আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশ। দেশকে আমরা ভালোবাসি। দেশতো ভালোবাসার মতোই বিষয়। সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখছি সবুজ একটি জনপদ। যেখানে রয়েছে নদীর কলতান, পাখির কাকলি, মৌমাছির গুঞ্জন। নানা রঙের ফুলের বাহার ও সৌরভের কথাও বলতে হয়। মাছে-ভাতেই তো আমরা বাঙালি। কত স্বাদের ধান, কত রকম মাছ, আর ইলিশ তো আমাদের অহংকার। পাঠ্যবই থেকে আমরা জেনেছি ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুর বৈচিত্র্যে সৌন্দর্য আছে, আছে আম-কাঁঠালের ঘ্রাণও। এমন দেশকে কি ভালো না বেসে পারা যায়?
মহান আল্লাহ এমন একটি সুন্দর দেশ আমাদের উপহার দিয়েছেন, সে জন্য তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
ছোট বড় সবাইকেই দেশ সম্পর্কে জানতে হয়। ভূগোল ও মানচিত্র সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ইতিহাস চর্চাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমাদের দেশে আমরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল দেখেছি। তখন কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাইনি। পাইনি বৈষম্যহীন সমাজ। তাইতো দেশের অধিকার সচেতন মানুষ নেমে এসেছে রাজপথে, গড়ে তুলেছে গণআন্দোলন, যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তস্নাত এই রাজপথে আমরা দেখেছি ৫২, ৬৯, ৭১।
১৯৭১-এ মহান জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছি স্বাধীন বাংলাদেশ। তবে স্বাধীন দেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসটা একরকম নয়। গত ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে মানুষ কিন্তু বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লক্ষ্যে ছাত্র জনতা আবার গর্জে ওঠে রাজপথে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসটা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে বিবেচিত হবে। অবশ্য এর সাথে আগস্ট মাসের পাঁচটি দিনও যোগ করতে হয়। তাহলে জুলাইয়ের ৩১ দিন ও আগস্টের পাঁচ দিন যোগ করলে হবে ৩৬ দিন। বাংলাদেশের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন জনগণকে সাথে নিয়ে এই ৩৬ দিনে সৃষ্টি করেছে অবাক করা এক গণঅভ্যূত্থান। যার ফলে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হলো। স্বৈরশাসকদের পরিণতি এমনই হয়। প্রশ্ন জাগে এত স্বল্প সময়ে অর্থাৎ মাত্র ৩৬ দিনে কী করে এমন পরিণতি হলো? বিশ্লেষকরা বলছেন এর কারণ হলো- দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন, ব্যাপক দুর্নীতি এবং শেষের ৩৬ দিনে অবদমন ও হত্যার মাধ্যমে রেডলাইন ক্রস।
রেডলাইন ক্রসের বড় চিত্র হলো নির্বিচার গুলিবর্ষণ। গুলিতে শুধু বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা মারা যাননি; মারা গেছেন পথচারী, দোকানদার, হকার, রিকশাচালক, শ্রমিক এমনকি ছাদে কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুরা পর্যন্ত। নির্বিচার ছররা গুলি মেরে সাধারণ মানুষের বুক ঝাঁঝরা করা কিংবা চোখ নষ্ট করে দেওয়া ঔপনিবেশিক দখলদার বাহিনীর কাজ হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এমন কাজ করতে পারে না। দেশের সংবিধান কিংবা আইন এমন বল প্রয়োগের অনুমতি দেয় না। এটি রেডলাইন ক্রসের আর একটি নির্মম উদাহরণ।
শিশুরা সবদেশেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। শিশুর নিরাপত্তা সবার আগে। প্রত্যেক পরিবারে একটি বংশ-বৃক্ষ থাকে। সেই বৃক্ষের সবচাইতে প্রিয় ফুলটি হলো শিশু। শিশু হাসলে পুরো পরিবার হাসে, শিশু কাঁদলে পুরো পরিবার কাঁদে। সেই শিশুরাই জুলাই হত্যাকাণ্ডে নির্মমভাবে প্রাণ হারালো। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশের জুলাই সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুদের মৃত্যুতে উদ্বেগ জানিয়ে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকের বলেছেন, শিশুদের সবসময় সুরক্ষিত রাখতে হবে। এটা সবার দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু আহত হয়েছে এবং অনেককে আটক করা হয়েছে। এই মৃত্যু ভয়ানক ক্ষতি। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ইউনিসেফ। ইউনিসেফ তো শিশুদের সুরক্ষার কথা বললো, বললো শিশুদের মৃত্যু এক ভয়ানক ক্ষতি। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার কি তা বোঝে বা উপলব্ধি করে? ওই শক্তি তো ক্ষমতার মোহ ও দম্ভে অন্ধ থাকে।
আমাদের শিশুরা কীভাবে নিহত হলো?
ছোট্ট শিশু রিয়া গোপ। দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল মেয়েটি। খানিক পরেই রাস্তায় সংঘর্ষ বাঁধে। বাসার সামনে শোরগোল শুনে বাবা ছুটে যান ছাদে, মেয়েকে ঘরে আনতে। মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। মুহূর্তেই ছোট্ট দেহটি ঢলে পড়ে বাবার কোলে। রক্তেভেজা মেয়েকে নিয়ে বাবা ছোটেন হাসপাতালে। রাতেই মাথায় অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচার ভালো হয়েছে বলে চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেন বাবাকে। কিন্তু মাথায় বুলেটের আঘাত কীভাবে সহ্য করবে ছোট্ট শিশু। সবাইকে কাঁদিয়ে শিশুটি চলে যায় না ফেরার দেশে। কিন্তু প্রশ্ন, স্বাধীন দেশে কেন এভাবে মৃত্যু হলো শিশুটির? ছাদে কেন গুলি আসবে? সাড়ে ছয় বছর বয়সী মেয়েটি নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকায় চারতলা বাড়িটির ছাদে খেলছিলো। এখানে তো গুলি আসার কথা নয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয় ‘গানশট ইনজুরি’। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন বাবা দীপক কুমার ঘোষ ও মা বিউটি ঘোষ। ধারণা করা হচ্ছে হেলিকপ্টার থেকে করা গুলিতে মৃত্যু হয় রিয়ার।
বুলেট বিদ্ধ হয়েছে শিশু সামির। জানালার পাশেই পড়ার টেবিল। ১৯ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মিরপুরে কাফরুল থানার সামনের সড়কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ঢুকছিলো সামিরের ঘরে। জানালা বন্ধ করতে গেলে বাইরে থেকে গুলি এসে বিদ্ধ করে শিশুটিকে। গুলিটি তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে ছিল তার চাচা মশিউর রহমান (১৭)। তার কাঁধেও গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ১১ বছরের সাফফাত সামির। শিশুটি একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো। সামিরের বাবা সাকিবুর রহমান (৩৪) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছোট চাকরি করেন। শুক্রবার সকালে তিনি পাশের বকুলতলা মাঠের কাছে ছিলেন।
হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি হচ্ছিলো দেখে বাসার দিকে রওনা দেন তিনি। এমন সময় এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে বাসায় গুলির সংবাদ পান। দ্রুত বাসায় এসে দেখেন তাঁর একমাত্র সন্তান মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সামিরকে কোলে নিয়ে ছুটে যান পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। চিকিৎসক বলেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই। নিরপরাধ শিশুদের এমন মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
নিজ দেশের মানুষের ওপর কি নির্বিচারে এভাবে গুলি করা যায়? শিশু-কিশোর ও জনতার ওপর স্বৈরশাসকের বাহিনী এবার নির্বিচার গুলি বর্ষণের যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে রেডলাইন ক্রস-এর এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সীমালঙ্ঘনের এই যে বর্বরতা, তার পরিণতি কেমন হলো? ক্ষমতা তো দূরের কথা, স্বৈরাচারী শাসককে দেশ থেকে পালাতে হলো, আর তাঁর সভাসদরাও এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কাউকে মুখ দেখাবার উপায় নেই। ‘কর্মফল’ বলে একটা কথা আছে। তাই বলতে হয়, যেমন কর্ম তেমন ফল।
গুলিতে আরো বহু শিশু নিহত হয়েছে। গণমাধ্যমে সেসব কলঙ্কজনক ঘটনার বর্ণনা লক্ষ্য করা গেছে। ছাত্র জনতাকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। নাগরিকদের ঘরে ঘরে আজ শোকের পরিবেশ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। গড়তে হবে এক গণতান্ত্রিক এবং মানবিক বাংলাদেশ। তবে এই অভিযাত্রায় শিশুদের অধিকার ও পরিগঠনের বিষয়টিকে দিতে হবে বিশেষ গুরুত্ব।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



