লাল জামা

0
1

আজ চাঁদরাত। কাল ঈদ। তালতলা বস্তির সাথে লাগোয়া মুদি দোকানটা থেকে বারবার ভেসে আসছে,

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ,
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাকিদ।”

বস্তির ছেলে-বুড়ো সবার মধ্যে একটা আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে পটকার আওয়াজও কানে আসছে। কেউ কেউ ব্যস্ত কেনাকাটায়। কেউ ব্যাগ গুছিয়ে গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা দিচ্ছে। কেউ আবার ভিড় করছে নিউ ফ্যাশন লেডিস টেইলার্সে। দোকানীদের দম ফেলার সময়ও নাই। বাচ্চারা মশগুল নতুন কেনা কাপড়-চোপড় আর জুতোর গল্পে। কিন্তু তাদের সাথে তাল মেলাতে পারছে না ছোট্ট ময়না। কারণ, ঈদে তার কিছুই কেনা হয়নি।
ময়না মিষ্টি একটা মেয়ে। বয়স সাত-আট বছর হবে। একটা এনজিওর স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ে। পড়াশোনায় বেশ ভালো। ক্লাসে ফার্স্ট হয়। খলবল করে কথা বলে। মজার মজার ছড়া কাটে। তার চঞ্চলতা ভরা মায়াবী বোল বস্তির সবাই পছন্দ করে। সে সত্যিই যেন একটা ময়না পাখি।
ময়না মন খারাপ করে ঘরে চলে যায়। বস্তির শেষ মাথায় কলপাড়ের পাশে ছোট্ট একটা ঝুপড়িতে থাকে ওরা।
ঘরে আসতেই ময়নার মনমরা চেহারা দেখে বাবা আনোয়ার মিয়া মেয়েকে কাছে ডাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কপালে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হইছে, মা? মন খারাপ লাগতাছে?’
ময়না নাসূচক মাথা নাড়ে। যদিও তার আসলেই মন খারাপ। খুবই মন খারাপ। কিন্তু বাবাকে বুঝতে দিতে চায় না কিছুতেই। তাহলে যে বাবা অনেক কষ্ট পাবে। পাঁচ মাস হলো সিএনজি ড্রাইভার বাবা আনোয়ার মিয়া অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মেরুদণ্ডে ব্যথা। দাঁড়াতে বা হাঁটাচলা করতেও কষ্ট হয়। ডাক্তার বলেছে পূর্ণ বেড রেস্টে থাকতে। আয় রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। বাধ্য হয়ে ময়নার মা আছিয়া খাতুন অন্যের বাসায় কাজ নিয়েছে। তাতে কোনো রকমে তিনবেলা খাবার জোটে। বাবার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে অনেক টাকা ধার-দেনা হয়ে গেছে। তাও কিছু কিছু শোধ করছে মা। ময়না জানে ঈদ তাই ওদের জন্য নয়।
মুখে কিছু না বললেও সবই বুঝতে পারে আনোয়ার মিয়া। অপারগতার কষ্টে তার চোখ ভিজে ওঠে। সে অন্য দিকে তাকিয়ে চোখ মোছে। মেয়ের হাত ধরে বলে, ‘মাগো, ঈদে তোমার লইগ্যা কিছুই কেনা হয় নাই, সেই জন্য তোমার মন খারাপ। সবই আমাগো নসিব, মা। তয় আল্লায় চাইলে আমি সুস্থ হইয়া যামু। তহন তোমারে একলগে দশটা জামা কিন্না দিমু। দেইখ্যো আমাগো দিন অবশ্যই ফিরবো।’
‘আমার জামা লাগব না, তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হইয়া যাও, বাবা।’ বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ময়না। আনোয়ার মিয়া পরম যত্নে মেয়ের চোখ মুছে দেয়।
ময়না বাবার পাশে শুয়ে শুয়ে মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আজ অনেক কাজ আছিয়া খাতুনের। ফিরতে তাই দেরিই হবে। অপেক্ষা করা ছাড়া বাবা-মেয়ের কিছুই করার থাকে না। আনোয়ার মিয়া মেয়ের চুলে বিলি কেটে দেয়। গল্প শোনায়। তাদের গ্রামের গল্প। সচ্ছল সময়ের গল্প। নদীর পেটে ঘর-বাড়ি, জমি-জিরাত তলিয়ে যাওয়ার গল্প। ময়না গভীর আগ্রহ নিয়ে গল্প শোনে। গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে। খুব সুন্দর একটা ছোট্ট বাড়ি। সাজানো ফুলের বাগান। লাল, নীল, হলুদ চমৎকার সব ফুল। উঠোন পেরিয়ে শীতল পানির পুকুর। পুকুর পাড়ে লম্বা একটা তালগাছ। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত। সোনালি সুতোর মতো এক চিলতে চাঁদ আকাশে দুলছে। হঠাৎই চাঁদের মাঝখানে একটা আলোর দরজা খুলে গেল। আর সেখান থেকে রূপোলি ঝলমলে পোশাক পরা একটা বুড়ি বেরিয়ে এলো। সাথে জরির কারুকাজ করা একটা থলে। সে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। মেঘের ভেলায় চড়ে বুড়ি ময়নার সামনে এসে দাঁড়াল। একগাল হেসে ময়নার সাথে পরিচিত হলো।
– তুমিই বুঝি চাঁদের বুড়ি? ময়না জানতে চাইল।
– হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ। চাঁদের বুড়ি সম্মতি জানায়।
– তোমার পোশাকটা তো ভারি সুন্দর!
– তাই বুঝি! এমন সুন্দর জামা তোমার চাই? বলেই চাঁদের বুড়ি তার সাথে থাকা থলে থেকে একটা লাল রঙের বাহারি সুতার কাজ করা জামা বের করল। ময়নার সামনে মেলে ধরে বলল, নাও, এটা পরলে তোমাকে দেখতে পরির মতো লাগবে।
ময়না অভিভূত হয়ে যায়। সে হাত বাড়িয়ে উপহার গ্রহণ করে। চাঁদের বুড়ি খুশি হয়ে ময়নার গাল ছুঁয়ে আদর করে দেয়। উষ্ণ সেই স্পর্শে ময়নার ঘুম ছুটে যায়। সে চোখ মেলে তাকায়। দেখে, তার মা তার গাল ছুঁয়ে আদর করছে। আর তার মাথার পাশে পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো একটা লাল জামা। ময়না ধড়মড় করে উঠে বসে। জামাটার দিকে তাকিয়ে তার চোখে খুশির রেখা ঝিলিক মারে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকায়।
আছিয়া খাতুন মেয়ের কপালে চুমু খায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, এমন একটা ঈদ অথচ মাইয়াডার লইগ্যা কিছুই কিনা হয় নাই- এইডা ভাইব্বা সারাডাদিন মনডা খারাপ আছিল। কাজ শেষে বকশিশের লগে বেগম আম্মা এই জামাডা দিয়া কইল, এটা তোমার মেয়ে ময়নার জন্য। আমার চোখে আপনা-আপনি পানি চইলা আইলো।
ময়না বাবা-মা দুজনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ঝুপড়ির জানালা দিয়ে দূরের আকাশে চাঁদটাকে খুঁজতে থাকে।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫