বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিপাতের পর শরৎ আসে শান্তির পরশ নিয়ে। এক স্বপ্নিল চিত্রকর্মের মতো পরিষ্কার ও নীলাভ আকাশে সাদা তুলার মতো ভেসে বেড়ায় মেঘ। বিলের জলে ফোটে শাপলা। দিগন্ত বিস্তৃত কাশফুলের শুভ্রতা। শিউলি ফুলের সাদা-কমলা পাপড়ি সুশোভিত করে, মিষ্টি সুবাসে এক ধরনের মায়াবী আবেশ তৈরি করে ভোরের বাতাসে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ধানের সোনালি আভা কৃষকের মনে আনন্দের সঞ্চার করে। দোয়েল, শ্যামা, বুলবুলির মিষ্টি কণ্ঠস্বর শরতের সকালকে এক অপার্থিব সুরে ভরিয়ে তোলে। প্রকৃতির এই আনন্দের সময়ে আমাদেরও আনন্দ আরও বেড়ে যায়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে আজকের এ সময়ে তৈরি হয়েছে আমাদের সকলের প্রিয় ফুলকুঁড়ি আসর।
‘পৃথিবীকে গড়তে হলে সবার আগে নিজকে গড়ো’ এই অনন্য স্লোগানকে সামনে রেখে জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসর ১৯৭৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। একতা, শিক্ষা, চরিত্র, স্বাস্থ্য ও সেবা এই পাঁচটি আদর্শকে সাথে নিয়ে ও পাঁচটি বিভাগীয় কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে ফুলকুঁড়ি আসর।
ফুলকুঁড়ি আসর হাঁটি হাঁটি পা পা করে একে একে পঞ্চাশে পদার্পণ করেছে। এ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের পথচলায় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ফুলকুঁড়ি আসরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইঞ্জি. আবুল ফয়েজ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক চিরশিশু সানাউল্লাহ নূরী, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক এম এ রশিদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন শাখার উপদেষ্টা সভাপতিবৃন্দকে। এবং সেইসাথে শ্রদ্ধাভরে আরও স্মরণ করছি প্রয়াত ফুলকুঁড়ি, সংগঠক, অভিভাবক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও উপদেষ্টাবৃন্দকে। এ দীর্ঘ পথচলায় যারা মালি হয়ে ফুলকুঁড়ি আসরের সাথে ছিলেন, তাদেরকে জানাই সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছোটদের বেড়ে ওঠার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের চিন্তাশীল কিছু মানুষ শিশুদের কথা চিন্তা করে ১৯৭৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ফুলকুঁড়ি আসর। গঠনের সময় এ সংগঠনের নাম ছিলো দিশারী। ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ধানমন্ডি আদর্শ কলেজে অনুষ্ঠিত সভায় দিশারীর সাথে যোগ দেয় চট্টগ্রামের ঝিঙেফুল, রাজশাহীর অরুণ প্রাতের তরুণ দল, কুমিল্লার সবুজমেলা, সিলেটের গোলাপকুঁড়ি, ফরিদপুরের সবুজসংঘ, খুলনার তরুণসংঘ, দিনাজপুরের আলোর দিশারী, নোয়াখালীর এক ঝাঁক পায়রা। আদর্শিক মিল থাকায় সংগঠনগুলো নিয়ে নাম হয় ফুলকুঁড়ি আসর।
ফুলকুঁড়ি আসরের প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন এনামুল হক মঞ্জু। পঞ্চাশ বছরের এ পথচলায় একে একে দায়িত্ব পালন করেন ২১জন প্রধান পরিচালক এবং ৪জন সহকারী প্রধান পরিচালক। আমরা সুবর্ণজয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে এ সকল ভাইয়াকে জানাই কৃতজ্ঞতা ও সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা।
ফুলকুঁড়ি আসর বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে দেশের শহর, বন্দর ও গ্রামে শিশুকিশোরদের একতাবদ্ধ করে পাঁচটি কর্মসূচির অধীনে সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের চরিত্রবান ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। যাতে তারা সবাই মিলে দেশ ও দশের সেবা করতে পারে। যারা একসময় ফুলকুঁড়ি করতেন, আজ তারা দেশের গুরুত্বপুর্ণ অনেক পদে আসীন রয়েছেন। আজ তারা চরিত্রবান, আদর্শ নাগরিক হিসেবে দেশ ও দশের সেবায় নিয়োজিত। এটি ফুলকুঁড়ি আসরের বর্তমান প্রজন্মের জন্য খুবই আনন্দের ও অনুপ্রেরণার।
আজ যখন আমরা সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি, ফুলকুঁড়ি আসর যেন শরৎকালের কাশফুলের মতোই সতেজ, স্নিগ্ধ এবং শক্তিশালী। পঞ্চাশ বছরের এই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের জন্য শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। আমাদের সামনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পথ রয়েছে, যেখানে আরও অনেক শিশুর জীবনকে আমরা আলোকিত করবো।
এই সুবর্ণজয়ন্তী আমাদের জন্য একটি নতুন সূচনা। আমরা আমাদের শিশুদের জন্য আরও উজ্জ্বল, আরও সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শরৎকালের শীতল হাওয়ায় যেমন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত থাকে, তেমনি ফুলকুঁড়ি আসরের আগামী দিনের পথচলায় থাকবে অসীম সম্ভাবনা ও সাফল্য।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



