পাবনা জিলা স্কুল

পাবনা জিলা স্কুল পাবনা জেলার প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও স্বনামধন্য বিদ্যালয়। পাবনা জিলা স্কুল রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার পাবনা সদর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে গোপালপুর মৌজার আব্দুল হামিদ রোডে অবস্থিত। তৃতীয় শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম চলমান এই বিদ্যালয়ে দুইটি শিফট রয়েছে- প্রভাতি শিফট ও দিবা শিফট।
পাবনা জিলা স্কুল একশ সত্তর বছরেরও বেশি প্রাচীন একটি বিদ্যাপীঠ। অতীতের নানা ইতিকথা, গৌরব আর ঐতিহ্যের ধারক এ প্রতিষ্ঠানটি আজও অম্লান। ১৮৩৬ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে একটি অ্যাংলো-ভার্নাকুলার বিদ্যালয় হিসেবে “হার্ডিঞ্জ স্কুল” নামে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। বাবু রাধাগোবিন্দ মিত্রের সহায়তায় বাবু দিগম্বর সাহা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় বাবু রামচন্দ্র নন্দী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুরুতে বিদ্যালয়টি শহরের পূর্ব প্রান্তে রাঘবপুরে অবস্থিত ছিল, পরে এটি গোপালপুরে আব্দুল হামিদ খান রোডে স্থানান্তরিত হয়। ১৮৫৩ সালের ১ নভেম্বর এটিকে সরকারিকরণ করা হয় এবং সরকারি পাবলিক বিদ্যালয় হিসেবে পাবনা জিলা স্কুল নামে প্রতিষ্ঠা পায়। সে সময়ে গৌর নারায়ণ পাবনা জিলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। নুরুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার পাবনা। যেটি ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত গেজেটিয়ারের বাংলা অনুবাদ। জিলা স্কুল সম্পর্কে উক্ত গেজেটিয়ারের বিবরণ হলো – পাবনা জিলা স্কুল জেলার অন্যতম মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এটি সরকারি বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি কবে স্থাপিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে দলিল দৃষ্টে মনে হয় যে, বিদ্যালয়টি প্রথমে স্বর্গীয় বাবু দিগম্বর সাহা কর্তৃক এ্যাংলো ভার্নাকুলার মূল হিসেবে ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে স্থাপিত হয়। প্রথমে বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় শহরের পূর্ব প্রান্তে রামনপুর মৌজায়। পরে আব্দুল হামিদ রোডের মনোরম পরিবেশে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয়। প্রতিবছর বিদ্যালয়টিতে তৃতীয় শ্রেণিতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। প্রায় ৬০০০ এর বেশি আগ্রহী শিক্ষার্থীর মধ্যে থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত মাত্র ২৪০ জন ছাত্রকে ভর্তি করা হয়। পূর্বে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে ছাত্র ভর্তি ও আনুষঙ্গিক ভর্তি প্রক্রিয়াতে কিছু সময় লাগলেও বর্তমানে অনলাইন আবেদনের পদ্ধতি ব্যবহার করায় ভর্তি প্রক্রিয়া আগের থেকে অনেক দ্রুত এবং সহজতর হয়েছে।

একাডেমিক কার্যক্রম: পাবনা জিলা স্কুলে বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য পাকা ভবনের সংখ্যা ছয়টি। বিদ্যালয়টি ১৯৯১ সাল থেকে দুইটি শিফটে বিভক্ত। উভয় শিফট মিলে ছাত্রসংখ্যা ১৯৯৪ জন। প্রভাতি শিফটে ক্লাস সকাল ৭টা ১৫ মিনিট থেকে ১১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এবং দিবা শিফটে ক্লাস দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ৪টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। উভয় শিফটেই তৃতীয় ঘণ্টা পর ২০ মিনিটের টিফিন বিরতি দেওয়া হয় যেখানে পাবনা শহরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো টিফিন সরবরাহ করে থাকে। প্রতি শিফটে ২৫ জন করে সর্বমোট ৫০ জন সহকারী শিক্ষক পাঠদানে নিয়োজিত ও দুইজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও একজন প্রধান শিক্ষকের পাঠদান ও স্কুল পরিচালনা এবং অফিস কর্মকর্তা-সহকারী, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, লাইব্রেরিয়ান, প্রহরী, পরিষ্কারকর্মীসহ সকলের সার্বিক প্রচেষ্টায় স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়াও স্কুল কেবিনেট নির্বাচনে ছাত্রদের ভোটে বিজয়ী প্রতিনিধি ছাত্ররা স্কুলের নানা বিষয়ক মানোন্নয়নে কাজ করে। লাইব্রেরিতে বিভিন্ন বিষয়ের পুস্তকসংখ্যা পাঁচ সহস্রাধিক। দুটি কম্পিউটার ল্যাব, দুটি মাল্টিমিডিয়া স্থায়ী ক্লাস রুম, তিনটি বিজ্ঞানাগারসহ প্রতিটি ক্লাসরুমে প্রজেক্টর নিয়ে ক্লাস করার জন্য উপযুক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগের ব্যবস্থা আছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন মোতাবেক অত্র বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ছাত্র ভর্তি করা হয়। নিজস্ব সিলেবাসে পাঠদান, ছাত্রদের ক্লাস ডায়রি লিখন, যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন, ষান্মাসিক নির্বাচনী ও বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।

সহপাঠ কার্যক্রম: ডাঃ ফজলে রাব্বী বিজ্ঞান ক্লাব, পাবনা জিলা স্কুল (এফআরএসসি)
নামকরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই স্কুলেরই কৃতি শিক্ষার্থী শহিদ ডা. ফজলে রাব্বীর নামানুসারে একটি বিজ্ঞান ক্লাব রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ প্রতিষ্ঠিত ডা. ফজলে রাব্বী বিজ্ঞান ক্লাব, পাবনা জিলা স্কুলে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা উৎসাহী ‍শিক্ষার্থীদের নিয়ে অসাধারণ সব কোর্স সেমিনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

এফআরএসসি ম্যাথম্যাটিকস কমিউনিটি, পাবনা জিলা স্কুল
ডা. ফজলে রাব্বী বিজ্ঞান ক্লাবের নামে গণিত বিষয়ক জ্ঞানচর্চার জন্য ১ অক্টোবর ২০২০ সালে যাত্রা শুরু হয় এফআরএসসি ম্যাথম্যাটিকস কমিউনিটি, পাবনা জিলা স্কুলের। এই ক্লাবের মূল লক্ষ্য গণিতচর্চায় শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে তোলা এবং গণিতে তাদের প্রভিতার বিকাশ ও প্রকাশ এবং গণিত অলিম্পিয়াড সম্পর্কিত নানা তথ্য সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ দেয়া। এই ক্লাবের নীতিবাক্য ‘Dream is High’।
এছাড়া ডিবেট ক্লাব, স্কাউট টিমের মতো রয়েছে সেবামূলক ও জ্ঞানচর্চার সংগঠন।
স্কুল পোশাক: সাদা শার্ট, খাকি প্যান্ট, সাদা মোজা ও সাদা জুতা প্রভাতি শিফটের লাল শোল্ডার ও দিবা শিফটের নীল সোল্ডার শার্টে পকেটে নির্ধারিত মনোগ্রাম শীতকালে নেভি-ব্লু সোয়েটার (‘V’ গলা)

উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী
১৭০ বছরেরও অধিক সময়ের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আজ দুই শিফটের পাবনা জিলা স্কুল দুই সহস্রাধিক শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের মিলনমেলা। জন্মলগ্ন থেকে পাবনা জিলা স্কুল দেশ ও জাতিকে উপহার দিয়েছে অগণিত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, বি.সি.এস. কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, আইনবিদ, মন্ত্রী, জাতীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকর্মী। যাঁরা দেশে-বিদেশে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ও ভাস্বর। স্মরণীয় ও বরণীয় এ কৃতি সন্তানেরাই পাবনা জিলা স্কুলের গৌরব। বিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র যারা পরবর্তীতে তাঁদের মেধার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় তাঁরা হলেন : বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্রয়াত স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রয়াত মি.আর.সি.দত্ত, বাঙালিদের মধ্যে প্রথম ডিভিশন-ল কমিশনার প্রয়াত মি.জি.এন.রায়,কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক, প্রয়াত মি.ডি.এন.রায়, রাজশাহী বিভাগের কমিশনার, প্রয়াত বনমালী রায় বাহাদুর, তাড়াশের জমিদার ম.জি.পি.মজুমদার, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রয়াত স্টিস এস.সি.লাহিঙী, কলকাতা হাইকোর্ট, উপাচার্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফুল্লকুমার সরকার, বাঙালি লেখক,শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বী, প্রয়াত ডা.মাজহার আলী কাদেরী সি.এস.পি. হিসেবে: মো. সাঈদ আলী, মো. আব্দুস সামাদ, মো. আব্দুস সালাম, মনজুর আহম্মেদ, ড. রেজা হোসেন, ড. ফরহাদ হাসান, ড. আমির উদ্দিন, আবু সাইয়িদ, বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদ, প্রয়াত আবু হেনা মোস্তফা কামাল, প্রফেসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, প্রয়াত কামাল লোহানী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক।

বিদ্যালয়ের সাধারণ তথ্য

স্কুলের নাম : পাবনা জিলা স্কুল
প্রতিষ্ঠাকাল : ১৮৫৩ সাল (১ নভেম্বর)
ঠিকানা : আব্দুল হামিদ রোড, গোপালপুর, পাবনা
পোস্ট অফিস : পাবনা
পোস্ট কোড : ৬৬০০
উপজেলা : পাবনা সদর
জেলা : পাবনা
বিভাগ : রাজশাহী
ফোন : ০২ ৫৮৮৮ ৪৫৭২৫
প্রধান শিক্ষক : তুষার কুমার দাশ (ভারপ্রাপ্ত)
শিক্ষক সংখ্যা : ৫০ জন
মোট শিক্ষার্থী : ১৯৯৪ জন (বর্তমানে)
বিদ্যালয়ের ধরণ : বালক
শ্রেণি কার্যক্রম : তৃতীয় থেকে দশম
বিদ্যালয়ের শিফট : প্রভাতী ও দিবা
মোট জমির পরিমাণ (একর) : ২.৯৪
ভবন সংখ্যা : ৫টি
মোট শ্রেণিকক্ষ সংখ্যা : ২১টি
বিজ্ঞানাগার এর জন্য কক্ষ সংখ্যা : ৩টি
পাঠাগার এর জন্য কক্ষ সংখ্যা : ১টি
অডিটোরিয়াম আছে কি না : নাই
সীমানা প্রাচীর আছে কি না : আছে
ছাত্রাবাস : আছে
খেলার মাঠ : আছে।

মাসিক ফুলকুঁড়ির সাথে কথা হয় স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন আব্দুল্লাহ এর। আলোচনার চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো-
মাসিক ফুলকুঁড়ি : এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে তোমার অনুভূতি কেমন?
মাহিন আব্দুল্লাহ : উত্তরবঙ্গ ও পাবনা জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে ভর্তি হওয়া অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হতে পেরে আমি গর্বিত।
মাসিক ফুলকুঁড়ি : তোমার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেমন ক্লাস নেন অথবা পাঠদান পদ্ধতি তোমার কেমন লাগে?
মাহিন আব্দুল্লাহ : আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ অনেক অভিজ্ঞ ও আন্তরিক। স্যারেরা পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, জীবনমুখী বিভিন্ন উপদেশ প্রদান করেন । এছাড়াও কো- কারিকুলাম কার্যক্রম, বিভিন্ন অলিম্পিয়াড ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষকগণ আমাদের উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করেন ।
মাসিক ফুলকুঁড়ি : বিদ্যালয়ের কোন বিষয়টি তোমার খুব ভালো লাগে এবং কেনো?
মাহিন আব্দুল্লাহ : আমাদের বিদ্যালয়ের পাঠাগারটি অনেক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। পাঠাগারের অসংখ্য গল্প, উপন্যাস, ছড়া-কবিতা, কমিকস, জীবনী, গণিত-বিজ্ঞান বিষয়ক দেশি-বিদেশি বই-ম্যাগাজিনের মধ্যে মগ্ন হতে সবচেয়ে ভালো লাগে। এছাড়া বার্ষিক বনভোজন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোও খুব উপভোগ করি ।
মাসিক ফুলকুঁড়ি : বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিষয়ে তোমার মন্তব্য কী?
মাহিন আব্দুল্লাহ : গত দুই বছরে নতুন শিক্ষাক্রমের সব নিয়ম – পদ্ধতি বাস্তবায়নে আমাদের শিক্ষকগণ অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
মাসিক ফুলকুঁড়ি : বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি আরো উন্নত করতে তোমার পরামর্শ কি?
মাহিন আব্দুল্লাহ : বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব ও বিজ্ঞানাগার গুলো সংস্করণ ও উন্নত করা হলে শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হবে।

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪