গ্রিলের ওপাশে ডুমুর গাছটা।
ক’দিন ধরে ওখানে দু’টো ছোটো পাখি ছুটোছুটি করছে। আদিব খুব খেয়াল করে দেখছে, পাখি দু’টো মুখে করে কোত্থেকে খড়কুটো, বিশেষ করে তুলো জাতীয় কিছু এনে গাছের দুই ডালের ফাঁকে বিশেষ কায়দায় জড়ো করছে। এভাবে দুইদিন পর অনেক খড়কুটো জমা হয়ে গেলো।
এসব করার ফাঁকে ফাঁকে পাখি দু’টো ‘টুইট টুইট, চিপ চিপ, টুন টুন’ করে ডাকছে।
‘ও মা!’ দু’টি হাত দিয়ে নিজের মুখের দু’পাশ চেপে ধরলো আদিব। ‘এ তো একটা পাখির বাসা! কী সুন্দর করে বাসাটা বানিয়েছে পিচ্চি পাখি দু’টো!’
এ রকম পাখির বাসা এতোদিন বইয়ের পাতায় দেখেছে আদিব। এক্ষণে নিজ চোখে দেখে তাই উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারে না। অস্ফুটে মুখ থেকে কথাগুলো বেরিয়ে পড়ে।
আদিবের বড়ো বোন, আফরোজা, কী একটা কাজে বারান্দায় এসেছিলো। ছোটো ভাইটার কথাগুলো ওর কানে গেছে। তাই ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘অমন করে কী দেখছো আমার মিষ্টি ভাইটি?’
আদিব বললো, তেমনই আনন্দিত কণ্ঠে, ‘আপা দেখো, দু’টো পিচ্চি পাখি ডুমুরগাছটায় কী সুন্দর একটা বাসা তৈরি করেছে! ঠিক যেনো আমার বাংলা বইয়ের নেস্টটার মতো।’
আফরোজা দেখলো, সত্যিই তো সুন্দর একটা পাখির বাসা ডুমুর গাছের ডালে! ভাইয়ের মুখটা ধরে একটু আদর করে দিয়ে বললো, ‘ও মা! সত্যিই তো, বাসাটা তো বেশ যত্ন করে বানিয়েছে পাখিগুলো!’
‘জানো আপা, দুই দিন ধরে এই বাসাটা ওরা তৈরি করেছে, আমি দেখেছি।’ একটু কী যেন ভাবলো, তারপর আবার বললো, ‘আচ্ছা আপা, এত্তো জায়গা থাকতে ওরা এই ডুমুর গাছটায় বাসা তৈরি করলো কেনো?’
আফরোজা বললো, ‘সেটা তো ওরাই ভালো জানে। তবে আমার মনে হয়, এই গাছটা— বিশেষ করে এই পরিবেশটা ওদের বেশ পছন্দ হয়েছে।’
‘তাহলে তো আমাকেও ওদের পছন্দ হবে, তাই না আপা?’ সমর্থনের আশায় বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আদিব।
‘তোমাকে তো ওরা অবশ্যই পছন্দ করবে, ভাইয়া। কারণ, তুমি তো ওদেরই মতো। মিষ্টি আর ছোট্টো তোমার মন।’ ভাইকে নিরাশ করতে চাইলো না আফরোজা।
আদিবের মুখটা আনন্দে ভরে উঠলো। খুবই মজা লাগছে ওর।
আসলে আদিবের মনে তখন অন্য চিন্তা। ও পাখি দু’টোর সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। বোনের দিকে তাকিয়ে এবার আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা আপা, পাখিদের সাথে কি মানুষের বন্ধুত্ব হয়?’
আফরোজা বুঝতে পারলো ছোটো ভাইয়ের মনের কথা। বললো, ‘কেনো হবে না ভাইয়া, অবশ্যই হয়। ওদেরকে তুমি বুঝি বন্ধু বানাতে চাও?’ মিটিমিটি হাসছে সে।
আদিব যেনো একটু লজ্জা পেলো, গালটা লালচে হয়ে উঠলো। মুখে কিছু বললো না, ডুমুর গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
‘বেশিক্ষণ বাইরে থেকো না আদিব ভাইয়া, সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তাড়াতাড়ি ঘরে চলে এসো।’ বলে বারান্দা থেকে ঘরের মধ্যে চলে গেলো আফরোজা।
আদিবদের বাড়িটা একতলা। তিনটে বেডরুম, একটা কিচেন, একটা ডাইনিং রুম নিয়ে ছোটোখাটো ফ্ল্যাটটা আব্বু বেশ যত্ন করে বানিয়েছেন। ফ্ল্যাটের পেছন দিকে ছোটো একটা বারান্দা রেখেছেন। বারান্দার ওপাশে সামান্য খালি জায়গা। সেই জায়গায় আব্বু বিভিন্ন সবজির চাষ করেন। একটা বেগুনগাছ আছে, যেটা প্রায় দুই বছর ধরে বেগুন দিয়ে যাচ্ছে। ওর পাশেই ডুমুর গাছটা। আব্বু কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আম্মু বারণ করাতে ওটা আর কাটা হয়নি। আম্মুর যুক্তি, ডুমুর গাছে ডুমুর ধরলে তা রান্না করবেন। ডুমুরের অনেক গুণ। এটি ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থে পরিপূর্ণ যা স্বাস্থ্যের জন্য বিস্ময়কর কাজ করে। এটি হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ডুমুর খেলে ত্বক উজ্জ্বল থাকে। ডুমুর ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস সরবরাহ করে, যা হাড় শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এছাড়া এই ডুমুর ফল শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও বেশ কার্যকরী।
পাখি দু’টো অনেকক্ষণ হলো তাদের বাসায় ঢুুকেছে। কিন্তু আর বেরোনোর নাম নেই।
আচ্ছা, এই পাখির নাম কী? নিজেকেই প্রশ্ন করে আদিব। জবাবও নিজে নিজেই খোঁজে। এবং পেয়েও যায়। আব্বুই ওকে বিভিন্ন পাখি সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি সুযোগ পেলেই ছেলেকে নানান বিষয় শেখাতে চেষ্টা করেন। ডুমুর গাছের পাখির সাথে ও টুনটুনি পাখির মিল খুঁজে পেলো। এর বুক ও পেট সাদাটে, যা অনেকটা মাটির ঢিলার মতো দেখতে। মাথা জলপাই-লালচে। চোখের মনি পাকা মরিচের মতো। বুক সাদা পালকে ঢাকা। লেজ খাড়া, তাতে কালচে দাগ আছে।
ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আদিবের চোখজোড়া ব্যথা করে উঠলো। এদিকে সন্ধ্যাও নেমে আসছে। আর বেশিক্ষণ বাইরে থাকা ঠিক হবে না। আম্মু রান্না ঘরে ঢুকে গেছেন রান্নাবান্না করতে। আপাটা নিজের পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আব্বু ফিরবেন সেই রাত আটটার দিকে। আব্বুটা যে কী এতো কাজ করেন অফিসে! ওদিকে দেখো, আনাস-রাবেয়াদের আব্বু সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসেন। আনজুর আব্বু, এমনকি রাকিবের আব্বুও সকাল সকাল বাসায় ফেরেন। দেরি করে ফেরেন কেবল রানু আর ওর আব্বু। তারা দু’জন ব্যাংকে চাকরি করেন। এই দেরি করে বাসায় ফেরা নিয়ে আম্মু কতো কথা শোনান আব্বুকে! কিন্তু আব্বু বলেন, ‘ব্যাংকে চাকরি করলে সকাল সকাল বাসায় ফেরা যায় না। দিনের কাজ দিনেই সেরে আসতে হয়, সেজন্য ইচ্ছে করলেই অফিস ফাঁকি দিয়ে বাসায় চলে আসা যায় না। তাছাড়া চাকরিটা হচ্ছে এক প্রকার চাকরের কাজ। মনিব ছুটি না দিলে কি আর ছুটি মেলে?’
আব্বুর কথা আম্মু বুঝতে পারেন কি-না তা আদিব জানে না, তবে ওর একটুও ভালো লাগে না। ওর কেবলই ইচ্ছে করে আব্বুর সাথে খেলা করতে। ওর আব্বুটা কতো ভালো! ওকে একটুও বকাঝকা করেন না। আর আম্মুটা দেখো, সারাক্ষণ ওর সাথে বকাবকি করতে থাকে! ‘এই আদিব, এটা করো না।… আহ্! ওটা কেনো করলে আদিব?… আমি বলেছি না আপার সাথে বেশিক্ষণ কথা বলবে না, কয়দিন পর আপার পরীক্ষা?… এই আদিব, বাথরুমে এতোক্ষণ কী করো? পানি নিয়ে তোমাকে কতোবার খেলা করতে নিষেধ করেছি আমি? আম্মুর কথা কি একবারও শুনবে না?…’
আরও কতো কী বলে বকবে ওকে! অল্প পানি দিয়ে আদিবের গোসল হয় না। আবার বাথরুমে বসে হ্যান্ড শাওয়ারের পানি নিয়ে খেলাটা যে কতো মজার, আম্মুকে সেটা কে বুঝাবে? বাথরুমের সমস্ত দেয়াল ভিজিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে ওর। আর আম্মু যে বলেন, ও একটুও আম্মুর কথা শোনে না, এটা একেবারেই ঠিক না। কোন্ কথাটা শোনে না ও আম্মুর? সকালে জোর করে ঘুম থেকে উঠান, তখন কি ও আম্মুকে নিষেধ করে? আর নিষেধ করলেও তিনি কি শোনেন? জোর করে পরোটা আর ডিম ভাজি খাইয়ে দেন, এক গেলাস পানি খাওয়ান। কই, কোনোটাতেই তো বারণ করে না ও! তাহলে আম্মুটা খালি খালি কেনো বলবেন যে ও আম্মুর একটা কথাও শোনে না? বেশ অভিমান হয় ওর। আপা এসেই ওর সেই অভিমান ভাঙান। আপা বলেন, ‘আদিব ভাইয়া, তোমার মনটা কি খুউব খারাপ? আম্মুর উপরে অভিমান হয়েছে? শোনো ভাইয়া, আম্মুর উপরে কখনোও রাগ করতে নেই। আম্মু হচ্ছেন আমাদের জন্মদাত্রী। তার মাধ্যমেই আল্লাহপাক আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। পিতামাতা যদি সন্তানের উপরে খুশি থাকেন, তাহলে আল্লাহও তার উপরে খুশি হয়ে যান। এরপর সে যা চায়, আল্লাহ তাকে তা-ই দেন।’
এতে আদিবের মনটা ভালো হয়ে যায়। মায়ের উপর থেকে সমস্ত রাগ-অভিমান এক নিমিষেই দূর হয়ে যায়। তখন আম্মুকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
পরদিন বিকালে যথারীতি বারান্দার গ্রিলের সামনে এসে দাঁড়ায় আদিব। খেয়াল করে, বাসায় পাখি নেই। ও গ্রিলের দরোজা খুলে বাইরে চলে যায়। উঁকি দিয়ে দেখে, বাসায় নীলচে কালারের দু’টো ডিম পড়ে আছে। ওর খুব ইচ্ছে হলো ডিম দু’টো ছুঁয়ে দিতে। কী মায়াবী লাগছে ডিম দু’টোকে দেখতে!
আদিব হাত বাড়িয়েছিল ডিম ছোঁয়ার জন্য, এই সময় উড়ে এলো একটা টুনটুনি। ‘চিপ্ চিপ্’ করে ডাকতে লাগলো। হাত সরিয়ে নিলো আদিব। দেখলো, পাখিটা এ-ডাল ও-ডাল উড়ে বেড়াচ্ছে। ও বুঝলো, ওকে দেখেই পাখিটা অমন করছে। তাই আর বাইরে না থেকে বারান্দায় উঠে গেলো। এবার পাখিটা গিয়ে ডিমের উপরে বসে পড়লো। ও জানে, পাখিরা এভাবে ডিমে তা’ দেয়। ও আরও জানে, কেবল মা টুনটুনিই ডিমে তা’ দেয়। এগারো থেকে চৌদ্দ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। আর সেই বাচ্চা বারো থেকে চৌদ্দ দিনের মাথায় উড়তেও শিখে যায়।
আদিব চেষ্টা করে মা টুনটুনির সাথে ভাব জমাতে। সে জন্য বিভিন্নভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। পাখিটাও বুঝি সেটা টের পায়। তাই মাঝে মাঝেই সেও আদিবের দিকে আড়চোখে তাকাতে থাকে।
এভাবে কেটে যায় ছয়দিন। আদিবের মনে হয়, টুনটুনির সাথে ওর ভাবই হয়ে গেছে। কেননা, ওকে দেখে পাখিটা আর ভয় পায় না। বরং ওর চারপাশে চক্কর দিয়ে আস্তে আস্তে উড়তে থাকে। আর তার নিজস্ব স্বরে ডাকতে থাকে। যেনো বন্ধুত্বের দাবি জানায়। জানিয়ে দেয়, সেও আদিবের বন্ধুত্ব গ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করছে।
আদিবের বেশ ভালো লাগে। বুকের কোন্ কোণটায় যেনো আনন্দের একটা শিহরণ খেলা করে যায়। খুশিতে মনটা নেচে ওঠে।
ঠিক বারো দিনের মাথায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলো, একটা। আদিব খেয়াল করলো, একটা ডিম ডুমুর গাছটার নিচে ভেঙে পড়ে আছে। ডিমের হলুদ অংশ ছড়িয়ে আছে। ও বুঝলো, ডিমটা আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। নয়তো ওটা থেকেও বাচ্চা বের হওয়ার কথা। আর ডিমটা যদি ভালো থাকতো, তাহলে তো ভাঙা অংশের মধ্যে বাচ্চার গোশতো-হাড়-রক্ত এসব দেখা যেতো।
মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো আদিবের। ইশ্! মা পাখিটার আর দু’টো ছানা দেখা হলো না।
মা আর বাবা পাখি ঠোঁটে করে খাবার এনে বাচ্চা টুনটুনিটাকে খাওয়ায়। বাচ্চা টুনটুনিটা ‘টুইট্ টুইট্’ করে ডাকে আর আব্বু-আম্মুর ঠোঁট থেকে খাবার নিয়ে খায়।
দেখতে দেখতে বাচ্চা টুনটুনিটা বেশ বড়ো হয়ে যায়। এখন ওর ওড়ার সময় চলে এসেছে। কেননা, ওটা ডিম থেকে বের হওয়ার পর থেকে আদিব দিনের হিসাব রেখে চলেছে।
একদিন বিকালে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে আদিব। টুনটুনির বাসার দিকে চোখ যেতেই খেয়াল করলো, বাচ্চাটা বেশ ডাকাডাকি করছে। খুব ক্ষিধে পেয়েছে হয়তো। এই সময়ই তো ওর আব্বু আম্মু এসে ওকে খাওয়ায়।
এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও তাদের দেখা পায় না আদিব। কিছুটা অবাক হয়, গেলো কোথায় তারা? বাচ্চাটার যে খুউব ক্ষিধে পেয়েছে! এতোটুকু একটা বাচ্চা, বেশিক্ষণ কি আর ক্ষিধে পেটে থাকতে পারে?
দরোজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো আদিব। এ গাছের ডালে, ও গাছের ডালে খুঁজলো। আকাশের দিকে তাকালো। এই বুঝি ঠোঁটে খাবার নিয়ে ফিরে এলো। কিন্তু না, অনেকক্ষণ পার হলেও আব্বু কিংবা আম্মু— কেউই ফিরে এলো না।
বুকটা ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইছে আদিবের। বাচ্চাটার জন্য বেশ মায়া লাগছে।
সন্ধ্যা হয়ে গেলো। এখনও ফেরেনি তারা। এদিকে বাচ্চা টুনটুনিটা কেঁদেকেটে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।
আপা এসে ওকে ঘরে নিয়ে গেলো।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো আদিব। না, বাচ্চাটা একাই আছে বাসায়। ‘টুইট্ টুইট্’ করে ডাকছে। তবে গলার স্বর বেশি একটা বের হচ্ছে না। ডাকতে ডাকতে গলা বসে গেছে, ভাবলো আদিব।
আপাকে ডেকে আনলো আদিব। খুলে বললো সব ঘটনা।
সব শুনে আপারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। টুনটুনিদের সাথে যে আদিবের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, তা সে জানে।
‘এক কাজ করি চলো,’ বললো আফরোজা। ‘আমরা বাচ্চাটাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করি।’
আদিব বললো, ‘আমরা কি ওকে খাওয়াতে পারবো আপা?’
‘চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?’ বললো আপা। ‘আচ্ছা, আমরা ওকে কী খাওয়াবো? আম্মুর কাছ থেকে চাল নিয়ে আসবো, পানি দিয়ে গুলে খাইয়ে দেবো?’
আদিব বললো, ‘না আপু, এতো ছোট্টো বাচ্চা চাল খেতে পারবে না। আব্বু বলেছেন, টুনটুনিরা বিভিন্ন অপকারী পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, ছোটো কেঁচো, মৌমাছি, ফুলের মধু, রেশম মথ, ধান বা পাট পাতার পোকা, শুয়োপোকা এবং তার ডিম এই সব খাদ্য হিসেবে খায়। কিন্তু ও তো খুউব ছোট্টো, আমার মনে হয় আমরা ওকে মধু খাওয়াতে পারি।’
আপা বললো, ‘তুমি ঠিক বলেছো। তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি ভেতর থেকে মধু নিয়ে আসি।’
টুনটুনির বাচ্চাটাকে দুই ভাইবোন মধু খাওয়ালো। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও ওদের দেয়া মধু খেলো বাচ্চাটা।
টুনটুনি বাচ্চাটার আব্বু বা আম্মু আর ফিরে এলো না। বাচ্চাটা তাই একা হয়ে পড়লো। ছোটো বয়সেই এতিম হয়ে গেলো সে। কিন্তু আদিব ওকে একা হতে দিলো না। সুযোগ পেলেই ডুমুর গাছ থেকে বাচ্চাটা বারান্দায় নিয়ে আসে। ওকে খাওয়ায়। বাগানের মাটি খুঁড়ে ছোটো ছোটো কেঁচো বের করে খাওয়ায়। আপা ওকে সাহায্য করে। কোচিং থেকে ফেরার পথে পোকাওয়ালা ধান কিংবা পাটের পাতা নিয়ে আসে। তারপর দু’জন মিলে সেসব পাতার পোকা খেতে দেয় বাচ্চাটাকে।
আব্বু এবং আম্মুও আদিবকে বিভিন্ন খাবার এনে দেন। বাচ্চাটা এখন একটা দুইটা করে ভাতও খায়।
আচ্ছা, বাচ্চাটার একটা নাম দিলে কেমন হয়? টুনটুনি পাখিকে তো প্রায় সবাই টুনি বলেই ডাকে। তাই ও আর ওই নাম দিতে চায় না তার। তাহলে কী নাম দেয়া যায় বাচ্চাটার?
অনেক ভাবলো আদিব। একটা নাম পেয়েও গেলো। ও পাখিটার নাম রাখলো ‘টুইট’— কারণ, সে টুইট্ টুইট্ করেই বেশি ডাকে।
টুইট এখন ওড়া শিখে গেছে। কিন্তু বেশি দূরে যায় না। আব্বুকে বলে একটা খাঁচা কিনে এনেছে আদিব। রাতে ওটার মধ্যেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আর দিনের বেলা এ ঘর ও ঘর করে বেড়ায়।
এখন শুধু আদিব না, বাড়ির অন্যদের সাথেও টুইটের বেশ সম্পর্ক হয়ে গেছে। ও যেনো ওদের পরিবারেরই একজন সদস্য!
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আদিব গেলো টুইটকে জাগাতে। ওকে খেতে দিতে হবে। একটু দেরি হলেই টুইট তার ছোট্টো কণ্ঠে ডেকে সারা বাড়ি মাথায় তুলবে।
খাঁচাটার কাছে যেতেই আদিবের বুকের মধ্যে ‘ছ্যাৎ’ করে উঠলো। খাঁচার দরোজা পাট করে খোলা! ভেতরে নেই টুইট! ভাবলো, ওর উঠতে দেরি দেখে বাড়ির অন্যরা হয়তো ছেড়ে দিয়েছে।
বাড়ির ভেতরে চলে গেলো আদিব। আব্বু তো আগেই অফিসে চলে গেছেন। আম্মু এবং আপা বললেন যে তারা কেউ টুইটের খাঁচার দরোজা খোলেনি।
এবার আদিবের ছোট্টো বুকের খাঁচায় ওর হৃৎপিণ্ডটা দড়াম দড়াম করে আছড়ে পড়তে লাগলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। কী হয়েছে তাহলে ওর টুইটের?
হন্যে হয়ে সমস্ত ঘর আর বাগানের চতুর্দিক খুঁজতে লাগলো। খেয়াল করলো, খাঁচার নিচে কয়েকটা সাদা পালক পড়ে রয়েছে। জানালার গ্রিলের বাইরেও পড়ে আছে সেই পালক।
এগিয়ে গেলো আদিব। ডুমুর গাছের পাশে যে বেগুন গাছটা, তার নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখলো। বসে পড়লো ও। আরে! এ তো আধ খাওয়া একটা পাখি!
হাউমাউ করে কান্না চলে এলো আদিবের। ওর টুইটকে ও ঠিকই চিনতে পেরেছে।
ব্যথায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আদিবের অন্তর।
ছুটে এলেন আম্মু এবং আপা। ওরাও অবাক হয়ে দেখছে টুইটের আধ খাওয়া রক্তাক্ত দেহটা।
আদিবকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন আম্মু। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
ছেলেকে সান্ত্বনা দিলেও নিজেই শান্ত থাকতে পারছেন না আম্মু। তারও অন্তরটা ফেটে যাচ্ছে।
আপার চোখজোড়া ছলছল করছে। বহু কষ্টে কান্না থামিয়ে রেখেছে। না, কাঁদা যাবে না। ও কাঁদলে আদরের ভাইটিকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সে রাতে ঘুমের মধ্যে টুইটকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলো আদিব। সবুজ ঘাসের মধ্যে সাদা কাশফুলে ছাওয়া একটা মাঠ। আকাশে নীল চাদরের উপর দিয়ে সাদা মেঘেদের ছুটোছুটি। দলবেঁধে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে কোন্ অজানায়। মৃদু বাতাস বইছে। নাম না জানা ফুলের রেণুরা ভাসছে সে বাতাসে। মন জুড়িয়ে যাওয়া একটা ঘ্রাণ জড়িয়ে আছে সবখানে।
সেই মাঠের মধ্যে আদিব ও টুইট খেলছে। আর হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ক্রমে সেখানে জড়ো হতে লাগলো আনাস, রাবেয়া, আনজু, রাকিব এবং তল্লাটের যতো ছেলেমেয়ে।
খেলায় যোগ দিলো সবাই। আজ যেনো আকাশের বিশাল শামিয়ানার নিচে আনন্দের জোয়ার নেমেছে। ছেলেমেয়েদের হই-হল্লা আর বাতাসের গুনগুন এবং পাখির কূজনে যেন ঈদের মহা আনন্দ, যা ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রাণ থেকে প্রাণে।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫



