স্বপ্নের তাজমহলে একদিন

0
0

আমাদের জন্য তাজমহল ভ্রমণ একটি স্বপ্নের মতো। শৈশবে যখন গল্প, কবিতা বা উপন্যাসে তাজমহলের বর্ণনা পেতাম কিংবা কোনো চলচ্চিত্রে বা ভিডিওগ্রাফিতে তাজমহলের চিত্ররূপ দেখতাম তখন থেকেই তাজমহল দেখার একটা স্বপ্ন মনের মাঝে উঁকি দিতো। লেখক যেমন প্রেমের উপমা দিতে তাজমহলকে কল্পনায় আনেন, শিল্পী যখন তার গানে প্রেমের সৌন্দর্য্য তুলে ধরেন তাজমহলের উপমায়; তখনি কল্পনার জগতে তাজমহল অবলোকন ছিলো অনেকটাই স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশ থেকে ছুটে চললাম সুদূর আগ্রার পথে। কুমিল্লা থেকে সকালে রওয়ানা হয়ে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করলাম ভারতে। আগরতলা এয়ারপোর্ট হয়ে দিল্লি পৌঁছাতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেলো। নয়া দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে আগ্রা যাওয়ার জন্য আমরা ট্রেনে উঠলাম। তবে যারা দিল্লি থেকে সরাসরি আগ্রা যাবেন তাদের জন্য পথটা ছোট করে এনেছে ভারতের অনবদ্য সৃষ্টি যমুনা এক্সপ্রেস হাইওয়ে। দেখার মতো এই সড়ক দিল্লি আর আগ্রাকে সংযুক্ত করেছে মাঝে কোনো বিরতি না দিয়েই। আর এই এক্সপ্রেস হাইওয়েতে দিল্লি থেকে আগ্রা পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
আয়তনে অনেক বড় হওয়ায় এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে ভারতের একেক রাজ্যের প্রকৃতি একেক রকম। তাই বছরের একই সময়ে কোথাও শীত, তো কোথাও গরম। যারা আগ্রা ভ্রমণে আগ্রহী তাদের অবশ্যই গরমকে সঙ্গী করে নিয়েই দেখতে হবে সবকিছু। তবে সে গরম শীতলতায় পরিণত হবে তাজমহল অপরূপ সৌন্দর্যের সান্নিধ্যে। ভারতের ট্রেনে ভ্রমণ করতে হলে কয়েকদিন আগে টিকেট সংগ্রহ করে নিতে হয়। না হয় সিট পাওয়া মুশকিল। আমরা তাৎক্ষণিক টিকেট সংগ্রহ করায় সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে আসতে হলো। আগ্রা পৌঁছেই প্রথমে হোটেল নিশ্চিত করলাম, তারপর শরীরের ক্লান্তি দূর করতে বিশ্রামে চলে গেলাম। পরদিন সকালে বের হবো স্বপ্নের তাজমহল অবলোকনে।
পরদিন সকালে নাশতা সেরে ট্যাক্সি নিয়ে আমরা সোজা চলে এলাম তাজমহলের সম্মুখপানে। ৬ জনের টিমে শারমিন আন্টি ছিলেন আমাদের টিম লিডার। বাপ্পি ভাই আর রিফাতের মধ্যে সবসময় ছবি তোলা নিয়ে কথা কাটাকাটি চলতো। রাফসান ছিলো সহজ-সরল; নিজে নিজে ঘুরতে বেশি ভালোবাসতো। ফাহিমের সাথে আমার কম্বিনেশনটা ভালো ছিলো। আমরা দু’জন সর্বদাই তাজমহলের অপরূপ সৌন্দর্য দর্শনে অবিচল ছিলাম।

তাজমহল সম্রাট শাহজাহানের এক অমর সৃষ্টি। জানা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র খুররম ১৬১২ সালে ফার্সি-রাজকন্যা আরজুমান্দ বানু বেগমকে বিয়ে করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর বিয়ের দিনই আরজুমান্দ-এর নতুন নাম দেন মমতাজ। সম্রাট জাহাঙ্গীর মারা যাবার পর খুররমকে সম্রাট ঘোষণা করা হয়। খুররম পঞ্চম মোঘল সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তার নতুন নাম রাখা হয় শাহ্জাহান। তিনি তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম মমতাজকে ভালোবেসে। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভালোবাসার নিদর্শন যা নির্মাণ করতে সুদক্ষ ২০ হাজার শ্রমিকের সময় লেগেছিল ২২ বছর। সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রীকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, সাম্রাজ্যের সব কাজের সঙ্গী করতেন তাঁকে। ১৬৩০ সালে এক সামরিক অভিযানের সময় শেষ সন্তানের আগমনবার্তা মমতাজকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। আর সে সময়ই মমতাজ স্বামী শাহজাহানের কাছ থেকে যে চারটি প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলো তিনি যেন স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার এমন এক নিদর্শন নির্মাণ করেন; যা পৃথিবীতে আর কেউ কোনোদিন করতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থেই সম্রাট শাহজাহান ১৬৩১ সালে স্ত্রীর সমাধিতে এই সৌধ নির্মাণ শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ১৬৫৩ সালে তাজমহলের নির্মাণকাজ শেষ হয়। আর এর নির্মাণের মধ্য দিয়ে স্ত্রীকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়েছে। কারণ আজ পর্যন্ত ভালোবাসার এমন নিদর্শন পৃথিবীতে আর কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি।
প্রায় ৪২ একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা তাজমহল কমপ্লেক্স প্রধানত ৫ ভাগে বিভক্ত- প্রবেশের ফটক, বাগান, মসজিদ, অতিথিশালা ও চারটি মিনার নিয়ে তৈরি সম্রাজ্ঞী মমতাজের সমাধিসৌধ। এর মূল চত্বর সুরক্ষিত দুর্গের মতো তিন দিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের বাইরে রয়েছে সম্রাট শাহজাহানের অন্য ৬ জন স্ত্রী ও মমতাজের প্রিয় পারিচারিকাদের সমাধি। প্রাচীরের ভেতরের দেয়ালগুলোতে নকশা আঁকা রয়েছে। এসব প্রাচীর দিয়ে গম্বুজাকৃতির স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়েছে যা বর্তমানে মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাজমহলে প্রবেশ করার ফটক মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
তাজমহল চত্বরের সামনের দিকে রয়েছে একটি ‘চারবাগ’। গোটা বিশ্বের মানুষ যাকে স্বর্গের বাগান হিসেবে চেনে। ফুলের বাগান, চলাচলের রাস্তা ও রয়েছে নয়নাভিরাম ঝরনা। জনশ্রুতি রয়েছে, সম্রাট শাহজাহান স্বীয় স্ত্রী মমতাজকে স্মরণ করে যমুনা নদীর দুই পাশে মার্বেল পাথরের দুটি মহল তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজমহল নির্মাণে অধিক খরচের কারণে সেসময় ভারতে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ হওয়ায় মার্বেল পাথরের আরেকটি মহল নির্মাণে বিরত থাকেন। এছাড়া পুত্র আওরঙ্গজেব কর্তৃক কারারুদ্ধ হওয়া ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাও এর পেছনে দায়ী হতে পারে।
তাজমহলের ঠিক সামনাসামনি লম্বা ফোয়ারা। ফোয়ারার পানিতে তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়। এ ফোয়ারার দুই পাশে রাস্তা। আমরা এক পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তাজমহলের দিকে। একটু সামনে এগোলেই উঁচু বেদি। বেদির চারপাশেও ফোয়ারা। এ বেদিতে দাঁড়িয়ে তাজমহলকে কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে দেখি। এখানে আছে পর্যটকের বেশ ভিড়। বেদিতে বসার চেয়ারও আছে। মূলত এ বেদি বানানো হয়েছে তাজমহলকে কাছ থেকে ভালোভাবে দেখার জন্য।

মহলের ভিতরের ঠিক মাঝ বরাবর পাশাপাশি মমতাজ ও মুঘল সম্রাট শাহজাহানের কবর। মহলের পেছন দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা নদী। ঠিক যমুনার তীর ঘেঁষা এ মহল। বলা হয়ে থাকে, তাজমহলের বাগানের নকশায় যমুনা নদীও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সামনের গেটের দরজার চারপাশে কালোরঙে আরবি ক্যালিগ্রাফি লেখা। একই ধরনের ক্যালিগ্রাফি পেছনের দরজার চারপাশে যেমন আছে, তেমনি অন্য দুই পাশের দেয়ালেও আছে। ক্যালিগ্রাফি ছাড়াও মহলের দেয়ালে আছে শ্বেতপাথরে খোদাই করা ফুলসহ বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা। এ ছাড়াও মহলের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নানা রঙের পাথর দিয়ে করা নকশা। মহলের জানালাগুলোও সাদা শ্বেতপাথর কেটে তৈরি। মহলের পশ্চিম ও পূর্বপাশে আছে মসজিদ ও জাওয়াব নামের মেহমান খানা। মসজিদ ও মেহমানখানাও তৈরি হয়েছে নান্দনিক নকশায়। দুটি স্থাপনাই একই রঙ, নকশা ও একই আয়তনের। মহলের পেছনের পাশ ছাড়া বাকি তিনপাশই দেয়াল ঘেরা। তিনপাশে গেটও তিনটি। প্রধান গেটটি মহলের প্রধান দরজা বরাবর।

অবশ্য মহলের পুরো অংশের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই শাহজাহান তাঁর ছেলে আওরঙ্গজেব দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত ও আগ্রার কেল্লায় গৃহবন্দী হন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জীবনের বাকি সময়টুকু শাহজাহান আগ্রার কেল্লার জানালা দিয়ে তাজমহলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাকে তাজমহলে স্ত্রী মমতাজের পাশে সমাহিত করেন। তাজমহলের নকশা কে করেছিলেন এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলা দায়। তবে এটা নিশ্চিত যারা এর নকশাকার বা কারিগর তারা সত্যিই শিল্প-নৈপুণ্যসম্পন্ন। মূলত এ মহল দিল্লী, কান্দাহার, লাহোর এবং মুলতানের সুদক্ষ রাজমিস্ত্রীগণকে তাজমহল নির্মাণ কাজে নিয়োজিত করা হয়। বাগদাদ, শিরাজ এবং বোখারার দক্ষ মুসলিম নির্মাতারা তাজমহলের বিশেষ কাজগুলি করেন। নির্মাণকাজের দলিলে উল্লেখ আছে যে, তাজের প্রধান স্থপতি ছিলেন সেই সময়ের প্রখ্যাত মুসলিম স্থপতি ওস্তাদ ঈসা। তাজমহলকে ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন একে বলা হয়েছিল, “টহরাবৎংধষষু ধফসরৎবফ সধংঃবৎঢ়রবপব ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ’ং যবৎরঃধমব.”
বর্গাকার একটি বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ মহল। বেদির চারকোণে চারটি মিনার। এগুলোর উচ্চতা ৪০ মিটারের বেশি। মিনারগুলোতে তাজমহলের প্রতিসমতার ব্যাপারটিই লক্ষ করা যায়। মহলের ঠিক মাঝ বরাবর একটি বড় গম্বুজ। চারপাশে আছে আরও চারটি গম্বুজ। সব গম্বুজই একই নকশার এবং সব গম্বুজের উপরেই আছে কাঁসার চূড়া বা দণ্ড। চূড়ার উপরের অংশটি চাঁদ এবং চাঁদের উপরের অংশটি তাক করা শিং আকৃতির। এ চাঁদ ও তাক করা শিং মিলে ঐতিহ্যবাহী চিহ্নেরই আকার ধারণ করে বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা। ধারণা করা হয়, এ মহল নির্মাণে খরচ হয়েছে তৎকালীন আনুমানিক ৩২ মিলিয়ন রুপি। তবে শ্রমিকের খরচ, নির্মাণের সময় এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক যুগের কারণে এর মূল্য অনেক। ফলে একে অমূল্যই বলা যায়।
একটি বর্গাকার (১৮৬ী১৮৬) ক্ষেত্রের প্লাটফর্মের মোড়ানো চৌকোণার উপর অষ্টভুজাকৃতির আকার ধারণ করেছে তাজমহল। প্রধান কাঠামোর উপর চারটি পুল আবার চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে তাজের চমৎকার নকশাকে আরও শৈল্পিকরূপ দান করেছে। পুরোটা মহল ঘুরে ঘুরে দেখলাম, সত্যিই অসাধারণ। তাজমহলে উঠার সময় জুতা পরে উঠা যায় না, জুতার উপরে এক ধরনের কাপড়ের মোজা পড়তে হয়। তাজমহল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে পর্যটকদের কাছে ধরা দেয়। যেমন ভোরবেলায় গোলাপি, দুপুর-বিকেলে দুধ সাদা, জ্যোৎস্নার আলোয় সোনালি এবং চাঁদের আলোয় মুক্তোর মতো জ্বল জ্বল করে। এছাড়া বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন রং। এসব শোনা কথা ছিল। আজ তিনটে রঙ দেখতে পেলাম। দুধ সাদা, হালকা হলুদ আর ধূসর।
মূল মহলেই মমতাজের পাশে শাহজাহানের কবর। এখানে ছবি তোলা ও ভিডিওগ্রাফি নিষেধ। পুরো মহল ঘুরে ঘুরে দেখতে ভালোই লাগছিলো। কিন্তু প্রচণ্ড রোদে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পানির পিপাসাও ছিল দারুণ। মহলের ভেতরেই পানি পানের ব্যবস্থা আছে সর্বসাধারণের জন্য। খুব ঠান্ডা আর মিষ্টি পানি। সেখান থেকেই সবাই পিপাসা মিটালাম। মাঝে অনেক বিদেশি পর্যটকের সাথে সাক্ষাৎ হলো। কুশল বিনিময় হলো, ছবিও তুলে নিলাম।
পৃখিবীতে যেসব আকর্ষণীয় স্থাপনা রয়েছে তার মধ্যে তাজমহল প্রধানতম দৃষ্টি আকর্ষণীয়। সাবেক একজন মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাজমহল দেখে মন্তব্য করেছেন, ‘পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে- যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা দেখেনি’। সেদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান, কারণ আমি তাজমহল দেখেছি।
তাজমহল প্রবেশে আমাদের প্রতিজনকে গুণতে হলো ৭০০ রুপি করে। ভারতের নাগরিকদের জন্য ১০০ রুপি। শুক্রবার ব্যতীত সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সপ্তাহের সবদিন খোলা থাকে। তাজমহল দেখা শেষে ফেরার সময় মনে হলো আমরা আরও কিছুক্ষণ থাকি। এর সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো দায়। বার বার পেছনের দিকে তাকাতে থাকলাম; মনে হলো কী যেন হারিয়ে ফিরছি!

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫