয়েছে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন যোগ দিতে।
তিনি যখন যে জেলায় যেতেন, সেখানে গিয়েই স্থানীয় সংগঠক, উপদেষ্টা, অভিভাবকদের সাথে মোলাকাত করতেন, মতবিনিময় করতেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করে ফুলকুঁড়ি আসরের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরতেন। ফুলকুঁড়ির প্রতি তাঁর ভালোবাসা, অনুভূতি দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে যেতো।
আমি তিনবার তাঁর সাথে কক্সবাজারে অনুষ্ঠানে গিয়েছি। সারাদিন অনুষ্ঠান শেষে রাতে আবার ফুলকুঁড়িদের বাসায়ও যেতেন। কক্সবাজারে এক খুদে বিজ্ঞানী ছিলো। তার বিজ্ঞান প্রজেক্ট সে সময় জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলো। তার পিতামাতা এসে ভাইয়াকে বাসায় দাওয়াত দেয়ামাত্রই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। অনুষ্ঠান শেষ করে রাত ৮টায় আমরা তাদের বাসায় যাই। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তার বাসায় ছিলাম আমরা। ভাইয়ার সাথে আমরা যারা গিয়েছিলাম, সারাদিনের পরিশ্রমের কারণে আমাদের মাঝে ক্লান্তির ভাব চলে আসলেও ভাইয়া তার সাথে প্রাণবন্ত আলোচনা করছিলেন, তার ভবিষ্যৎ প্রজেক্ট নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তার পরিবারের সাথে গল্পগুজব করছিলেন। ফুলকুঁড়ির জন্য এভাবেই তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন, অথচ তাঁর বয়স তখন আশির ঘরে।

বিস্ময়কর ব্যাপার ছিলো, এ বয়সেও তার তেমন কোনো বড় অসুস্থতা ছিলো না। শারীরিকভাবে বেশ সুস্থ ছিলেন তিনি। এ বয়সেও একাধারে বেশ কয়েকদিন রিচ ফুড খেয়েও আল্লাহর মেহেরবানীতে তিনি অসুস্থ হতেন না।
তিনি ও তাঁর পরিবারের সাথে ৩০/৩৫জনের একটা দলসহ কুয়াকাটায় গিয়েছিলাম একবার। পরিবারের সকলকে নিয়ে, আমাদেরকে নিয়ে সমূদ্রের পাড়ে বেড়াতে, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখাতে নিয়ে বের হতেন তিনি। তিনি ডাব খেতে পছন্দ করতেন। সমূদ্রতটে তিনি আমাদের সকলকে ডাব খাইয়েছিলেন। আমাদের সকলের জন্য সুখের স্মৃতি ছিলো এটি।
তাঁর সাথে আমরা বেশ কয়েকটি নৌবিহার করেছি। এসব ভ্রমণেও তিনি পরিবারের খোঁজ রাখতেন। সুযোগ থাকলে পরিবারের সদস্যদেরও এসব ভ্রমণে যুক্ত করাতেন। পরিবার এবং বাইরের জীবনের চমৎকার সমন্বয় ছিলো তাঁর জীবনে।
২০১২ সালে তাঁর সাথে আমি ওমরা পালন করেছি। ওমরার প্রতিটি কার্যক্রমের আগে তিনি আমাদের ব্রিফ প্রদান করতেন, এরপর সঙ্গে করে নিয়ে বের হতেন। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, কিন্তু তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিলো না। অনেকসময় আমরা আসরের নামাজ হেরেম শরীফে পড়তে যেতে আগ্রহী না হলেও তিনি সবার আগে প্রস্তুত হয়ে যেতেন। তখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যেতাম। ওমরায় গিয়ে জিয়ারত ও ভ্রমণে আমরা যেখানেই যেতাম সে স্থানের ব্যাপারে তিনি আমাদেরকে একটা ব্রিফিং দিতেন। ভ্রমণের সাথে সাথে তাঁর ব্রিফিংএ আমরা জ্ঞানগতভাবে সমৃদ্ধ হয়েছি।
দুমাস অন্তর ফুলকুঁড়ি আসরের উপদেষ্টা মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাঁর আতিথেয়তা ও আপ্যায়ন দেখে পুলকিত হতাম। মৌসুম উপযোগী খাবার খাওয়াতেন তিনি। তাঁর মেহমানদারি ছিলো চমৎকার। নিজেও খেতেন, আমাদেরকেও আপ্যায়ন করাতেন। আনন্দের সাথে খাবার গ্রহণ করতাম আমরা।

একটি স্বেচ্ছাসেবী শিশুসংগঠন হিসেবে ফুলকুঁড়ির জন্য অর্থনৈতিক সমস্যা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অনুষ্ঠানাদি আয়োজন করা, সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ করা দুরূহ কাজই বটে। আমাদের আয়ের উৎস মূলত শিশুদের মাসিক চাঁদা, উপদেষ্টা-শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাসিক অনুদান। তিনি যোগ করলেন সেবা ব্যাংক নামে সার্বজনীন একটি ব্যাংক। সেবা ব্যাংকে প্রত্যেক ফুলকুঁড়ি, উপদেষ্টা-শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিদিন কিছু অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে এবং মাস শেষে হিসাব করে জমা দেয়। সেবা ব্যাংক বর্তমানে একটি বিশাল কার্যক্রম। ফুলকুঁড়ি আসরের পথচলায়, বিশেষত শিশুদের বিকাশে সেবা ব্যাংক বিশাল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

ফুলকুঁড়ি পত্রিকা নিয়ে বিশেষ চিন্তা ছিলো। পত্রিকাটিকে কীভাবে আরও বেশি সার্বজনীন করা যায়, আরও শিশুতোষ কীভাবে করা যায় এ নিয়ে তাঁর বিশেষ ভাবনা ছিলো। সার্কুলেশন বাড়ানো নিয়ে তিনি বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। তিনি এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন, যেন প্রতিটি ফুলকুঁড়ি একটি করে পত্রিকা হাতে পায় এবং গ্রাহক হতে পারে। পত্রিকার কলেবর বাড়ানো নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিলো লক্ষণীয়।

তাঁর স্বপ্ন ছিলো ফুলকুঁড়ি আসরের একটি স্থায়ী অফিস হবে। এজন্য তিনি সকাল ৭টা/৮টায় রওনা দিয়ে আমাদের গাজীপুর, সাভার, কেরাণীগঞ্জ চষে বেড়িয়েছেন পছন্দসই একটুকরো জমির জন্য, যেখানে ফুলকুঁড়ির বড় একটি মাঠ থাকবে, স্থাপনা থাকবে- যেখানে আমরা ক্যাম্প করতে পারি। যদিও তাঁর সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গিয়েছে। ফুলকুঁড়ির নিজস্ব ঠিকানা হয়েছে, কিন্তু তাঁর বৃহৎ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি।
এই প্রথম ঈদ আমরা অতিবাহিত করলাম, যে ঈদে তাঁর সাথে আমরা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারিনি। বিগত ২৫ বছরে এমন কোনো ঈদ আসেনি, যেদিন তাঁর সাথে আমাদের কথা হয়নি। শুভেচ্ছা জানাতে দেরি হলে তিনি নিজেই আমাদের ফোন করতেন। আফসোস, আর কোনো ঈদে তাঁর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় হবে না।

৪.
তিনি একজন সাহসী মানুষ ছিলেন। একটি ঘটনা বলি। সেসময় তাঁর বাড়ির কাজ চলছিলো। একদিন তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য সকাল ৮টায় আমি তাঁর গুলশানের বাড়িতে যাই। বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে তিনি বের হয়ে এলেন। এসেই ধর ধর বলে চিৎকার করে রাস্তার দিকে তেড়ে গেলেন। তাঁকে দেখেই ৭/৮টা ছেলে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। ঘটনাটা ছিলো এরকম- এক ঠেলাগাড়ি সিমেন্ট আনা হচ্ছিলো তাঁর বাড়ির কাজের জন্য। সন্ত্রাসীরা গাড়ি আটকে রেখে টাকা দাবি করেছিলো। ঘটনা শুনতে পেয়ে তিনি একা বের হয়ে এসে কী পরিস্থিতি হতে পারে তার পরোয়া না করেই সন্ত্রাসীদের তাড়িয়ে দিলেন। এ বয়সের একজন মানুষ থেকে এতো সাহসিকতা কল্পনা করা যায় না।
তাঁর সাথে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয় ফুলকুঁড়ির সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে। অনুষ্ঠানের কিছুদিন পরেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর হাসপাতালেই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। হাসপাতালে আমি গিয়েছি; কিন্তু আইসিইউতে সাক্ষাতের সুযোগ ছিলো না। স্ক্রিনে দেখতাম হাত-পা নাড়ছেন। আফসোস রয়ে গেলো, যার সাথে আমার দীর্ঘ পথচলা, জীবনের শেষ মুহূর্তে আমি তাঁর পাশে থাকতে পারিনি।
বর্তমানে তিনি শুয়ে আছেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে, মাটির নিচে পরম প্রশান্তিতে। তাঁর পরিবার যেমন একজন অভিভাবক হারিয়েছেন, আমরাও একজন অভিভাবক হারিয়েছি। যে সেবা আমরা তাঁর থেকে নিয়েছি, মহান রবের কাছে তাঁর জন্য সর্বোচ্চ প্রতিদান প্রত্যাশা করছি। আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য জান্নাত প্রত্যাশা করছি। তাঁর শূন্যস্থান কে পূরণ করবে আমরা এখনও জানি না। ফুলকুঁড়িকে নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, তা বাস্তবায়ন করা এখন আমাদের দায়িত্ব।
মহান আল্লাহ তাঁর সকল ভালো কাজ কবুল করুন, এবং ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন- এই প্রার্থনা।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫