বাঘটা ছিল খুবই অত্যাচারী। জঙ্গলের নিরীহ খরগোশ, মায়াবী হরিণ; কাউকে ছাড়ত না। ধরতে পারলেই চিবিয়ে খেত। বাঘের ভয়ে জঙ্গল ছেড়েছে সাদা বক। কালো ময়না। সবুজ টিয়ের দল।
পাখিদের তো ডানা আছে। তাই উড়ে উড়ে; দূরে কোথাও চলে গেছে।
কিন্তু হাতি? লম্বা গলার জিরাফ। পেটমোটা ভাল্লুক আর চঞ্চল বানর? ওদের কী উপায় হবে?
ভয়ে ওরা কেউ ঘর থেকে বের হয় না। বের হলেই তো রাক্ষুসে বাঘটা…
একদিন ভাল্লুক পশুদের তার বাড়িতে ডাকলো। তার ডাকে হাজির হলো বিশালদেহী হাতি। লম্বা গলার জিরাফ। জামগাছের বানর।
তারা ভাল্লুককে বললো- হ্যাঁ গো ভাল্লুক দাদা; এমন ঘোর বিপদের দিনে কেউ ডাকে? যদি বাঘটা জেনে যায়!
ভাল্লুকটা বিরক্তি নিয়ে বললো- ওই পাজিটার জন্যেই তো ডেকেছি। বলো তো, এভাবে আর কতদিন লুকিয়ে থাকবো আমরা? ঘরে যা খাবার ছিল, সবই তো শেষ! এখন বাইরে বেরোতে না পারলে, ক্ষুধায় মারা যাবো!
জিরাফ বললো, ঠিকই বলেছো ভাল্লুক দাদা। আমাদের কিছু একটা করা দরকার।
কথাটা বলেই সে হাতির দিকে তাকালো।
বিশালদেহী হাতি; পশুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাণী। আস্ত গাছ একটানে উপড়ে ফেলে যে, তার কি ভয় পাওয়া সাজে?
হাতি জিরাফের মনোভাব বুঝতে পারলো। কিন্তু রাজি হলো না। বললো, আমি আর কী করবো? নিজের শরীর নিয়েই চলা দায়! তার ওপর বাঘের ধারালো নখ! ওর সাথে লড়তে যাবো, সাধ্য কই?
হরিণ, বানর, খরগোশ; সবাই অজুহাত দেখালো। তাদের সবার এক কথা- বাঘকে ঘায়েল করা সম্ভব নয়।
তাদের কথা শুনে ভাল্লুক নিরাশ হলো। ঠিক তখনই জঙ্গলে অদ্ভুত একটা আওয়াজ হলো- ‘ভন ভন’, ‘ভন ভন’…
এমন অদ্ভুত আওয়াজ এই জঙ্গলে আগে কোনোদিন শোনা যায়নি। হাতি ডানে তাকালো, কিছুই দেখতে পেলো না। হরিণ বাঁয়ে তাকালো, তা-ও কিছু দেখতে পেলো না। জিরাফ তার লম্বা গলা উঁচু করে উপরের দিকে তাকালো। উঁহু; কিছুই দেখা যাচ্ছে না!
ভাল্লুক তখন বললো- কে ভাই তুমি? সামনে এসো।
ভাল্লুকের কথা শেষ হতেই ঝোঁপ থেকে একটা মাছি বেরিয়ে এলো। ছোট্ট মাছিটা মুচকি হেসে বললো, আমাকে দেখতে পাচ্ছো না দাদু। আমি মাছি গো, মাছি।
পশুরা এক সঙ্গে বলে উঠলো, মাছি!
সবার নজর এখন মাছিটার ওপর। তখন ভাল্লুক বললো- তা ভাই মাছি, তুমি কোথা থেকে এলে? এই জঙ্গলে তো আগে কোনোদিন দেখিনি।
মাছি বললো, আমি এসেছি আমাজন জঙ্গল থেকে।
মাছির কথা শুনে জিরাফের দুই চোখ গোল হয়ে যায়। জিরাফ বললো, আমাজন! সে তো অনেক দূর! কীভাবে এলে?
মাছি পুনরায় মুচকি হেসে বলে, সে গল্প না হয় অন্য কোনো দিন শুনো? এখন বলো, ওই দুষ্ট বাঘটা কোথায় আছে? ওকে শায়েস্তা না করে যাচ্ছি না।
মাছির এমন কথায় বানর হাসতে শুরু করে। বলে, তুই তো একটা পুঁচকে মাছি। তুই কি বাঘের সাথে পারবি?
মাছি একটুও রাগ করলো না। বানরকে বললো- শোনো বানর মামা, যুদ্ধটা হবে মাথা দিয়ে। শরীর দিয়ে নয়। সুতরাং সাইজ নিয়ে ভাবতে যেয়ো না।
ভাল্লুক মাথা নাড়িয়ে বলে, তুমি ঠিকই বলেছো মাছি ভাই। বুদ্ধির জোরে অনেক কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।
ভাল্লুক সবাইকে মাছির পুরো কথা শুনতে বলে। পশুরা চুপ হয়ে মাছির পরিকল্পনা শুনলো। তারপর সবাই এক সাথে বললো- পাজি বাঘটাকে শাস্তি দিয়েই ছাড়বো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
পশুদের নিয়ে মাছি গেলো বাঘের ডেরায়। বাঘটা তখন নাক ডেকে ঘুমুচ্ছিল। গলা থেকে শব্দ বেরুচ্ছিলো- গড়গড়গড়…
তা দেখে পেটমোটা ভাল্লুক বললো- দুপুরের খাবারটা বোধহয় খুব মজার হয়েছে। ওই তো মুখে তাজা রক্ত লেগে আছে।
মাছি বললো- দাঁড়াও, এখনই ওর দফারফা করছি।
এই বলে সে উড়ে উড়ে বাঘের কানের কাছে যায়। গিয়েই বাঁশি বাজালো- ভনভন ভনভন…
মাছির ভনভন শব্দে বাঘের ঘুম ভাঙে। চোখ মেলেই ব্যাটার সেকি গর্জন- হালুম… কে রে হতচ্ছাড়া? সাহস তো কম নয়! কানের কাছে ভনভন করছিস।
বাঘের গর্জনে মাছি একটুও ভয় পেলো না। বরং ঝাঁঝালো গলায় বললো, এতো গরম দেখিয়ো না। তোমার গর্জনের দিন শেষ।
বাঘ তখন দ্বিগুণ রেগে যায়। গলা থেকে শব্দ বের হয়- ঘড়ঘড় ঘড়ঘড়…।
বাঘটা মাছিকে বললো- যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা। দাঁড়া; এখনই তোর ঘাড় মটকাচ্ছি।
বাঘের কথা শুনে মাছির সেকি হাসি। হাসতে হাসতে বলে, তুমি আমার ঘাড় মটকাবে? বেশ, ঘাড় মটকিয়ে যাও।
তখন ভাল্লুক বললো, তোমরা যুদ্ধ করার আগে আমার একটা কথা শোনো। এই যুদ্ধে যে হারবে, তাকে এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে হবে। আর কোনো দিন এই জঙ্গলে আসতে পারবে না। তোমরা কি আমার কথায় রাজি?
মাছি সাথে সাথেই বললো, আমি রাজি।
বাঘ বললো, আমিও রাজি।
শুরু হলো যুদ্ধ।
মাছি উড়ে গিয়ে বাঘের ডান গালে বসলো। বাঘ রেগেমেগে দিলো এক থাবা। অমনি মাছিটা উড়ে গিয়ে বা’গালে বসলো। ততক্ষণে বাঘের গাল ফেটে চৌচির। বাঘের মাথায় রক্ত উঠে যায়। হালুম বলে দিলো আরেক থাবা। মাছিটা আগের মতোই উড়ে যায়। উড়ে উড়ে বাঘের নাকের ডগায় বসে। বসেই ভনভন শব্দে হাসতে থাকে।
এদিকে ধারালো নখের আঁচড়ে বাঘের বা’গালও ফেটে চৌচির।
এভাবে মাছিটা বাঘের নাক, কান, মাথা ও গলায় বসলো; আর বোকা বাঘটা একের পর এক থাবা মারলো। তাতে বাঘেরই ক্ষতি হলো। বাঘের এমন অবস্থা হলো, প্রাণ বাঁচানোই দায়। বাঘটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ক্লান্ত গলায় মাছিকে বললো- ভাই মাছি, আমার ঢের শিক্ষা হয়েছে। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও।
মাছি তখন বললো- তাহলে কথা দাও; চিরদিনের জন্য এ জঙ্গল ছেড়ে চলে যাবে?
বাঘ বললো, তাইই হবে। চিরদিনের জন্য এ জঙ্গল ছেড়ে চলে যাবো।
সেদিনের পর থেকে বাঘটাকে আর কোনোদিন এ জঙ্গলে দেখা যায়নি।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫



