বেড়াতে কার না ভালো লাগে। আর তা যদি হয় ভিন্ন একটি শহরে? নতুন কিছু জানার জন্য তা একটা সুযোগই বটে। ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই শিক্ষা সফরে বা নৌভ্রমণে চাঁদপুর এসে থাকে। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল চাঁদপুর। প্রতি বছর এখানকার ও আশপাশের নদীতে ধরা দেয় অসংখ্য ইলিশ। এখানে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম ইলিশের বাজার। ইলিশ মাছের অন্যতম উৎপাদনক্ষেত্র চাঁদপুরকে ডাকা হয় ‘ইলিশের বাড়ি’ নামে। ইলিশ খেতে ও কিনতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই ইলিশবাজারে মানুষের ঢল নামে। এই ইলিশ চলে যায় বিভিন্ন জেলাসহ দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বলছিলাম চাঁদপুর শহরের কথা। এটা অনেক পুরনো শহর। এটাকে এক সময় বলা হতো গেটওয়ে টু ইস্টার্ন ইন্ডিয়া। মানে আগে ভারতবর্ষের যে কোনো স্থান থেকে পূর্ব ভারতে মানে বর্তমান বাংলাদেশের এলাকাগুলো যেমন ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালীতে আসতে চাঁদপুর হয়ে আসতে হতো। কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ হয়ে চাঁদপুর। তার পর নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা।
চাঁদপুর জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। উপজেলার সংখ্যানুসারে চাঁদপুর বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণিভুক্ত জেলা। ইলিশ মাছের অন্যতম প্রজনন অঞ্চল হিসেবে চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর নামে ডাকা হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে এ জেলার দূরত্ব প্রায় ৯৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর থেকে প্রায় ২০৮ কিলোমিটার। চাঁদপুরের মোট আয়তন ১,৭০৪.০৬ বর্গ কিলোমিটার। এ জেলার উত্তরে কুমিল্লা, মেঘনা নদী ও মুন্সীগঞ্জ, দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী, পূর্বে কুমিল্লা, পশ্চিমে মেঘনা নদী, নদীর ওপারে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও বরিশাল। পদ্মা ও মেঘনা নদী দুটি চাঁদপুর শহরের কাছে এসে মিলেছে।
ট্রাভেল বাংলা হলিডেজের ডে লং ট্যুরের অংশ হিসেবে ভ্রমণের আয়োজন। অন্য কয়েকজনের মতো আমিও সকাল আটটায় আমার বাসা থেকে সদরঘাটে পৌঁছলাম। এসে দেখি সবাই হাজির। দু-একজন আসতে বাকি। অল্পক্ষণের মধ্যে সবাই এসে গেল। পরিচালক ভাইয়া ও সহায়ক এক বোন আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে। এর পর লঞ্চে আরোহনের পালা। বিশাল দোতলা লঞ্চ। দোতলায় উঠে আসন নিলাম। সাথে সাথে নাশতা এসে গেল। গরম গরম পরোটা, ভাজি ও ডিম। শীতের সকালে ভালোই লাগলো। এর পর খেলাম চা। বলা উচিত পান করলাম। লঞ্চ বা জাহাজ যাই বলি না কেন- বুড়িগঙ্গা বেয়ে ছুটে চলেছে। আমার লঞ্চ ভ্রমণ নতুন নয়। কিন্তু অনেকেরই নতুন অভিজ্ঞতা। ভালোই লাগছিল।
এবার ইলিশের কথা বলি। ষাটনল পার হতেই দুপাশে বিশাল নদী। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। পরিচালক ভাইয়া বললেন, এটা মেঘনা নদী। এটাই চাঁদপুর গেছে। এই নদীতে ইলিশ ধরা হয়। নৌকা ও জেলেদের দেখালেন তিনি। দেখতে পেলাম তারা ইলিশ শিকার করছে। চকচকে রূপালি ইলিশ। এই ইলিশ ধরার পর চাঁদপুরে নেয়া হয়। ভোর থেকেই সেখানে ইলিশের ঘাটে ইলিশের পসরা বসে। চাঁদপুরের ইলিশ চেনার সহজ কিছু উপায় আছে। এখানকার ইলিশ একেবারে চকচকে রূপালি রংয়ের হয়ে থাকে। অন্যান্য জায়গার ইলিশের রূপালি রংয়ের সঙ্গে লালচে আভা দেখা যায়। প্রকৃত স্বাদের ইলিশ ওজনে সাতশ থেকে আটশ গ্রামের হয়। এর চেয়ে বড় হলে ইলিশের স্বাদ কমে যায়।
দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছালাম। নামার পর ইজিবাইকে করে আমাদের নেয়া হলো সুন্দর একটা মিষ্টির দোকানে। এর নাম ওয়ান মিনিট। মিষ্টির দোকানে কেন আনা হলো একটু পর বুঝতে পারলাম। সেখানে আছে বহুদিনের ঐতিহ্যবাহী একটি আইসক্রিম। এক মিনিটে মেশিনের সাহায্যে এই আইসক্রিম তৈরি হয়, খেতে খুব মজাদার। সবাই খেয়ে প্রশংসা করতে লাগলো। এদের মিষ্টিও ভালো। অনেকে কিনে নিলো। আমাদের সাথে ছিল স্কুল পড়ুয়া একটি কিশোর। সেও খুব মজা করে খেলো। এর পর আমরা এলাম নদীর ঘাটে। ইলিশ ছাড়াও চাঁদপুরে আছে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা। মোহনাটি খুব সুন্দর করে পার্কের মতো করে সাজানো হয়েছে। সেখানে আমরা কতক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম। এ জায়গাটাকে বলে তিন নদীর মোহনা। এর আরেক নাম মোলহেড। তিন নদীর মোহনায় ঘুর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়। যা ভয়ংকর বেশ। বহু নৌযান দুর্ঘটনায় পড়েছে এখানে। সতর্ক থাকা ভালো। সেখানে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে সমৃদ্ধ একটি স্থাপনা। তিন নদীর মোহনায় শহিদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাস্কর্য ‘রক্তধারা’। নদীঘেরা এই ছোট্ট শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এখানে আছে লেকের ওপর নির্মিত ভাস্কর্য ‘অঙ্গীকার’। শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ‘ইলিশ চত্বর’। বাংলাদেশের একমাত্র মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও চাঁদপুরে।
দুপুরের খাবার খাওয়ার আগে গেলাম ইলিশের বাজার দেখতে। মাছ ঘাটের সঙ্গে বিশাল ইলিশের বাজার। সেখান থেকে সারা দেশে যায় ইলিশের চালান। টাটকা ইলিশ কিনতে অনেকে আসেন বিভিন্ন জেলা থেকে, রাজধানী থেকে। আমাদের সহযাত্রী কয়েকজন ইলিশ কিনলেন। কিনলাম আমিও। বরফ দিয়ে প্যাকেট করে দিলো। যাবার সময় লঞ্চে করে নেব সবাই। এর পর পাশেই ছোট মতো একটি হোটেলে খাবারের আয়োজন। ইলিশ মাছ ভাজা, বেগুনভাজা আর ডাল। মাছ যে যা খেতে চায়। ইলিশের সাথে ভাজা মরিচ আর ইলিশ মাছের তেল। যে যে টুকরো খেতে চায় সাথে সাথেই ভেজে দিচ্ছে । গরম গরম খাওয়া। সে এক অপূর্ব স্বাদ।
তিন নদীর মোহনা থেকে নৌকায় পাড়ি জমালেই মেঘনা ও পদ্মার চর। নাম মিনি কক্সবাজার। আমাদের এজেন্সি বিশেষ ট্রলারের ব্যবস্থা করেছে। আমরা উঠতেই ভট ভট করে ছেড়ে দিলো। বিশাল নদী পার হয়ে যাওয়ার পথে নদীর বুকে জেলেদের মাছ ধরা, বিশাল জলরাশির কলকল ধ্বনি ও নদীর শীতল বাতাসের অনুভূতি মন ছুঁয়ে গেল। বালুচরের পাশাপাশি নদীর উত্তাল ঢেউ মনকে কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে যাবে কক্সবাজার সৈকতে। তাই এর নাম রাখা হয়েছে মিনি কক্সবাজার। সেখানে বালি চরে আছে কাশফুলের মেলা। চর থেকে ফিরে সন্ধ্যার পূর্বে নদীর বুকে লাল সূর্যের লুকিয়ে যাওয়ার মনোরম দৃশ্য না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। মিনি কক্সবাজারে পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলটি দেখলাম। ঘণ্টাখানেক প্রকৃতির মাঝে থাকার পর ফিরে এলাম তিন নদীর মোহনায়। এবার ফেরার পালা। বিকাল সাড়ে পাঁচটার লঞ্চে আরোহন করলাম সবাই। সুন্দর ব্যবস্থা আগে থেকে করে রেখেছে এজেন্সী। ফলে কোনো অসুবিধাই হলো না। রাত আটটায় ফিরে এলাম সদরঘাট। ফুলকুঁড়ি বন্ধুরা, তোমরাও শিক্ষাসফর বা পরিবারের সাথে ঘুরে আসতে পারো ঐতিহ্যের জেলা চাঁদপুর।
যেভাবে যেতে হবে :
ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে চাঁদপুর। সকাল থেকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকেই লঞ্চ রয়েছে। লঞ্চ থেকে চাঁদপুর ঘাটে নামলেই ইলিশের শহর। লঞ্চঘাট থেকে রিকশা/অটোতে ওয়ান মিনিট, ইলিশের বাজার ও অন্যান্য স্থানে যাওয়া যায়। ইলিশের বাজার থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই তিন নদীর মোহনা। মোহনা থেকে নৌকায় মিনি কক্সবাজার। ঢাকা থেকে চাঁদপুর বাসেও যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে আসা যায় ট্রেনে করে।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



