বেড়াতে কার না ভালো লাগে! আর তা যদি হয় ভিন্ন একটি দেশে? নতুন কিছু জানার জন্য তা একটা সুযোগ বটে। আমি থাকি ভারতের শিলিগুড়িতে। লেখালেখির সুবাদে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাও পড়ি। পড়ি ফুলকুঁড়ি। তাই ফুলকুঁড়ির ছোট্ট বন্ধুদের জন্য এ লেখা। ছাত্রছাত্রী অনেকেই শিক্ষা সফরে এখানে আসে। অনেকে এখানকার আবাসিক স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করে। শিক্ষামূলক ভ্রমণে কালিম্পং বা দার্জিলিং-এর জুড়ি নেই।
মানুষের কান্না আমাদের চোখে পড়ে, আচ্ছা পাহাড়ের কান্না আমাদের চোখে পড়ে কি? পাহাড়ের দুঃখে কাঁদার কেউ নেই, কিন্তু পাহাড় কাঁদে, সে কাঁদে নিঃশব্দে। সেই কান্নার আওয়াজ কারো কানে যায়, কারো কানে যায় না। আসলে পাহাড়ও সাথি চায় আর তাই তো মানুষ বারবার ছুটে যায় পাহাড়ের কাছে। আমিও যাই। পাহাড়ের সাথে কত কথা হয়, নিজেদের সুখ দুঃখকে ভাগ করে নিতে পারি নিজেদের মতো করে।
আর কেন জানি কালিম্পংই আমাকে টানে বারবার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি শহর কালিম্পং। কবি রবীন্দ্রনাথ অনেকবার এসেছেন এখানে। হ্যাঁ মংপু আর কালিম্পং এর কথা বলছি। এই কালিম্পঙে এমন কী আছে যার জন্যে এতোবার আসতে ইচ্ছে করে? আমি থাকি শিলিগুড়ি। কালিম্পং থেকে বেশি দূরে নয়। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকে আসে। এই কালিম্পং এর অর্থ-ই বা কী? মনের মধ্যে প্রশ্ন উঁকি দিতেই শুরু হলো খোঁজার পালা।
কালিম্পং নামের সঠিক উৎস অনেকেরই জানা নেই। সর্বজনগ্রাহ্য মত হলো- তিব্বতি ভাষায় কালিম্পং মানে রাজার মন্ত্রিদের সভা বা বেড়া। কথাটি এসেছে কালোন অর্থাৎ রাজার মন্ত্রী ও পং অর্থাৎ বেড়া শব্দদুটো থেকে। অন্য মতে, লেপচা ভাষায় কালিম্পং শব্দটির অর্থ, যে শৈলশিরায় আমরা খেলা করি।
দি আনটোল্ড এন্ড আননোন রিয়ালিটি অ্যাবাউট দ্য লেপচাস গ্রন্থের রচয়িতা কে পি তামসাং-এর মতে, কালিম্পং কথাটি এসেছে কালেনপং শব্দ থেকে, লেপচা ভাষায় যার অর্থ গোষ্ঠীর ছোটো পাহাড়।
অন্য মতে, এই অঞ্চলের বহুল প্রাপ্ত তান্তব উদ্ভিদ কাউলিম-এর নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম হয়েছে কালিম্পং। নামের মানে তো উদ্ধার করা গেল, পর্যটকরা কেন আসেন এখানে? শুরু হলো তারও পর্যবেক্ষণ। আর রওনা দিলাম শিলিগুড়ি থেকে খুব সকালে। শৈল শহর দার্জিলিং এর ৫০ কিলোমিটার পূর্বে কালিম্পং।
কালিম্পং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শৈলশহর। নিম্ন হিমালয়-এ অবস্থিত। গড় উচ্চতা ১,২৫০ মিটার (৪,১০১ ফুট)। কালিম্পং জেলার কালিম্পং মহকুমার সদর শহর। কালিম্পং-এর পরিচিতি রয়েছে শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। এগুলোর অধিকাংশ ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত হয়। চীনের তিব্বত আগ্রাসন ও ভারত-চীন যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এই শহর ছিল ভারত-তিব্বত বাণিজ্যদ্বার। কালিম্পং তিস্তা নদীর ধারে একটি শৈলশিরার উপর অবস্থিত। মনোরম জলবায়ু ও সহজগম্যতা একে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র করেছে। উদ্যানপালনে কালিম্পং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নানাপ্রকার অর্কিড দেখা যায়। এখানকার নার্সারিগুলোতে হিমালয়ের ফুল, স্ফীতকন্দ ও রাইজোমের ফলন চলে। কালিম্পং-এর অর্থনীতিতে এই ফুলের বাজার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নেপালি, অন্যান্য আদিবাসী উপজাতি ও ভারতের নানা অংশ থেকে অভিনিবেশকারীরা শহরের প্রধান বাসিন্দা। কালিম্পং বৌদ্ধধর্মের একটি কেন্দ্র। এখানকার জ্যাং ঢোক পালরি ফোডাং বৌদ্ধমঠে বহু দুষ্প্রাপ্য তিব্বতি বৌদ্ধ পুথি রক্ষিত আছে।
ছোট একটি শহর। এটি সমতল থেকে ১২৪৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। একসময় এই শহর দিয়েই ভারত-তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য চলত। শৈবালদামের ওপর পা ফেলে সোনালি ওক গাছের ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া কালিম্পং-এর অন্যতম আকর্ষণ।
কালিম্পং এর চমৎকার আবহাওয়া এবং এর কাছাকাছি অঞ্চলে আরও বেশ কিছু পর্যটন কেন্দ্র থাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম ঠিকানা হয়ে উঠেছে এই শহর। গৌরপুর হাউস এখানকার একটি দর্শনীয় স্থান। শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি আসা যায় কিম্বা শিলিগুড়ি থেকে বাসে অথবা শেয়ার করা গাড়িতে কালিম্পং পৌঁছে, তারপর সেখান থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে সহজেই চলে আসা যায় এখানে। শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পংয়ের দূরত্ব প্রায় ৬৮ কিলোমিটার। গাড়ি থামতেই স্থানীয় একজনের কাছ থেকে জেনে নিয়ে চড়াই উতরাই পথ সামান্য হাঁটতেই থমকে দাঁড়ালাম, কী নিস্তব্ধ নিঃশ্চুপ পরিবেশ, ভাগ্যিস দিনের আলোয় পৌঁছেছি সেখানে, সূর্যাস্তের পরে গেলে গা ছমছম করবে বৈকি। বাড়িটি কালিম্পং শহর থেকে দক্ষিণ দিকে এক কিলোমিটার গিয়ে খানিকটা পশ্চিম দিকে। রাস্তার নাম রিং কিং পং রোড। এই বাড়িতেই কবি রবীন্দ্রনাথ অতিথি হয়ে এসেছিলেন। এই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই প্রথমে শ্বেতপাথরের একটি ফলক চোখে পড়ল, তাতে লেখা আছে-
এই ভবনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাস করিতেন এবং ২৫শে বৈশাখ ১৩৪৫ সনে জন্মদিন কবিতা আকাশবাণীর মাধ্যমে আবৃত্তি করিয়াছিলেন।
গৌরীপুর হাউজের সামনে এসে নিজেও কেমন শান্ত হয়ে গেলাম। চারপাশটা কিছুদিন আগেই বোধ হয় পরিষ্কার করা হয়েছে, আগাছা ছিল তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আসলে দিনটি ছিল ২৯শে বৈশাখ , ঐদিন ছিল আমার জন্মদিন। ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির আদলে গড়ে ওঠা এই বাড়ির ব্যালকনি থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। ১৯৪০ এর ২৫ শে বৈশাখ এই বাড়ি থেকে জন্মদিন কবিতাটি আকাশবাণীর মাধ্যমে আবৃত্তি করেছিলেন বলে বাড়ির ফলকে লেখা আছে। কিন্তু এখন সেই সৌন্দর্যের ছিঁটেফোঁটা চিহ্নও নেই, খুব খারাপ অবস্থা হয়েছে। চারপাশে অযত্নের ছাপ, ধুলো-ময়লা আগাছায় ভরপুর, কোনো জায়গায় খুলে নেওয়া হয়েছে টিন। ওপর থেকে জল পড়ছে, ভেঙে গেছে জানলার কাচ, দরজা ভাঙা, আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই, সব মিলিয়ে এক হতশ্রী চেহারা। মংপু আর কালিম্পং পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন চার থেকে পাঁচ বার।
চমক ভাঙলো একজন মহিলার কণ্ঠস্বরে। তিনি জানতে চাইলেন কাউকে খুঁজছি কি না। খেয়াল করলাম একজন স্থানীয় নেপালি মহিলা। বাড়িটা নিয়ে দু চার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন ‘এখন আর কেউ আসে না, আর যারা আসেন তাদের বেশির ভাগ-ই বাড়িটি দখল করার জন্যে।’
অনেকক্ষণ গল্প হলো তার সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন তারই পরিচিত একজন মহিলা এই বাড়িতে থাকতেন, এই বাড়ির যিনি মালিক তিনি এই মেয়েটির বাবাকে কেয়ারটেকার হিসেবে বহাল করেছিলেন।
পাহাড়ের সহজ সরল জীবন, নেই কোনো আড়ম্বরের ছিঁটেফোঁটা। গৌরীপুর ভবনে রয়েছে জৌলুশ, বলা যায় এক সময় ছিল জৌলুশ। এই ভবনটি ছিল বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর। বাড়িটি অনেকখানি জায়গা নিয়ে, পাহাড় কেটে কেটে, কখনো বড় বড় পাথর সাজিয়ে ধাপ বানানো, নিচের দিকে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে প্রশস্ত জায়গা। অসাধারণ সুন্দর বাড়িটি। ঘরে প্রচুর আলো বাতাস। ঘরের দরজাগুলো বড় মাপের। বাড়িতে জমিদারবাড়ির স্পষ্ট ছাপ। চারদিকে বড় বড় গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় বেশ স্পষ্ট। কবির জন্যে ছিল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ব্যবস্থা ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচিহ্নকে ধারণ করে আছে বিখ্যাত গৌরিপুর হাউস। পাহাড়ি টিলায় অবস্থিত এই শান্ত নির্জন পরিবেশে এসে রবীন্দ্রনাথের ‘চির আমি’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে গেল,
“তখন কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি?
সকল খেলায় করবে খেলা এই -আমি
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুর ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই -আমি।
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে …”
মনে হচ্ছিল কবির কণ্ঠস্বর আমার চারপাশে আমাকে ঘিরে রেখে করুণভাবে বলে উঠছে,
“না, যেয়ো না, যেয়ো নাকো
মিলনপিয়াসী মোরা
কথা রাখো কথা রাখো”
রবীন্দ্রনাথের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, যেন আরো বলছেন
“পথিক ওগো থাকো থাকো …”
এই বাড়িটিতে পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথের থিম নিয়ে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যেতে পারে। আজ এই গৌরী হাউসের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সেই সবুজ পাহাড়কে হাতড়ে বেড়াতে হয় কারণ এর উল্টো দিকেই তৈরি হয়েছে বিশাল কংক্রিটের পলিটেকনিক কলেজ।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘জন্মদিন’ কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন কালিম্পংয়ের দূরবীনদাড়া এলাকার আপারকার্ট রোডে অবস্থিত গৌরীপুর হাউজে বসে। সালটা ১৯৩৮। নিজের জীবনের একটা বড় অধ্যায় কবিগুরু কাটিয়েছিলেন এই গৌরীপুর হাউজে। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। অসুস্থ হলেই তিনি পাহাড়ে চলে যেতেন ছুটি কাটাতে। সেই গৌরীপুর হাউজের এখন জরাজীর্ণ পরিস্থিতি। তবে ২০১৮ সালে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত সেই গৌরীপুর হাউজকে হেরিটেজ হিসেবে তুলে ধরে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন। কবিগুরুর টানে দেশ বিদেশের পর্যটকরা সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেন। আর পর্যটকদের দাবিমতো এবার সেই গৌরীপুর হাউজকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন ও রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। রাজ্যের এই পদক্ষেপে খুশি কবি সাহিত্যিক থেকে পর্যটনমহল।
চলে আসার সময় প্রতিমা দেবীর কণ্ঠস্বরকে স্পষ্ট অনুভব করলাম আমি, যেন কবির সুরে সুর মিলিয়ে তিনি বলছেন
“আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
আমার হিয়ার চলছে রসের খেলা,
মোর জীবনের বিচিত্ররূপ ধরে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে ….”
করুণ দুটো চোখ আমাকে পেছনে টেনে ধরছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু আমাকে যে আমার নিত্যদিনের কাজের জগতে প্রবেশ করতে হবে। তাই তো সবটুকু অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। একটা মায়াবী পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে, অনেক দূরে পিছিয়ে পড়তে লাগল আমাকে ছেড়ে।
কীভাবে যাবেন: শিলিগুড়ি বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি কালিম্পং-এ চলে যেতে পারেন। আর বাসে বা ট্রেনে এলে শিলিগুড়িতে নামতে হবে। তারপর শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে খুব সহজেই এই গন্তব্য স্থলে পৌঁছে যেতে পারেন। এছাড়াও শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন কিছুক্ষণ পরপর বাস ছাড়ে ।
প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৪



