প্রায় পাঁচ হাজার মতান্তরে চার হাজার বছর আগে শ্যামের (বর্তমানে সিরিয়া) এক গভীর রাত। চারিদিকে নিস্তব্ধ নিথর। কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সারা নগরী। শুধু খেজুর পাতায় বাতাসে শাঁ শাঁ শব্দের জল তরঙ্গের সুর। আকাশে জিলহজ্বের সপ্তমীর চাঁদ ডুবে গেছে অনেক আগে। শুধু তারার মিটিমিটি আলো। সবার মতো আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিমও (আ.) গভীর ঘুমে মগ্ন। তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। নবীর স্বপ্ন মিথ্যা হয় না। আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে কুরবানি চাচ্ছেন। রাত শেষে ভোর হলো। সোনালি রোদের আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে সকালেই তিনি একশত উট কুরবানি করলেন। সকালের সূর্য গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। সন্ধ্যা থেকে আবারও গভীর রাত। তিনি এ রাতেও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আবারও একই স্বপ্ন দেখলেন। পরের সোনাঝরা সকালে উঠে আবারও একশত উট কুরবানি করলেন। মনে তার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আবার প্রশান্তিও। তিনি ভাবলেন এবার আল্লাহ তার কুরবানি কবুল করেছেন। তৃতীয় রাতে আবারও তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু সে রাতও তিনি আবারও স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন। আল্লাহ তাকে বলছেন, হে ইব্রাহিম, তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আমার নামে কুরবানি করো। ঘুম ভেঙে গেল তাঁর। তিনি বিচলিত হলেন। ভাবলেন আল্লাহ তার কুরবানিতে বুঝি খুশি হচ্ছে না। তিনি বুঝলেন আল্লাহ তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুর কুরবানি চাচ্ছেন। আর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হলো তাঁর ৮৬ বছর বয়সে জন্মগ্রহণ করা শিশু সন্তান ইসমাইল (আ.)। তিনি মনস্থির করলেন, প্রিয় সন্তানের আদর, স্নেহ, সোহাগ, মমতা সবকিছু ছিন্ন করে কলিজার টুকরা ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর নামে কুরবানি করবেন।
সুবেহ সাদেক থেকেই পাখিরা গাইতে শুরু করেছে। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে গাছের পাতায় পাতায়। তিনি শিশু সন্তান ইসমাইল (আ.) কে সকালে গোসল করিয়ে ভালো জামা কাপড় পরিয়ে রওনা দিলেন মিনায়। সেদিন জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ। পিতা ইব্রাহিম পুত্র ইসমাইল (আ.) কে স্বপ্নের কথা বললেন। ইসমাইল (আ.) পিতার কথা শুনে খুশি হয়ে জবাব দিলো, আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা বাস্তবে পরিণত করুন। আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে দেখতে পাবেন।
যেতে যেতে পিতা-পুত্র মিনায় এসে উপস্থিত হলো। চারিদিকে গরম বাতাস। শূন্য প্রান্তরে শুধু বালুরচর। ধু ধু মরুভূমি। পিতার অপাত্য স্নেহ, সোহাগ, মমতা ভুলে চোখের পানি সংবরণ করে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহকে খুশি করার জন্য ইসমাইলের হাত পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধলেন। তারপর উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। এবার তিনি গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু একি! এত ধারালো ছুরি অথচ ইসমাইল (আ.) এর নরম গলার চামড়া কাটছে না। বিরক্ত হয়ে তিনি ছুরি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আর তখনই ছুরির আঘাতে পাথর খণ্ড দুভাগ হয়ে গেল। এমনই ছুরির ধার। এবার তিনি পুত্রের কথামতো নিজের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধলেন। তারপর ওই ছুরিটাই আবার গলায় চালালেন। এবার কুরবানি হয়ে গেলো। তিনি চোখ খুললেন। বিস্ময়ে হতবাক তিনি। দেখলেন একটি দুম্বা কুরবানি হয়ে পড়ে আছে আর তার পাশেই পুত্র ইসমাইল (আ.) হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। এমন সময় জিব্রাইল ফেরেশতা নবী ইব্রাহিম (আ.) কে সুসংবাদ জানালেন, আল্লাহর পরীক্ষায় আপনি কৃতকার্য হয়েছেন। আল্লাহ আপনার কুরবানি কবুল করেছেন। পুত্রের বদলে বেহেশত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে আল্লাহ আপনার কুরবানিকে সফল করেছেন। পিতা পুত্র এবার খুশি মনে বাড়ির পথে রওনা হলেন।
সেদিনের সেই স্মৃতিকে অম্লান অক্ষয় করে রাখার জন্য এই কুরবানির প্রচলন হয়েছে। প্রতিবছর আমরা ১০ জিলহজ্বে ঈদুল আজহার ওয়াজিব ঈদের নামাজ আদায় করে পশু কুরবানি করি।
নির্দিষ্ট ছয়টি পশুর মধ্যে সামর্থ ও ইচ্ছানুযায়ী যে কেউ গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ ও উট কুরবানি করতে পারে। তবে পশুগুলো হতে হবে মোটা-তাজা ও নিখুঁত। আর মনের বাসনা থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, গোশত খাওয়া নয়। কুরবানি অর্থ ত্যাগ। সচ্ছল ব্যক্তিদের আর্থিক ও আত্মিক ত্যাগ স্বীকার করার মধ্যই কুরবানির পশু জবাই করা। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। কুরবানি আমাদের ধর্মীয় ইবাদাতের একটি প্রধান অঙ্গ। আর এই ইবাদত আমরা সম্পন্ন করি পবিত্র ঈদুল আজহার মাধ্যমে। ঈদের খুশি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্য কোনো খুশির সাথে ঈদের খুশির তুলনা হয় না। ঈদের খুশিতে আমরা হয়ে উঠি উচ্ছল উজ্জীবিত প্রাণবন্ত। প্রজাপতির মতো যেন খুশিতে মেলে দিই ডানা। দোলা লাগে হৃদয়ের গহীনে। নামাজ শেষে কুরবানির ধুম পড়ে যায়, পাড়ায় মহল্লায় ও ঈদগাহে। কুরবানির গোশত খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সবারই বাড়িতে গোশত খাওয়ার ধুম।
ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহার দিনেও আছে কয়েকটি সুন্নত। যেমন গোসল করা, মিসওয়াক করা, গায়ে আতর বা খুশবু লাগানো নতুন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা কাপড় পরিধান করা। খালি পেটে ঈদের নামাজে গমন করা। এক রাস্তায় ঈদের মাঠে যেয়ে সম্ভব হলে অন্য রাস্তায় ফিরে আসা আর আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ, তথা তাকবীরে তাশরীক পড়া। এই সুন্নতগুলো পালন না করলে ঈদের যথার্থতা রক্ষা হয় না, বরং অনেক সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) বলেছেন, কুরবানির দিন বনী আদমের কুরবানির আমল আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয় ও সমাদৃত। তিনি আরও বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করে না সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে। নিজের কুরবানি নিজের হাতেই করা উত্তম। তবে নিজে না পারলে কুরবানির সময় সেখানে উপস্থিত থাকা বাঞ্ছনীয়। কুরবানির গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, যিনি কুরবানি দেন তার অন্তরের বাসনা বা তাকওয়া টুকুই তাঁর দরবারে গৃহীত হয়। আরবিতে যাকে বলে তাকওয়া।
একটি বছর পরে আবার ফিরে এসেছে ঈদুল আজহা ও কুরবানি। আমরা ইতোমধ্যে রমজানের রোজার শেষে ঈদুল ফিতর খুশি মনে উদযাপন করে এসেছি। এবার উদযাপন করছি ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতরের মতো এবারও আমরা ছোট বড় ধনী গরিবের ব্যবধান ভুলে ভ্রাতৃত্বের ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। আমরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছি সাম্য, প্রীতি, ভালোবাসার অটুট বন্ধনে। সমাজ, দেশ, সংসার থেকে আমরা অন্যায়, অসত্য, মিথ্যার বেড়াজাল ছিন্ন করে সত্য ও সুন্দরের বন্দনায় নিজেকে উৎসর্গ করবো। তবেই সার্থক হবে আমাদের জীবনের ঈদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। কুরবানি হবে সত্যিকারের অর্থে আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর।



