নিজকে গড়ার পথে

বন্ধুরা, আমরা সবাই জানি ঋতুর রানি মানেই শরৎকাল। শরৎকালে কাশফুলের শুভ্রতায় আর অপরূপ রঙের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে ওঠে সবুজের সমারোহে ঘেরা আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। নদীর তীরে হাওয়ায় দোল খাওয়া সাদা কাশফুলের মেলা, বিশাল নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা আর ভোরের মিষ্টি মধুর হাওয়া সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। চারপাশের এই অপরূপ সৌন্দর্য সবার মনে এক অনাবিল খুশির আমেজ সৃষ্টি করে। আর প্রকৃতির এই খুশি খুশি আমেজকে বাড়িয়ে দেয় শিশুকিশোরদের প্রাণের সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসব।
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের সবাইকে ফুলকুঁড়ি আসরের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও আন্তরিক ভালোবাসা। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে ফুলকুঁড়ি আসর তোমাদের মতো হাজারো শিশুকিশোরদের গড়ে তুলছে। অনেক শিশুকিশোর সুবাস ছড়িয়ে আসছে। বিকশিত হয়ে ফুল হয়ে ফুটে চলেছে। ফুলের কুঁড়ি যেমন একদিন প্রস্ফুটিত হয়ে চারপাশ সুবাসিত করে, তেমনি তোমরাও একদিন নিজেদের সুবাসে এই পৃথিবীকে সুশোভিত করবে।

আচ্ছা, তুমি কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছো- যে পাইলট বিশাল বিমান নিয়ে মেঘের বুক চিরে আকাশে ওড়েন, যে নির্ভীক নাবিক উত্তাল সমুদ্রের বিশাল ঢেউ জয় করে জাহাজ চালান, যে নভোচারী মহাকাশযানে চন্দ্র ভ্রমণ করেন বা বিভিন্ন গ্রহে পাড়ি জমান, যে বিজ্ঞানী তার নতুন আবিষ্কার দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন কিংবা যে কালজয়ী সাহিত্যিক তার লেখনী দিয়ে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেন তারা কি সব সময়ই এমন বড় আর সফল ছিলেন? তারা কি কখনো তোমার মতো ছোট ছিলেন না?

অবশ্যই ছিলেন! তোমার মতোই ছোট থেকে তারা বড় হয়েছেন। তারা ধুলোবালিতে খেলেছেন, স্কুলে গিয়েছেন, দুষ্টুমি করেছেন, ভুল করেছেন এবং সেই ভুল থেকে নতুন কিছু শিখেছেনও। তোমার মতোই তাদেরও মনে অনেক প্রশ্ন জাগতো, চারপাশের সবকিছু নিয়ে অনেক কিছু জানার কৌতূহল ছিল। সেই ছোট্ট শিশুটিই কিন্তু আজ স্ব-স্ব জায়গায় পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছেন।

আচ্ছা, আমি যদি আবার তোমাকে প্রশ্ন করি, এই বিশাল পৃথিবী গড়ার ক্ষেত্রে, পৃথিবীর বুকে একটি সুন্দর ও মজবুত স্থান তৈরি করার জন্য ভূমিকা রাখার মতো তুমি কি কেউ? তোমার ভেতরে কি সেই শক্তি ও সাহস আছে? তুমি এর উত্তরে কী বলবে?
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবে ‘অবশ্যই! আমারও বিশ্বকে গড়ার ভূমিকা রাখার শতভাগ সুযোগ ও যোগ্যতা রয়েছে। কারণ, প্রতিটি শিশুর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অসীম সম্ভাবনা।’
তুমি হয়তো এখন বয়সে ছোট, কিন্তু তোমার ভেতরের সম্ভাবনা এই বিশাল আকাশটার মতোই অনন্ত। তোমার ছোট ছোট চেষ্টাগুলো তোমাকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই এগুলো আঁকড়ে ধরো হাল ছেড়োনা,  চেষ্টা চালিয়ে যাও, সফল একদিন হবেই।

এখন আসো, এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য হয়তো তুমি গভীরভাবে চিন্তা করছো। তুমি হয়তো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছো, ‘আমি ভবিষ্যতে নিজের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবো।’ এই যাত্রাপথে হয়তো তুমি খুব দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে, আবার হয়তো কখনো কখনো বাঁধা আসবে, সাময়িক ব্যর্থতা আসবে। কিন্তু মনে রাখবে, কোনোভাবেই লক্ষ্য অর্জন থেকে পিছপা হওয়া যাবে না। ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়, বরং এটি নতুন করে আরও ভালোভাবে শুরু করার তোমার জন্য একটি সেরা সুযোগ।

বন্ধুরা, তোমাদের বেড়ে ওঠার এই চমৎকার সময়ে মনের গহিনে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কিছু হওয়ার যে তীব্র ইচ্ছা জাগে, তা-ই হলো তোমার স্বপ্ন। স্বপ্ন হলো সেই অমূল্য বীজ, যা থেকে একদিন সফলতার বিরাট মহীরুহ জন্ম নেয়। ছোট ছোট স্বপ্নগুলোর সফল বাস্তবায়নই তোমার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথকে সুগম করে তুলতে পারে। তুমি যদি আজই ইচ্ছে করো যে তুমি শুধু নিজেকে বা নিজের দেশকে নয়, বরং পুরো পৃথিবীটাকে সুন্দর করে গড়বে তবে তুমি তা অনায়াসেই বলতে পারো এবং করতেও পারবে।

কারণ, মনে রাখবে, তুমি শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট আলাদা দেশ, জাতি বা গোষ্ঠীর লোক নও। যেহেতু তুমি একজন শিশু, সেহেতু তুমি পুরো বিশ্বের সম্পদ, তুমি একজন এই বিশ্বের শিশু। সারা পৃথিবীর সব শিশুর মুখের হাসি আর মনের আনন্দ একই রকম। বড় বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মনীষীগণও একসময় শিশু থেকে বড় হয়ে বড় কিছু করেছেন তেমনি, তুমিও একদিন বড় হয়ে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিতে পারবেই। তোমার ভেতরেও হয়তো লুকিয়ে আছে আগামী দিনের একজন সেরা পাইলট, নাবিক, নভোচারী বা বিজ্ঞানী। অথবা এর চেয়েও ভালো কিছু।

এর জন্য সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো তোমার লক্ষ্যটা একদম ঠিক রাখা। নিজস্ব লক্ষ্য স্থির থাকলে আর তার সাথে যদি তুমি কঠোর পরিশ্রম, সততা ও অধ্যবসায় যুক্ত করো, তবে পৃথিবীর কোনো বাঁধা-ই তোমাকে থামাতে পারবে না।

তাই আর দেরি কেনো বন্ধু? আজকের এই শরতের স্নিগ্ধ সকালে দাঁড়িয়ে, এই আনন্দঘন মুহূর্তে তুমি ঠিক করে ফেলো ভবিষ্যতে এই পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তুমি ঠিক কোথায় দাঁড়াতে চাও। তুমি কোন ক্ষেত্রে তোমার মেধা ও শ্রম দিয়ে পৃথিবীর বুকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চাও, তা নির্ধারণ করে ফেলো। এরপর শুরু হোক তোমার নিরলস অধ্যবসায়। নিজেকে একজন যোগ্য, দক্ষ ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই তুমি গড়ে তুলতে পারো আগামীর সুন্দর এক পৃথিবী।

তোমার এই মহান স্বপ্নযাত্রার জন্য এখন থেকেই রইলো অনেক অনেক অগ্রিম শুভকামনা ও ভালোবাসা। এগিয়ে যাও, আগামীর সুন্দর পৃথিবী তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে! তোমার লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার এ পথে সহযাত্রী এবং পথের দিশারী হয়ে থাকবে ফুলকুঁড়ি আসর।
পরিশেষে, আবারও ফুলকুঁড়ি আসরের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে এখানেই শেষ করছি।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬